অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

চীনের তিয়েনানমেন অবদমনের প্রত্যক্ষদর্শী এল পেসিনের বর্ণনা


১৯৮৯ সালে তিয়েনানমেন হত্যাকান্ডের পর ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদদাতা এল পেসিনকে চীন থেকে বহিস্কার করা হয়েছিল। তখন থেকে ব্যাপক পরিবর্তন সধিত হয় চীনে। এল পেসিন বিভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে ব্যাখ্যা করেন সে বিষয়ে।

তিনি লিখেছেন, বেইজিং হতে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরের শহর কিয়েভ; তবে আমি আরো আঁকাবাকা পথ নিয়েছিলাম এবং তাতে আমার সময় লাগে ২৫ বছর।

মে মাসে আমার হোটেলের জানালা দিয়ে যখন কিয়েভের ইন্ডিপেন্ডেন্স স্কোয়ারের দিকে তাকালাম, আমি দেখলাম অসংখ্য তাবু আর মানুষ; যারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের তাগিদে সেখানে নিরাপত্তারক্ষীদের ভয়াল আক্রমণ উপেক্ষা করে জড়ো হয়েছিলেন।

চট করে আমার মাথায় এলো, যে কোনো সময়ে, যে কোনো দেশে, আরেকটি স্কোয়ারের জন্ম হতে পারে।

১৯৮৯ সাল, বেইজিং-এ ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদদাতা হিসাবে দ্বিতীয় বছরের দায়িত্বে ছিলাম আমি। তিয়েনানমান স্কোয়ার ছিল মূলত একটি পর্যটন স্থান। চীনে তখন খুব ভালো সময়। অর্থণৈতিক সংস্কার চলছিলো, গুটি গুটি পায়ে চলছিলো রাজনৈতিক সংস্কারের প্রচেষ্টাও। বেইজিং এবং আমার আগের কর্মস্থল হংকং থেকে; আমি চীনের মাওবাদী চেতনা এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ছায়া থেকে উত্তোরণের প্রয়াস লক্ষ করছিলাম।

আশির দশকের শেষের দিকে, চীনে ছাত্র আন্দোলন বা তাদের রাজনৈতিক কর্মকান্ড কঠোরভাবে দমন করা হয়। সরকার তাদেরকে ‘বুর্জোয়া বিমুক্তিকরণ’ আখ্যা দিয়ে কমিউনিষ্ট পার্টি সাধারন সম্পাদক হু ইয়াওবাংকে বন্দী করেন।

এরপর ছাত্রদের আন্দোলন রাজনীতি বিবর্জিত হয়ে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবন অর্থাৎ খাদ্য, আবাসস্থলের দাবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়। নিজেরা সংঘঠিত হতে থাকেন। ১৯৪৯ এর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর তারা প্রথম অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের দিকে মনযোগ দেন।

১৯৮৯ সালের এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে চীনের কিছু ঘটনা আকশ্মিকভাবে সবাইকে অবাক করে দেয়।

১৫ই এপ্রিল হু ইয়াওবাং মারা যান এবং ছাত্ররা তিয়েনানমান স্কোয়ারে তার সম্মানে ছোট্ট এক বিক্ষোভ সমাবেশ করেন। তারা হু’কে সংস্কারের নেতা আখ্যা দেন এবং দল থেকে তার বহিস্কার ও তার মৃত্যুকে সেই সংস্কারের পথে অন্তরায় হিসাবে তুলে ধরেন।

ছোট্ট সেই বিক্ষোভ দ্র্রুত বড় হতে থাকে এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের আরো অনেক দাবী যুক্ত হতে থাকে। যোগ হয় দুর্নিতী, চীনা সরকার ও কমিউনিষ্টি পার্টির স্বচ্ছতার দাবী। সঙ্গে থাকে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছাত্রদের আরো ভালো ব্যাবস্থার দাবীও।

সারা দেশের সকল স্তরের মানুষ এতে যোগ দেন। যোগ দেন শ্রমিক পেশাজীবি, এমনকি সরকারী আমলারাও। মে মাস নাগাদ তা পরিণত হয় বিশাল সমাবেশে। ছড়িয়ে পড়ে পত্যেক আঞ্চলিক ও প্রাদেশিক শহরে।

আমি স্পষ্টভাবে স্মরণ করতে পারি তিয়েনানমান স্কোয়ারের সেদিনের স্মৃতি, অসংখ্য মানুষের ভীড়ে আটকে পড়েছিলাম। চীনা ভাষা জানা আমার তরুণ সহকর্মী হেইদি চায় ভীষণ উদ্দীপ্ত ছিলেন।

মনে আছে সে বলেছিলো, ‘এক মিনিট, দেখুন ওই ব্যানার প্লাকার্ড পোস্টারের লেখগিুলি’। সে ওই ব্যানারগুলোই দেখাচ্ছিলো যাতে নানা বায়সী, নানা পেশার বিক্ষোভকারীরা তাদের দাবী তুলে ধরেছিল।

ভীড় ঠেলে হেইদি তিয়েনানমেন স্কোয়ারে যান এবং মানুষজনের সঙ্গে কথা বলেন। আমি ড্রাইভারকে অফিসে যেতে বলি; নতুন একটি খবর লিখতে হবে।

