অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

গীতাকে পাওয়া গিয়েছিলো লাহোর রেল স্টেশানে দু’ হাজার তিন সালে


মানুষের জীবন-বাস্তব এ পৃথিবী- আমাদের চারপাশে প্রতিদিন ঘটছে যা, তার অনেক কিছুই কল্প কাহিনীর চেয়েও বেশি বিচিত্র হতে পারে। আর সে কথারই প্রতিধ্বনী মিললো আমাদের নতুন দিল্লি সংবাদদাতা আনজানা পাসরীচার এই রিপোর্টটিতে – যার বঙ্গানুবাদ শোনাচ্ছেন সরকার কবীরূদ্দীন।

ভারত-পাকিস্তান এক দেশ আরেক দেশের ঘোর শত্রু সে আজ দীর্ঘকাল যাবতই-বলা যায়, সেই ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পর মুহুর্ত থেকেই প্রায়। দু’দেশের মধ্যে বাকায়দা যুদ্ধ হয়েছে তিন তিনবার- সীমান্ত লড়াই হয়েছে অসংখ্যবার।এরই মাঝে কখনো সখনো দু’দেশের মধ্যে এমন কিছু মন ছূঁয়ে যাওয়া ঘটনাও ঘটতে দেখা গিয়েছে যার কথা শোনা গিয়েছে যা কিনা দু’দেশের প্রশাসন-রাজনৈতিক দলগুলোর তথাকথিত লক্ষাদর্শকেও ডিঙ্গিয়ে দু’ দেশের সাধারণ মানুষকে মানবিক অনুভুতির নাঙ্গরদোলায় অনাবিল আনন্দে মাতোয়ারা করে তুলেছে-মানুষ ভাবতে শুরু করেছে- আহা মানুষ তো মানুষই-ধর্ম ভিন্ন ভিন্ন হলেও শিকড় তো একই, যাবে কোথায়- দূরে সরলেও কতো দূরেই বা সরবে।সিনেমার পর্দায় বাজরাঙ্গি ভাইজান ছবি দেখে কেঁদেকেটে আকূল হয়েছে দূ’দেশেরই অসংখ্য সাধারন মানুষ।

এখন যে ঘটনার কথা আমরা বলতে চলেছি তা কিন্তু কোনো সিনেমার গল্প নয়।ঘটেছে বাস্তবে।

লাল টুকটুকে শালোয়ার কুর্তা পরা বছর বিশের এক যুবতি-নারী বেরিয়ে এলো উড়োজাহাজের ভেতর থেকে-নতুন দিল্লি বিমান বন্দরে। নাম তার গীতা।ভারত সরকারের কিছু কর্তাব্যক্তি- পাকিস্তান দূতবাসের কয়েকজন কূটনীতিক স্বাগত: জানালেন গীতাকে- ঈসৎ হেসে জবাব দিলেন গীতা। গীতার সঙ্গে ছিলেন পাকিস্তানের ইধি ফাউন্ডেশানের কয়েক সদস্য। করাচীতে এঁরাই গীতার দেখভাল করেছেন এতোদিন।ভারত-পাকিস্তান সীামান্তকে বলা হয় বিশ্বের অন্যতম নীশ্ছিদ্র সীমান্ত-অতন্দ্র প্রহরার বেড়াজালে আটক যে সীমান্ত রেখা। আর ঐ সীমান্ত পেরিয়েই, গীতা ভারত থেকে কিভাবে পাকিস্তান ভূখন্ডে পৌঁচেছিলেন- সেটা এক বিস্ময় অনেকের কাছেই- যখন গীতা ঐ সীমান্ত পেরিয়েছিলেন বয়স ছিলো তাঁর সবেই এগারো- আজ যুবতী বয়সি গীতার কাছেও ঐ সীমান্ত অতিক্রমন রহস্যঘেরা একটা ঘটনা।গীতা বলতে পারেন না কিভাবে কি ঘটেছিলো। কোনো কোনো রিপোর্টে জানা গিয়েছে গীতাকে পাওয়া গিয়েছিলো লাহোর রেল স্টেশানে দু’ হাজার তিন সালে। পাকিস্তানের আরক্ষা বাহিনী উদ্ধার করেছিলো গীতাকে। গীতার এ কাহিনী, ঐ আগে যেমনটি বলেছি, সেই বাজরাঙ্গি ভাইজান ছবিটির কথা মনে করিয়ে দেয় অনেককে,অনেকেই কেঁদে ভাসিয়েছিলো পেপার ন্যাপকিন আর রুমাল সিনেমা হলের সীটে বসে – ছবি দেখতে দেখতে।তবে বাজরাঙ্গি ভাইজানের শাহিদা বিচ্ছিন্ন হয়েছিলো পাকিস্তানের পর্বত সংকূল এক অঞ্চল থেকে- গিয়ে পৌঁচেছিলো ভারতীয় ভূখন্ডে- আর আমাদের এ কাহিনীর গীতা লাহোর পৌঁচেছিলেন ট্রেনে চড়ে – কিভাবে এখনো নিশ্চিতভাবে সেটা জানা যায়নি। গিতার উদ্ধার পরবর্তী পর্বে ভারত কতৃপক্ষ যে ফটো পাকিস্তানকে পাঠিয়েছিলো এবং যে ফটোর লোকজনকে গীতা নিজ পরিবার বলে চিহ্নিত করেছিলেন সে ফটোর পরিবারকে চিনতে পারেন নি গীতা দিল্লি পৌছুনোর পর -পিতা বলে যাঁর উল্লেখ করা হয় তাঁকে, ফটোর তিন ভাইকে গীতা চিনতে পারেন নি বলেই উল্লেখ করা হয়েছে।গীতা ফটোর ঐ পরিবারেরই কন্যা কিনা নিশ্চিত করতে এখন DNA পরিক্ষা চালানো হচ্ছে।

