অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

বাংলাদেশে অ্যানথ্রাক্স রোগ ছড়াবার কারন সচেতনতার অভাব:প্রফেসর মাহমুদুর রহমান

  • শামীম চৌধুরী

বাংলাদেশে অ্যানথ্রাক্স রোগ ছড়াবার কারন সচেতনতার অভাব:প্রফেসর মাহমুদুর রহমান

বাংলাদেশে অ্যানথ্রাক্স রোগ ছড়াবার কারন সচেতনতার অভাব:প্রফেসর মাহমুদুর রহমান

বাংলাদেশে সম্প্রতি এ্যানথ্রাক্সে গবাদী পশু এবং রোগাক্রান্ত পশু থেকে মানুষের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। গত অগাষ্ট মাস থেকে বলতে গেলে প্রায় সারা দেশজুড়েই এই রোগে লোকজন আক্রান্ত হচ্ছে বলে খবর প্রকাশিত হচ্ছে সংবাদমাধ্যমে। সরকার ইতোমধ্যেই রেড এ্যালার্ট্ও জারি করেছিল। বাংলাদেশে এই রোগ নতুন নয় কিন্তু এত বেশি সংখ্যক মানুষের এই রোগে আক্রান্তের খবর এর আগে পাওয়া যায় নি।

বিভিন্ন জেলায় এত লোকের এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার কারন কি এই প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশের রোগতত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রন ও গবেষনা ইন্সটিটিউট সংক্ষেপে IEDCR এর পরিচালক প্রফেসর মাহমুদুর রহমান বলেন যে গত অগাষ্টমাস থেকে আজ পর্যন্ত ৫৮৩ টি অ্যানথ্রাক্স রোগে আক্রান্তের খবর রয়েছে। গত বছরের অগাষ্ট থেকে এ বছরের অগাষ্ট পর্যন্ত ৯৯ টি কেসের কথা জানা যায় যারা অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়েছিলেন। দেখা যায় যে সব এলাকায় অ্যানথ্রাক্স হয়েছিল সেখানেই আবার ঘুরে ঘুরে আসছে এই রোগ আর সেটাই নিয়ম, কারন এর সংক্রমন মাটিতে থেকে যায়। এটা কেন এ বছর বেশি আসল তার অনেক গুলো কারন হতে পারে। একটা হতে পারে যে সব এলাকায় অ্যানথ্রাক্স গবাদী পশুর মধ্যে বেশি আছে সেখানে হয়তোবা ভ্যাকসিনের অপ্রতুলতার কারনে এটা একটু বেড়ে গেছে। এটা একটা। দ্বিতীয় হচ্ছে মানুষ সচেতন না। সেজন্যে যখন গরু ছাগল অসুস্থ হচ্ছে তখন তাড়াতাড়ি জবাই করার চেষ্টা হচ্ছে। এখানে একটা অর্থনৈতিক বিষয়ও আছে। যেহেতু গরু ছাগলের দাম এখন অনেক বেশি হয়ে গিয়েছে সেজন্যে যাতে কিছুটা অর্থ ফেরত পাওয়া যায় সেজন্যে তাড়াহুড়ো করে জবাই করা হয়। আর জলবায়ুর পরিবর্তন আবহাওয়ার পরিবর্তনের জন্যেও এটা এক যায়গা থেকে আরএক যায়গায় যেতে পারে। এই সব কারনে আমরা সন্দেহ করছি যে এটা বেড়ে যাচ্ছে। তবে বেড়ে যাওয়ার অন্য কারন অসচেতনতা। মানুষ যদি জবাই না করতো তাহলে এত তাড়াতাড়ি এই রোগটা ছড়াত না।

অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হলে গবাদী পশুর প্রাথমিক লক্ষনগুলো সম্পর্কে প্রফেসর মাহমুদুর রহমান বলেন, পশুর গায়ের তাপমাত্রা অনেক বেড়ে যায় এক শো সাত ডিগ্রি পর্যন্ত জ্বর ওঠে। কাঁপুনি হয় নাকে মুখে কালচে ধরনের রক্ত বের হয়। সংক্রমিত হয়ে রোগ হওয়ার পর খুব বেশিক্ষন বেঁচে থাকে না। চিকিত্সারও সময় পাওয়া যায় না, আটচল্লিশ ঘন্টা বলা হলেও আসলে পাঁচ ছয় ঘন্টার মধ্যেই আক্রান্ত পশু মারা যায়।

তিন ধরনের অ্যানথ্রাক্সের মধ্যে বাংলাদেশে কোনটা দেখা যাচ্ছে এই প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর রহমান জানালেন যে সাধারনত তিন ধরনের হলেও সাধারনত পচানব্বই ভাগই ত্বকের সংক্রমন হয় যা হল কিউটেনিয়াস অ্যানথ্রাক্স । বাকি পাঁচ ভাগ শ্বাস নালী এবং আমাদের পরিপাকযন্ত্রের সংগে সম্পর্কিত। বাংলাদেশে যেটা হচ্ছে সেটা মূলত কিউটেনিয়াস অ্যানথ্রাক্স। অন্যগুলোর জন্যে নজরদারি রেখেছেন তবে সে ধরনের অ্যানথ্রাক্স তাদের নজরে আসেনি। কিউটেনিয়াস অ্যানথ্রাক্সে মৃত্যুর ঝুকিঁ নেই বললেই চলে যদি সময় মত চিকিত্সা দেওয়া যায়। অন্যান্য অ্যানথ্রাক্সে মৃত্যুর ঝুকিঁ বেশি আছে। তবে সেটা এখন বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছেনা।

অ্যানথ্রাক্সের ব্যাকটেরিয়া কতদিন পর্যন্ত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় বেচেঁ থাকতে পারে?