বিক্ষোভ আরো বাড়তে থাকে। বিদেশী গনমাধ্যমে বলা হয় দুই দিনে সেখানে ১০ লক্ষেরও বেশী মানুষ জড়ো হয়েছিল। সেখানে অবস্থানরত ছাত্র নেতাদের অনশন ধর্মঘট সমর্থন করতে তারা সেখানে আসেন।

এই স্কোয়ারে ভয়েস অব আমেরিকা ছিল দারুন জনপ্রিয়। ছাত্র নেতারা ম্যান্ডারিন সার্ভিসের খবর চলাকালে রেডিও উঁচিয়ে ধরে রাখতেন। অনেকেই আমাকে জিজ্ঞেস করকেতা ম্যান্ডারিন সার্ভিসের সম্প্রচারকদেরকে চিনি কিনা। সেখানে কর্মরত আমাদের এক সহকর্মী বেটি সু’কে তার নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল।

চীনা নেতাদের জন্য ওই বিক্ষোভ ছিল লজ্জাজনক ব্যাপার। তারা অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন। তবে সোভিয়েত প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভের ঐতিহাসিক সফরের পর অভিযান দেরীতে করার সিদ্ধান্ত নেন তারা।

গর্বাচেভ চলে যাওয়ার পরই সামরিক আইন জারি করা হয়। সভা সমাবেশ বিক্ষোভ এবং লোকজন জড়ো হওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। হু ইয়াওবাং এর উত্তরসূরী ঝাও জিয়াংকে কব্জা করা হয়। স্কোয়ারে গিয়ে তিনি ১৯শে মে ছাত্রদেরকে ঘরে ফিরে যাওয়ার অনুরোধ জানালেও তারা সেখানে থেকে যান।

দুই সপ্তাহ পর সেনা সদস্যদেরকে স্কোয়ার খালি করার আদেশ দেয়া হয়। রুখে দাড়ান হাজারো সাধারন জনতা। কয়েকবার চেষ্টা করে অস্ত্রহীন সেনা সদস্যরা ৩রা জুন অস্ত্র শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সেখানে ফিরে আসেন।

৪ঠা জুন তারা অভিযান চালিয়ে তিয়েনানমেন স্কোয়ার খালি করেন। কেউ বলতে পারবে না সেদিন কতো মানুষ মারা যান। আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের হিসাবে কয়েক শত বা কয়েক হাজার।

দেশের নিয়ন্ত্রণ নেয় সেনাবাহিনী। পহেলা জুনসহ আমি বহুবার তিয়েনানমেন স্কোয়ারে গিয়েছি। বিদেশী বলে সেখানে থাকতে মানা করা হয়েছে। আমরা পাশে লুকিয়ে থেকেছি। তবে ভাগ্যের কথা হচ্ছে বিদেশীরা আহত ও গুলীবিদ্ধ হননি।

পরে আমি সেদিনের অভিযানের শিকার বহু লোকের সঙ্গে কথা বলি। পরেরদিন ছিল আরো আতংকপূর্ন, কারন অভিযানের আদেশ স্বত্বেও অনেক চীনা সেনা ইউনিট তা পরিচালনা করতে অস্বীকৃতি জানাতে থাকে। আমি খবর পাঠাতে থাকি সেসব অবস্থার।

১৪ই জুন নাগাদ পরিস্থিতি শান্ত হতে থাকে। আমার কাছে ফোন আসে। বেইজিং মিউনিসিপ্যাল কার্যালয় থেকে বলা হয় ‘তিয়েনানমেন স্কোয়ার ত্যাগ করতে হবে’ এই মর্মে আমার বিরুদ্ধে আদেশ জারি হয়েছে। শুনানীর জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসে যাই। সেখানে বলা হয় সামরিক আইনের বিরুদ্ধে নিয়ম ভঙ্গ করে আমি সংবাদ প্রচার করেছি। আমার বিরুদ্ধে অবৈধ সংবাদ সংগ্রহ ও বিদ্রোহ উস্কে দেয়ার অভিযোগ তোলা হয়। ৭২ ঘন্টার মধ্যে চীন ত্যাগ করার আদেশ হয় আমার বিরুদ্ধে।

তিন দিন পর নানা ঘটনার পর আমরা হংকং এর উদ্দেশ্যে বেইজিং ত্যাগ করি। ১৯৮৯ সালের সেই ঐতিহাসিক ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আমি। এরপর কায়রোর তাহরির স্কোয়ার, ত্রিপলীর মার্টারস স্কোয়ারসহ বহু গনতান্ত্রিক আন্দোলন দেখার সুযোগ হয় আমার। এ বছর দেখছি কিয়েভের ইন্ডিপেন্ডেন্স স্কোয়ারে এক ইরকম আন্দোলন।

১৯৮৯ থেকে চীন এখন অন্যরকম এক চীন। চীন এখন আধুনিক ও প্রগতিশীল এবং বিশ্বের অন্যতম প্রধান অর্থনীতির দেশ। তবে এখনো সেখানে রাজনৈতিক সংস্কার বিষয়টি সকলের কাছে লুকিয়ে রাখা একটি বিষয়। আমার সন্দেহ নেই চীনা জনগন একদিন এই দাবীতে নাটকীয় ভাবে এগিয়ে আসবে, ২৫ বছর আগের মতোই।
XS
SM
MD
LG