অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ২০১৫নির্যাতন মুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গিকার


রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীরা কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছেন। নারীর ক্ষমতায়নে বিশ্বে অন্যতম রোল মডেল আজ বাংলাদেশ। বিমান চালনা, পর্বতশৃঙ্গ জয়ের মতো চ্যালেঞ্জিং সব কাজ করেও ঘরে-বাইরে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন এদেশের নারীরা। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এক জরিপ অনুসারে, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পারিবারিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২৯২ জন নারী। এদের মধ্যে ১৬৭ জন নারী স্বামীর হাতে মারাও গেছেন।

নারী নির্যাতন নিয়ে দেশের প্রথম জাতীয় পর্যায়ের জরিপ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন (ভিএডব্লিউ) সার্ভে ২০১১’ নামের জরিপটিতে দেখা যায়, দেশের ৮৭ শতাংশ বিবাহিত নারী জীবনের কোনো না কোনো সময়ে স্বামীর মাধ্যমে কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ স্বামীর মাধ্যমে শারীরিক নির্যাতন, ৩৬ শতাংশ যৌন নির্যাতন, ৮২ শতাংশ মানসিক এবং ৫৩ শতাংশ নারী অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এই বাস্তবতায় গত ২৫ নভেম্বর নারীর প্রতি সব ধরণের নির্যাতন নির্মূলের জন্য ডাক দিয়ে পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। একইসঙ্গে ওইদিন থেকে শুরু হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ ২০১৫’। আগামী ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে নারী নির্যাতনমুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গিকারের মধ্য দিয়ে এই পক্ষকাল আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে।

দেশের সংবিধান ও নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপের সনদ সিডও’র আলোকে জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিমালা এবং নারী নির্যাতন প্রতিরোধে যুগোপযোগী বিভিন্ন আইন প্রণীত হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে চলছে নানা সচেতনতামূলক কর্মসূচী। এরপরও প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন নারীরা।

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ইউএসএআইডি বাংলাদেশে বিভিন্ন কর্মসূচী পালন করছে জানিয়ে ইউএসএআইডির জেন্ডার বিশেষজ্ঞ মাহমুদা রহমান খান বলেন, নারী নির্যাতন প্রতিরোধে ইউএসএআইডি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পিকটোগ্রাম ক্যাম্পেইন করছে। আমাদের পার্টনার সংস্থা প্লান ইন্টারন্যাশনালের প্রটেক্টিং হিউম্যান রাইটস প্রকল্পের মাধ্যমে একটি গ্রাফিক্স এক্সিবিশন করছে। ইউএসএআইডি গত বছর মানবাধিকার দিবসে একটি সিরিজ জেন্ডার সেমিনার শুরু করেছিলাম, যেটি আগামী ৭ ডিসেম্বর ইএমকে সেন্টারে শেষ হবে। সেখানে বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষার্থীরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন।

শুধু বাংলাদেশেই নয়, উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালেও দেখা যাবে পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন জাতিসংঘের কমিশন অন দ্য স্ট্যাটাস অব উইমেনের (সিএসডব্লিউ) ৫৯তম সভায় বলেছিলেন, পারিবারিক আইনের প্রয়োগ ঠিকমতো না হওয়ায় পারিবারিক নির্যাতন বেড়েই চলেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি মানসিকতারও পরিবর্তন করতে হবে। তা না হলে নারীর ক্ষমতায়ন যতই হোক, পারিবারিক নির্যাতন কমবে না।

এ প্রসঙ্গে মাহমুদা রহমান খান নারী নির্যাতন প্রতিরোধে পুরুষদের সম্পৃক্ত করার উপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, বিভিন্ন প্রকল্পে আমরা দেখেছি নারীরা নির্যাতন নিয়ে কথা না বললেও আকার-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেন, তাদের নিজেদের ইচ্ছায় কোন কাজ করতে পারেন না। নানা নির্যাতনের শিকার হন। সেক্ষেত্রে আমাদের মনে হয়, প্রথম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, নিজেদের ক্ষমতায়নে নারীরা এগিয়ে এলেও সমাজ ততটা এগিয়ে আসেনি।বিশেষ করে পুরুষদের সচেতনতা ততখানি গড়ে উঠেনি। তাই বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, প্রতিটি প্রকল্পে পুরুষদের সাথে কাজ করা এবং তাদের আচরণ ও মানসিকতা পরিবর্তনে বিশেষভাবে কাজ করা।

নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বিশ্বজুড়ে এবার প্রতিকী রঙ কমলা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ দিয়ে বোঝানো হয়েছে নির্যাতনহীন উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা। নির্যাতনকে স্বাভাবিক বলে মেনে না নিলে এবং অপরাধীর বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত হলেই কেবল নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সম্ভব।

আঙ্গুর নাহার মন্টি
ঢাকা রিপোর্টিং সেন্টার
সহযোগিতায়: ইউএসএআইডি ও ভয়েস অফ আমেরিকা

XS
SM
MD
LG