অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা


Sheikh Hasina addresses UNGA

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত রাতে নিউ ইয়র্ক সময়ে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ দেন। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে উপস্থিত আনিস আহমেদ ঐ ভাষণ সম্পর্কে নিউ ইয়র্ক থেকে পাঠিয়েছেন বিস্তারিত এই প্রতিবেদন:

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে একদিকে যেমন বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের চালচিত্র তুলে ধরেন, অন্যদিকে ঠিক তেমনি তিনি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সমন্বয় ও সহযোগিতার প্রসঙ্গটিও উত্থাপন করেন। উগ্রবাদী সহিংসতা সহ এখনকার বিশ্ব যে সব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে তা মোকাবিলায় বিশ্ববাসীর সমন্বিত প্রচেষ্টার কথা বলেন, বলেন বর্তমান সময়কার প্রযৌক্তিক উন্নয়নের কথাও। তাঁর ভাষণের গোড়াতেই প্রধানমন্ত্রী হাসিনা সকৃতজ্ঞ ধন্যবাদ জানান জাতিসংঘের মহচিব বান কী মুনকে যাঁর দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হচ্ছে চলতি বছর। শান্তির প্রতি বাংলাদেশের অবিচল আস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ভাষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ উদ্ধৃত করে বলেন, বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন “শান্তির প্রতি যে আমাদের পূর্ণ আনুগত্য, তা এই উপলদ্ধি থেকে জন্মেছে যে, একমাত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই আমরা ক্ষুধা, দারিদ্র্য, রোগ-শোক, অশিক্ষা ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য আমাদের সকল সম্পদ ও শক্তি নিয়োগ করতে সক্ষম হবো।”

এই প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন আমাদের বিশ্ব বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যখন এ সকল অভিশাপ থেকে মুক্তি খুব একটা দূরে নয়। অনেক সৃজনশীল এবং প্রায়োগিক সমাধান এখন আমাদের নাগালের মধ্যে। সেই সঙ্গে বর্তমান বিশ্ব যে সব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন সে বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন আমাদের এই বিশ্ব এখনও উত্তেজনা ও ভীতিকর পরিস্থিতি থেকে মুক্ত নয়। তিনি বলেন এখান থেকেই বিশ্বে এখন শরনার্থি সমস্যা প্রকট হয়েছে এবং দেশান্তরী মানুষের ঢল নেমেছে। তিনি প্রশ্ন করেন কী অপরাধ ছিল সাগরে ডুবে যাওয়া সিরিয়ার ৩-বছর বয়সী নিষ্পাপ শিশু আইলান কুর্দীর? কী দোষ করেছিল ৫-বছরের শিশু ওমরান, যে আলেপ্পো শহরে নিজ বাড়িতে বসে বিমান হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে? অতএব শরনার্থী সমস্যাকে পাশ কাটিয়ে না গিয়ে অভিবাসী ও শরনার্থিদের স্বদেশ এবং গন্তব্য দু জায়গাতেই সম্ভাবনাময় পরিবর্তনের নিয়ামক হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

শেখ হাসিনা Sustainable Economic Goal বা SDG অর্থাৎ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অর্থাৎ এসডিজির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে, বাংলাদেশের উন্নয়নের চালচিত্রটি তুলে ধরেন। তিনি বাংলাদেশে বড় রকমের অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিকল্পনা কথা বলেন।

তিনি বলেন নিজস্ব অর্থায়নে আমরা ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা বহুমুখী সেতু নির্মাণ করছি। একটি গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের আলোচনা চলছে। তৃতীয় সমুদ্র বন্দর পায়রার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। রাজধানী ঢাকা শহরে মেট্রোরেলের নির্মাণ কাজও শুরু হয়েছে।

সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার সুযোগ তৈরি করে দিতে দেশব্যাপী একশটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। শেখ হাসিনা অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি তাঁর দেশে জনসম্পদ উন্নয়নের প্রসঙ্গটিও তুলে ধরেন। স্বাস্থ্য উন্নয়ন প্রসঙ্গে কথা বলেন তিনি।

নারীর ক্ষমতায়নকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যাপ্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখেন বলে উল্লেখ করে নারী শিক্ষা প্রসার নিয়ে কথা বলেন।

তিনি আরও বলেন বাংলাদেশের নারীরা এখন উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশীদার। প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন নারী এখন আমাদের প্রধানতম রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত। সকল পেশায় নারীর অংশগ্রহণের হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেন এটা বোধ হয় ব্যতিক্রমি ব্যাপার যে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী, সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, সংসদে উপনেতা সকলেই নারী।