প্রফেসর মাহমুদুর রহমান বলেন, নিষ্ক্রিয় অবস্থায় এটাকে তারা বলেন স্পোর। এটা মাটিতে চল্লিশ পঞ্চাশ ষাট বছর থেকে যেতে পারে। প্রতিকূল আবহাওয়ার মধ্যেও এটা বেঁচে থাকে। গরু ছাগল ঘাস খায় তখন এটা তার পেটের মধ্যে যায় অথবা তার শ্বাসনালীতে ঢোকে এবং আক্রান্ত হয়।

অ্যানথ্রাক্সের জন্যে কি কেবল গবাদী পশুকে টীকা দেওয়া হয়? নাকি যে মাঠে গবাদী পশু চরে সেখানে অ্যানথ্রাক্স আছে কি না তা পরীক্ষার কোন ব্যবস্থা আছে?

প্রফেসর মাহমুদুর রহমান বললেন, অ্যানথ্রাক্স রোধে কার্যকরি একমাত্র অস্ত্র তারা বলেন গবাদী পশুকে টীকা দেওয়া। কারন কোন অবস্থাতেই মাটি পরীক্ষা করে এটা ঠিক রাখা যাবে না। যদিএ কোন কোন দেশে সেটা তারা করে। কিনতু মাটিতে যেহেতু অনেক দিন থেকে যেতে পারে সেজন্যে তারা বলেন ট্রান্সমিশনের চেনটা যাতে ভেঙে দিতে পারেন তার চেষ্টা করা্ গবাদী পশুকে টীকা দিলে এটা গবাদী পশুর হয়না। আর গবাদী পশু সংক্রমিত না হলে মানুষের মধ্যে রোগটা আসে না। এটাই তাদের বক্তব্য এবং এটাই মোস্ট এফেকটিভ ওয়ে অফ কনট্রোলিং।

বাংলাদেশে যে ধরনের অ্যানথ্রাক্সে লোকজন আক্রান্ত হচ্ছেন, শরীরে এর দীর্ঘস্থায়ী কি প্রভাব পড়তে পারে?

এর উত্তরে প্রফেসর রহমান বললেন, এটার কোন দীর্ঘ স্থায়ী প্রভাব নেই। সাধারনতা যখন চামড়ার সংক্রমন হয় দশ দিনের চিকিত্সা দেন তারা। এর জন্যে যেসব অষুধের দরকার সেগুলো মজুদ আছে। সরকারের কাছেও আছে বাজারেও পাওয়া যায় সহজেই। দশ দিনের চিকিত্সা দিলে রোগী ভালো হয়ে যাচ্ছে। পরবর্তী সময়ে এর কোন দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব নাই। এপর্যন্ত পাঁচশো তিরাশিটা কেইসের পচানব্বইজনই কিনতু ভালো হয়ে গেছে। তিনি আরো বলেন এটা চামড়ার সংক্রমন হলেও এটা একজন মানুষ থেকে অন্যজন্যে ছড়ায় না। সুতরাং নিয়ন্ত্রনের জন্যে সেটা একটা বড় অ্যাডভানটেইজ।

এই চিকিত্সা কতটা ব্যায়বহুল?

জবাবে প্রফেসর রহমান বললেন, একজন রোগীকে পুরা কোর্স অফ ট্রিটমেন্ট দিতে তাদের দুই থেকে আড়াইশ টাকা খরচ হয়। এটা সরকার থেকেই বহন করা হচ্ছে এখন পর্যন্ত।

অ্যানথ্রাক্সে যাতে তারা আক্রান্ত না হন সে জন্যে জনগনকে কি পরামর্শ দেবেন?

প্রফেসর মাহমুদুর রহমান বলছেন, চারটা বিষয় আছে। প্রথমত: গবাদী পশুকে টীকা দেওয়া। টীকা দেওয়ার জন্যে সরকারের যেমন দায়ীত্ব আছে একজন খামারি বা যারা গরু ছাগল পালেন তাদেরও দায়ীত্ব আছে পশুকে এই ভ্যাকসিনটা দেওয়ার ব্যাবস্থা নেওয়া। দ্বিতয়ত তিনি বলেন যদি কোন পশু এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় তাহলে সাথে সাথে পশুটাকে মাটির নীচে পুতেঁ ফেলতে হবে, সময় ক্ষেপন করা যাবে না। চামড়া খোলার চেষ্টা করা যাতে না হয় এবং ছ’ফু্ট মাটির তলায় পুতেঁ ফেললে মাটিতেও এর সংক্রমন বেশি দিন থাকে না। তৃতীয়ত আক্রান্ত গরু ছাগল যাতে জবাই করা না হয়। যেটা সবচেয়ে বেশি সমস্যা বলে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। জবাই করা না হলে এর সংক্রমন ছড়িয়ে যাওয়া একেবারে রোধ হবে। চতুর্থত যদি কারো চামড়া যদি ফুসকুড়ি উঠে কালচে হয়ে যায় , এদেরকে মাংস কাটাকুটির সংগে বা আক্রান্ত গরু শুশ্রসার সংগে জড়িত থাকতে হবে, তাহলে তাকে তারা পরামর্শ দিচ্ছেন সরকারি হাসপাতালে সংগে সংগে যোগাযোগ করে চিকিত্সা নেন।

XS
SM
MD
LG