অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

চীনের কাছেও পাকিস্তান সহযোগী দেশ নয়, সমস্যার দেশ : ক্রিস ব্ল্যাকবার্ণ

  • আনিস আহমেদ

চীনের কাছেও পাকিস্তান সহযোগী দেশ নয়, সমস্যার দেশ : ক্রিস ব্ল্যাকবার্ণ

চীনের কাছেও পাকিস্তান সহযোগী দেশ নয়, সমস্যার দেশ : ক্রিস ব্ল্যাকবার্ণ

নেটো বাহিনীর বিমান অভিযানে ২৪ জন পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হবার প্রতিবাদে আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ বিষয়ে জার্মানির বন এ একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান। পাকিস্তানের সঙ্গে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের নয় , পশ্চিমি দেশগুলির সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে চিড় ধরেছে। এর তাৎক্ষনিক কারণ এবং প্রকৃত কারণ ও প্রতিক্রিয়া নিয়ে ব্রিটেনে দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক ক্রিস ব্ল্যাকবার্ণ বক্তব্য রেখেছেন ভয়েস অফ আমেরিকার বাংলা বিভাগের সঙ্গে এক একান্ত সাক্ষাৎকারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নয় , সাধারণ ভাবে দেখা যাচ্ছে যে পশ্চিমের দেশগুলোর সঙ্গে ও পাকিস্তানের সম্পর্ক যেন ক্রমশই শীতল হয়ে উঠছে। এর তাৎক্ষনিক কারণ হচ্ছে নেটোর বিমান হামলায় পাকিস্তানী সৈন্যদের মৃত্যু । পাকিস্তান দাবি করেছে এই হত্যাকান্ড বিনা প্ররোচনায় ঘটানো হয়েছে। ক্রিস ব্ল্যাকবার্ণ মনে করেন যে এই তাৎক্ষনিক কারণ ছাড়াও এর পেছনে আরও কারণ নিহিত রয়েছে ।

তিনি মনে করছেন যে গত ছয় মাস ধরে, পাকিস্তানে ওসামা বিন লাদেনের হত্যার পর , পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের অবনতি ঘটা শুরু হয় , প্রকাশ্যে এবং গোপনেও। একদিক দিয়ে বলা যায় যে যুক্তরাষ্ট্র ও ঠিক এক ধরণের বাধার মুখে আছে এবং পাকিস্তান ও ঠিক জানে না যে দেশটি কোন দিকে এগুবে। তিনি মনে করেন যে অসামরিক সরকার পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর কাছ থেকে চাপের মুখে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকার সন্ত্রাস মোকাবিলার জন্য এক ধরণের কাঠামো তৈরির লক্ষে জার্মানির বনে একটি আঞ্চলিক বৈঠকের আয়োজন করেছে। এই মূহুর্তে পাকিস্তানি রাজনীতিকরা ঐ ধরণের সম্মেলনে যোগ দিতে রাজী নন । যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তান সরকারের উপর জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণের জন্যে চাপ দিয়েছে , বিশেষ করে হাক্কানি নেটওয়ার্ক ভেঙ্গে দেওয়ার জন্যে। সেখানেও পাকিস্তানের একাংশ বিষয়টিকে ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। সুতরাং এই নিম্নগামি সম্পর্কের তাৎক্ষনিক কারণ নেটোর বিমান হামলায় পাকিস্তানী সৈন্য নিহত হবার ঘটনা থাকলেও এই সম্পর্কের টানা পোড়েন চলেছে মাস ছয়েক ধরে।

পাকিস্তানে তো এ রকম ধারণা ও প্রচলিত আছে যে যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়েই পাকিস্তান চলতে পারে এবং কোন কোন পাকিস্তানি এ ও মনে করেন যে এখন সময় এসছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসার। কিন্তু পাকিস্তানের পক্ষে এই ধরণের ধারণা পোষণ করা কি বাস্তব সম্মত ?

ক্রিস ব্ল্যাক বার্ন বলছেন , এটা মোটেই বাস্তবসম্মত নয়। কারণ পাকিস্তান পশ্চিমের এবং বিশেষত যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য সহযোগিতার উপর নির্ভরশীল। সমস্যাটা হচ্ছে এতগুলো বছরেও পাকিস্তান কোন পরিস্কার লক্ষ্য স্থির করেনি। যেমন ধরুণ মুশাররফ এর আমল থেকে যখন অসামরিক সরকার হলো তারা বলেছিল যে তারা অসামরিক সরকার চায় , সামরিক বাহিনী এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ চায় কিন্তু বাস্তবে মনে হচ্ছে যে অসামরিক সরকার নিজেই টিকে থাকার জন্যে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। সুতরাং যুক্তরাষ্ট্র থেকে নিজেকে আলাদা রাখার যে কথা পাকিস্তানের রাজনীতিকরা বলছেন সেটি বস্তুত রাজনৈতিক বাগাড়ম্বরতা। তবে পাকিস্তান বিচ্ছিন্ন থাকলে আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি বলেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের মধ্যকার সম্পর্কে পারস্পরিক মর্যাদা ও স্বার্থের দিকটায় অভাব দেখা দিয়েছে । এটা কি পাকিস্তানি নেতার দিক পরিবর্তন না কি এ কথাগুলি তিনি বলছেন সেনাবাহিনী চাপে পড়ে?