গীতার সঙ্গে একযোগে উপস্থিত হন এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ স্বয়ং। তিনি জানান- গীতার পরিবারকে খুঁজে বের করতে- গীতাকে পরিবারের কাছে পৌঁছিয়ে দিতে সকল প্রকার চেষ্ট চালানো হবে ।ভারতের সংবাদ মাধ্যমকে তিনি জানান-পরিবারের লোকজনকে খুঁজে পাওয়া যাক বা না যাক- গীতা ভারতের কন্যা, তাঁর দেখভাল ভালভাবেই হবে ভারতে।

পাকিস্তানে যেভাবে গীতার দেখাশোনা হয়েছে শাহিদাকে নিয়ে বাজরাঙ্গি ভাইজান বানিয়েছেন যে চিত্র নির্মাতা সেই কবীর খান তাতে অভিভুত।ইধি ফাউন্ডেশান যখন জানতে পারে যে গীতা হিন্দু কন্যা- তখনই তারা তার জন্যে হিন্দু ধর্মিয় বিধান মোতাবেক মন্দীরে গিয়ে তাঁর উপাসনার বন্দোবস্ত করে দেন-প্রতিমা জোগাড় করে দেন তাঁরা এবং এই যে গীতা নামটি, এটাও ইধি ফাউন্ডেশানেরই দেওয়া নাম।

ভারত-পাকিস্তান দু’দেশেই রাজনৈতিক কূটকাচালী- দ্বন্দ বিরোধের পাশাপাশিই গীতাকে নিয়ে এই যেসব খবরাখবর এখন শোনা যাচ্ছে- দু’দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তা সৌভ্রাতৃত্ব গড়ার পরশমনি হিসেবে কাজ করছে বলে অনেকের ধারনা। নতুন দিল্লিতে পাকিস্তানের হাই কমিশনার মানযুর মেমন ভারতের জেলে আটক চার শ’ উনোশাট পাকিস্তানীর বন্দী দশা ঘুঁচিয়ে তাঁদের মুক্ত করার জন্যে ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন-যাতে তাঁরা দেশে ফিরে নিজ নিজ পরিবার পরিজনের সঙ্গে আবার মিলিত হবার সুযোগ পান।যেমন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে আমাদের আজকের এ সংবাদ কাহিনীর গীতার জন্যে।


XS
SM
MD
LG