বাংলাদেশে উন্নয়নের বিভিন্ন দিক তুলে ধরার পাশপাশি শেখ হাসিনা বলেন অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান নিয়ামক হিসেবে বিশ্বের সকল নাগরিকের কাছে ব্রডব্যান্ড সংযোগ পৌঁছে দেয়া প্রয়োজন। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য আমি বিশ্ব নেতৃবৃন্দের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সমবেত প্রয়াস কামনা করছি। সকলের দোরগোড়ায় ভয়েস ও ডাটা সংযুক্তি পৌঁছে দিতে আমাদের সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দেশ যেখানে সীমিত সম্পদের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে দারিদ্র্যের হার দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। দারিদ্র্যের হার ১৯৯১ সালের ৫৬.৭ শতাংশ হতে বর্তমানে ২২.৪ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। আমরা ইতোমধ্যে ইউএনডিপি’র মানব উন্নয়ন ক্যাটাগরিতে মধ্যম এবং বিশ্বব্যাংকের মান অনুযায়ী নিম্ন মধ্যম-আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছি। জলবায়ু পরিবর্তন যে বিশ্বকে এক নতুন সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে সে দিকে আলোকপাত করে বলেন ঐতিহাসিক প্যারিস জলবায়ু চুক্তিটি অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি এবং জলবায়ু সম্পর্কিত ন্যায় বিচারের গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই এই জলবায়ু চুক্তিটি অনুসমর্থন করেছে। তনিি আশা করনে বৃহৎ কার্বন নিঃসরণকারী দেশগুলি অতি সত্বর চুক্তিটিতে অনুসমর্থন জানাবে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবিস্তারে সন্ত্রাসবাদ এবং সহিংস উগ্রবাদের বিষয়টি তাঁর ভাষণে বিশেষ গুরুত্বের সংগে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন সন্ত্রাসবাদ ও জংগিবাদ এখন কোন নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ না থেকে বিশ্বের সকল স্থানেই ছড়িয়ে পড়ছে। কোন দেশই আপাতঃদৃষ্টিতে নিরাপদ নয়, কোন ব্যক্তিই এদের লক্ষ্যবস্তুর বাইরে নয়।

প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন বাংলাদেশে যেসব সন্ত্রাসী গ্রুপের উদ্ভব হয়েছে, তাদের নিষ্ক্রিয় করা, তাদের নিয়মিত অর্থ সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা এবং বাংলাদেশের ভূখন্ড থেকে আঞ্চলিক সন্ত্রাসীদের কার্যক্রম নির্মূল করার ক্ষেত্রে আমাদের সরকার সফল হয়েছে। কয়েকটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীচক্রের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় কিছু প্রান্তিক গোষ্ঠী তাদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে পুনঃসংগঠনের মাধ্যমে নতুনরূপে আবির্ভূত হয়ে থাকতে পারে। গত ১লা জুলাই ঢাকায় সন্ত্রাসী হামলার কথা উল্লেখ কের শেখ হাসিনা বলেন সেই ঘটনা বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে এক গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন বর্তমানে বাংলাদেশও এই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে জনগণের কাছ থেকে তিনি যে সাড়া পাচ্ছেন সে প্রসঙ্গে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে জনগণের দৃঢ়তায় ও সহযোগিতায় বাংলাদেশের মাটি থেকে সন্ত্রাসীদের সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব হবে। সন্ত্রাস দমনে তিনি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়টির কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন বাংলাদেশ জাতিসংঘের অন্যতম প্রধান কর্মসূচি ‘শান্তির সংস্কৃতি’র বিস্তারের পক্ষে প্রচার চালিয়ে যাবে। শান্তি রক্ষা এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদশেরে অবদান অব্যাহত থাকবে। ঢাকায় ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা কেন্দ্র’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত সহিংসতার কবল থেকে বেরিয়ে আসা দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদশেরে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ করে দেবে। বাংলাদেশে হত্যার রাজনীতির অবসান ঘটানো এবং সুষ্ঠু বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এর বিচার করা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য স্থানীয় অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদশে বিগত কয়েক দশকের বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছ। শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে মানবিক ঐক্যের প্রতি জোর দেন। বলেন মতের ভিন্নতা সত্বেও, মানুষের মঙ্গলের জন্য, মানবতাবোধের জন্য সবাইকে একত্রিত হতে হবে এবং সে ক্ষেত্রে জাতিসংঘই হতে পারে একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান। এই সংস্থাকে আরও টেকসই ও প্রাসঙ্গিক করে তুলতে তিনি নতুন সবাইকে নতুন করে শপথ নেবার আহ্বান জানান।

XS
SM
MD
LG