ক্রিসের জবাব ছিল যে রাজনীতিকরা ভিন্ন ধাঁচের মানুষ এবং রাজনৈতিক ভাবে পাকিস্তান যতই অকার্যকর রাষ্ট্র হোক না কেন রাজনীতিকরা তাঁদের মতো কথা বলেন এবং জনগণের মধ্যে তাদের জনপ্রিয়তা গড়ে তোলেন ।তাঁরা জনগণের অনেক চিন্তাধারারই বিরোধীতা করেন না। সে জন্যেই দেখা যায় যে জারদারী কিংবা গিলানি একদিকে ড্রোন অভিযানকে সমর্থন করেন , আবার প্রকাশ্যে নিন্দেও করেন। পাকিস্তানের সংবাদপত্র রাজনীতিকরা সমালোচিত হন। আসল ব্যাপারটা হলো পাকিস্তানের অনেক রাজনীতিকই চান ধর্ম নিরপেক্ষ আধুনিক সমাজ ব্যবস্থা কিন্তু তারা সংবাদপত্রের চাপের মুখে থাকেন যেগুলো মুলত আমেরিকা বিরোধী। যুক্তরাষ্ট্রের এটা বুঝতে হবে যে পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রর জনসমর্থন নেই বললেই চলে।

পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হবার ঘটনায় চীন দুঃখ প্রকাশ করেছে পাকিস্তানের অনেকগুলো সংবাদপত্রই এই ঘটনায় চীনের বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গেই তুলে ধরেছে। নিসন্দেহে এই ঘটনা দুঃখজনক এবং চীন দুঃখ প্রকাশ করতে ও পারে। সবাই এই ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে , প্রেসিডেন্ট ওবামা ও করেছেন। এই বিয়োগান্তক ঘটনা সম্পর্কে তদন্ত ও হবে। তবে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী বার বার চীনকে তুরুপের তাশের মতো ব্যবহার করতে চায়। পাকিস্তানের রাজনীতিক এবং সামরিক বাহিনী বোঝানোর চেষ্টা করেন যে তারা তাদের সমর্থন চীনের দিকে দেবেন। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের প্রভাব কমানোর জন্যেও তারা চীনের দিক ঝুকতে চায় কিন্তু এ নিয়ে পাকিস্তানে একটু বাড়বাড়িই হয় কারণ ভুলে গেলে চলবে না যে চীনের উইঘোরের মুসলমানদের ইন্ধন জোগানোর জন্যে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী গোষ্টিগুলিকে এবং পাকিস্তানের ধর্মীয় গোষ্ঠিকে চীন দায়ি করেছে। সুতরাং জংগি দমনের ব্যাপারে চনি ও যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিতে খুব একটা পার্থক্য নেই। অনেক চীনা সংগঠনই পাকিস্তানকে সহযাগী হিসেবে নয় , সমস্যা হিসেবেই দেখেন।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদুত হোসেন হাক্কানিকে পাকিস্তান সরিয়ে দিয়েছে এই অভিযোগে যে সামরিক বাহিনীকে দেশে ক্ষমতা দখল থেকে বিরত রাখতে যুক্তরাষ্ট্র যেন চাপ দেয় , এ রকম একটি কথিত স্মারক পত্র তিনি না কি যুক্তরাষ্ট্রে দিয়েছিলেন । অভিযোগের সত্যাসত্য প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী কি ক্ষমতা দখল করবে সে দেশে ?

ক্রিস ব্ল্যাকবার্ন বলেন যে এর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অ্যাবটাবাদে ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর পর থেকেই মনে হয় যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সম্পর্কের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী একটা ভুমিকা রেখে এসছে। লক্ষ্য করা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র , নেটো এবং আইসফের সঙ্গে পাকিস্তানের নের্তৃত্বের সম্পর্কে অবনতি ঘটছে এবং পাকিস্তানে নিরাপত্তাহীনতার একটা ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। তা ছাড়া ভারত ভীতি তো রয়েছেই। এন কী আফগানিস্তানকে ও তারা কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণূ মনে করে যেন ভারতের সঙ্গে যুদ্ধে আফগানিস্তানকে তারা ব্যবহার করবে। অথচ ভুলে যায় যে আফগানিস্তান একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। সুতরাং এই নিরাপত্তাহীনতার ধারণা থেকেই এ রকম সম্ভাবনা রয়েছে যে অভুত্থান হোক কিংবা বাংলাদেশের মতো্ সেনা সমর্থিত তত্ববধায়ক সরকার ক্ষমতা নিক , সামরিক বাহিনী একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় চলে আসতে পারে।

XS
SM
MD
LG