অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

শিরায় মাদক সেবনের মাধ্যমে এইচআইভি সংক্রমিতদের কথা - প্রথম পর্ব


আঙ্গুর নাহার মন্টি
ঢাকা রিপোর্টিং সেন্টার
সহযোগিতায় - ইউএসএআইডি ও ভয়েস অফ আমেরিকা

“আমি যখন প্রথম নেশা করি তা পরিবারের কেউ জানে না। আস্তে আস্তে যখন খারাপ পথে যাই তখন বাড়িতে জানাজানি হয়। আমি তখন ঘরে-বাইরে চুরি করি, সবাই বিরক্ত হয়। বিরক্ত হওয়ার পরও আমাকে সাপোর্ট দেয়। রিহ্যাবে ভর্তি করলে আমি সুস্থ হই। নেশা করতে গিয়ে অনেক সময় ঝুঁকি আইয়া পড়ে। কোত্থেকে কিভাবে আহে কেউ বলতে পারে না। ব্লাড টেস্ট করলে বোঝা যায় তার ভিতরে কি রোগ আছে। সে সতর্ক হয়ে গেল। তার উছিলায় আরেকটা ভাই বাঁইচা গেলো”।

আমরা শুনছিলাম বাংলাদেশের একজন এইচআইভি সংক্রমিত সিরিঞ্জ বা ইনজেকশনের মাধ্যমে রক্তের শিরায় মাদক গ্রহণকারী ব্যক্তির কথা। আক্রান্ত ব্যক্তির সাথে মাদক গ্রহণের সময়, একই সিরিঞ্জ ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি এইচআইভি সংক্রমিত হয়েছেন। প্রথমে, তিনি তাঁর সংক্রমিত হওয়ার কথা গোপণ রেখেছিলেন। আজ তিনি এইচআইভি-এইডস সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করার জন্য নিজের কথা এভাবেই তুলে ধরছেন।

এই ব্যক্তির মতো আরো অনেকের দেখা মিলল, বেসরকারী সংস্থা ‘মুক্ত আকাশ বাংলাদেশে’র বকশীবাজারের ‘মধুমিতা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে’। এখানে এসে তাঁরা জেনেছেন, নিজেদের এইচআইভি সংক্রমিত হওয়ার কথা। প্রথমে তারা ব্যাপারটি মানতেই চান নি। অনেকে জানেন না- এইচআইভি কি ?

এরকম সময়ে মধুমিতার স্বাস্থ্যকর্মীরা তাঁদের দিকে সেবা ও সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে দেন। এ ব্যাপারে কথা হলো মুক্ত আকাশ বাংলাদেশের কর্মসূচী কর্মকর্তা সালমা সুলতানার সঙ্গে।

তিনি বললেন – “যখন একজন মানুষ জানতে পারে সে এইচআইভি পজিটিভ প্রথমেই সে মানসিকভাবে অনেক ভেঙে পড়ে। সে চিন্তা করে ড্রাগ বেশি নেবে, বেচেঁ থেকে কি লাভ হবে, আত্মহত্যা করতে চায়। তারপর সে যখন আস্তে আস্তে সেবা ও কাউন্সিলিং পায় তখন আবার বেচেঁ থাকার আশ্বাস পায়”।

জাতীয় এইডস-এসটিডি প্রোগ্রামের তথ্যমতে, ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে মোট এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ২,৮৭১ জন এবং এইডস রোগী মোট ১,২০৪ জন। এখন পর্যন্ত এইডসে মারা গেছেন মোট ৩৯০ জন। আর ২০১২ সালের তথ্য অনুযায়ী, ঐ বছর নতুন করে এইচআইভি সংক্রমিত হয়েছে ৩৩৮ জন। ২০১২ সালে দেশে এইডস রোগীর সংখ্যা ছিল মোট ১০৩ জন এবং এইডসে মারা গেছেন ৬৫ জন।

এদিকে ২০০৫ এর এইচআইভি ও এইডস বিষয়ক ইউএনএইডস’এর পরিসংখ্যান রিপোর্ট অনুসারে, বাংলাদেশে এইচআইভি-এইডস সংক্রমণের হার ১ শতাংশের নিচে৷ তবে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণকারীদের মধ্যে সুঁই-সিরিঞ্জের মাধ্যমে শিরায় মাদকসেবনকারীদের সংক্রমণের হার ৫.৩ শতাংশ। আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এইচআইভি-এইডস সংক্রমণের হার যদি শতকরা ৫ ভাগ ছাড়িয়ে যায় তাহলে তাকে মহামারি বলতে হবে৷ এই হিসাব অনুসারে, বাংলাদেশে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদকসেবনকারীদের ব্যাপারে বিশেষ সতর্ক বার্তা এসে গেছে। তাই শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের প্রতি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও দাতাগোষ্ঠী বিশেষ নজর দিচ্ছে।

এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের সহযোগীতায় ও ইউএসএআইডির অর্থায়নে মধুমিতা প্রকল্প বাংলাদেশের ১৮টি জেলায় পরিচালিত হচ্ছে। এইচআইভি-এইডস প্রতিরোধে এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সেবাদান ও তাঁদের প্রতি বৈষম্য দূরীকরণ এর লক্ষ্য। এ প্রকল্পের আওতায় মোট ৩৩টি মধুমিতা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ৫টিতেই এইচআইভি প্রতিরোধের অংশ হিসেবে শিরায় মাদনসেবনকারীদের সেবা দেয়া হয়।

এসব কেন্দ্রে তাঁরা স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছেন ঠিকই, কিন্তু সমাজে নানা অপমান আর বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তির স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার থাকলেও তাঁর সংক্রমণের কথা জানাজানি হলে কাজ তো দূরের কথা, বাসাভাড়াও পাওয়া কঠিন হয়। তাঁদের দুদর্শা আর অধিকার নিয়ে কথা বলবো আগামী প্রতিবেদনে। ততক্ষন পর্যন্ত সবাই সচেতন থাকুন, সুস্থ থাকুন।



XS
SM
MD
LG