অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

বৈষম্য ও নির্যাতনমুক্ত বাংলাদেশের অপেক্ষায় নারীসমাজ


আঙ্গুর নাহার মন্টি
ঢাকা রিপোর্টিং সেন্টার
সহযোগিতায় - ইউএসএআইডি ও ভয়েস অফ আমেরিকা

বাংলাদেশের নারীসমাজ এখন আর পিছিয়ে নেই। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদসহ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সকল ক্ষেত্রে নারীরা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখে চলেছেন। দেশের এমন কোন কর্মস্থল নেই যেখানে নারীর অংশগ্রহণ নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, সর্বক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বাড়লেও পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও পশ্চাতপদ মানসিকতা থেকে মুক্ত হতে পারেনি দেশের নারীরা। আজও ঘরে-বাইরে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন নারী। নারী-পুরুষের বৈষম্যের পাশাপাশি অফিস-আদালত, রাস্তাঘাটে এমনকি পরিবারে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মাত্রা ও ব্যাপকতা বাড়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক কারণে নারী নির্যাতন। এই বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গত ২৫শে নভেম্বর থেকে ১০ই ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ২০১৩’।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৫ বছরে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন মোট ২৬ হাজার ৩৩৫ জন নারী। এর মধ্যে ২০১২ সালে ৫ হাজার ৬১৬ জন এবং চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ৪ হাজার ৮৫৪ জন নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। নির্যাতনের এই হার অত্যন্ত উদ্বেগজনক হলেও এটাই কিন্তু চূড়ান্ত পরিসংখ্যান নয়। কারণ এর চেয়ে অনেক বেশি সংখ্যক নারী নির্যাতনের ঘটনা পারিবারিক সম্মান, লোকভয়, বিদ্যমান আইনী ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা ও রাজনৈতিক প্রভাবসহ নানা কারণে এখনও আড়ালে রয়ে যায়।

এদিকে দেশের সংবিধান ও নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্যবিলোপের সনদ সিডও’র আলোকে সরকার ঘোষণা করেছে নারী উন্নয়ন নীতিমালা। সেইসাথে বাংলাদেশে নারী নির্যাতন প্রতিরোধেও প্রণীত হয়েছে যুগোপযোগী বিভিন্ন আইন। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে চলছে নানা সচেতনতামূলক কর্মসূচী। তারপরও প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন নারীরা।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানম বলেন, “রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক, পারিবারিক ও সামাজিকভাবে নারীর প্রতি সহিংসতার মতো সন্ত্রাসী কর্মততপরতার প্রতি যতক্ষণ না আমাদের ঘৃণা ও প্রতিরোধ গড়ে উঠবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা নারী নির্যাতন বন্ধ করতে পারব না। প্রণীত আইনগুলো আমরা প্রয়োগ করতে পারছি না। এজন্য দরকার আমাদের নিজেদের ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। ১৯৮০ সালে এদেশে যৌতুকবিরোধী আইন হয়েছে। অথচ এখনও আমরা যৌতুক দেওয়া-নেওয়া করছি। এক্ষেত্রে তরুণসমাজকে ভূমিকা রাখতে হবে। তাদের যৌতুক নিয়ে বা দিয়ে বিয়ে করবো না এমন প্রতিজ্ঞা করতে হবে।

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিকভাবে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আয়শা খানম সুপারিশ করেন, “বিদ্যমান আইনগুলোর ব্যাপক প্রচার দরকার। শুধু কেন্দ্রে নয়, তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত স্থানীয় সরকার, মহিলা অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়, নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার ও নারী আন্দোলন সংগঠনকে এগুলো প্রচার করতে হবে। পাঠ্যসূচীতেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। গণ-অভিযানের মতো বহুমাত্রিক কর্মসূচী নিতে হবে। সেইসঙ্গে নারীর নিজের ও গোটা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে”।

বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক অসমতা, বৈষম্য ও নির্যাতনের মতো প্রতিবন্ধকতার মধ্যে থেকেও বাংলাদেশের নারীরা এগিয়ে চলেছেন এবং সেইসঙ্গে নিজের দেশকেও টেনে নিয়ে চলেছেন অগ্রগতির পথে। উন্নয়নে এদেশের নারীদের অবদানের স্বীকৃতি মিলেছে জাতিসংঘের কাছ থেকেও। তাই এই ইমেজ ধরে রাখতে হলে নারী নির্যাতনের মতো বাঁধাগুলো দ্রুত দূর করতে হবে। তাই বছরের একদিন নারী দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতা আর বাকি দিনগুলোতে নির্বিকার না থেকে পরিবার থেকে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে সবাইকে।
XS
SM
MD
LG