অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

সিরিয়ায় ইরানি হস্তক্ষেপ এবং অন্যান্য প্রসঙ্গে মাইকেল রায়ানের বিশ্লেষণ


সম্প্রতি এরকম খবর পাওয়া গেছে যে সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে শত শত ইরানি সৈন্য সমবেত হয়েছে এবং রাশিয়ার বিমান অভিযানের সাহায্যে তারা সিরিয়ার সৈন্যদের স্থল যুদ্ধে সহায়তা করবে। ইরানি সৈন্যরা তাদের লেবনানী মিত্র হেজবুল্লাহর সঙ্গে ও যুক্ত হয়েছে বলে বলা হচ্ছে । এর ফলে সেখানকার যুদ্ধক্ষেত্রের পরিস্থিতি যেমন জটিল হয়েছে , তেমনি আঞ্চলিক রাজনৈতিক ও কুটনৈতিক পরিস্থিতি ও ক্রমশই জটিল হয়ে উঠছে । এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছেন ওয়াশিংটন ডি সি’র Middle East Institute এর Adjunct Scholar এবং দ্য জেইমসটাউন ফাউন্ডেশানের সিনিয়ার ফেলো , ড মাইকেল রায়ান ।

স্পষ্টতই বিবাদিত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সমর্থনে ইরানের এই প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ ঐ বিভাজিত অঞ্চলে কি ধরণের প্রভাব ফেলতে পারে , এই প্রশ্নের জবাবে ড. মাইকেল রায়ান প্রথমে বলেন যে কয়েক হাজার ইরানি সৈন্য পাঠানোর যে সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে সেটা ঐ অঞ্চলের পরিপ্রেক্ষিতে খুব যে একটা বড় সংখ্যা তা নয়। তা ছাড়া ইরানের উচ্চ পর্যায়ের সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন যে এদের মূল ভূমিকা হবে পরামর্শদাতার । তবে ড রায়ান এ কথা ও বলেন যে হেজবুল্লাহর সঙ্গে তারা যখন যুক্ত হয় তখন কিন্তু তারা কেবল পরামর্শক নয় সৈন্য হিসেবেই বিবেচিত হয়। আর রাশিয়ার এই অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে আসলে দেখা যায় যে রুশ স্বার্থের সঙ্গে ঐ অঞ্চলের ধর্মীয় গোষ্ঠিগত স্বার্থ মিলে যায়। সেটা হয়ত ঐ অঞ্চলে তেমন উত্তেজনা সৃষ্টি করবে না তবে এ যেন এই ব্যাপারটাকে আরও পরিস্কার করে তুলে ধরছে যে সেখানে সুন্নি উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের তীব্র বৈরিতা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া উভয়ই সিরিয়ায় পরস্পরের ভূমিকার স্পষ্টতই সমালোচনা করছে । যুক্তরাষ্ট্র মনে করে রুশ এই অভিযানের মূল লক্ষ্য হচ্ছে বাশার আল আসাদ ও তার সরকারকে টিকিয়ে রাখা আবার রাশিয়ার অভিযোগ হলো যে সেখানে আইসিস জঙ্গিদের পরাস্ত করতে কিংবা অন্তত তাদেরকে কোণঠাসা করতে যুক্তরাষ্ট্র বাহ্যত ব্যর্থ হচ্ছে । এই মেরুবর্তী মতামত সম্পর্কে মাইকেল রায়ানের অভিমত হলো ঐ অঞ্চলে রাশিয়ার পরিকল্পনা কি সে ব্যাপারে সন্দেহের বিন্দুমাত্র ও অবকাশ নেই এবং এ ব্যাপারে আমেরিকান প্রশাসনের মনে ও কোন সংশয় নেই । গোড়াতে রাশিয়া বলেছিল যে তারা আইসিসের বিরুদ্ধে লড়তে সেখানে গেছে। তবে শিগগিরই এটা পরিস্কার হয়ে যায় যে তারা আইসিস শব্দটি ব্যবহার করে বস্তুত যে কোন সন্ত্রাসী বোঝাতেই আর রাশিয়া আসাদ সরকারের বিরোধী সবাইকেই সন্ত্রাসী বলে মনে করে। অতএব মূলত এটি ছিল রাশিয়ার পক্ষে এক ধরণের অপপ্রচার যা অবশ্য এই রকম পরিস্থিতিতে রাশিয়ার পক্ষে অস্বাভাবিক কিছুই নয়। আর আমেরিকান প্রশাসন ও এই বাস্তবতাই তুলে ধরে যে রাশিয়ার কথা ও কাজের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে বিস্তর। আর তাছাড়া এই অভিযানের সামরিক বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে যে রাশিয়া যে সব জায়গায় বিমান আক্রমণ চালাচ্ছে সেখানে আইসিসের চাইতে আসাদ-বিরোধীরাই রয়েছে বড় সংখ্যায় এবং তারা লেভান্ত অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। তারা মূলত মূল সিরিয়ার ঘন বসতিপুর্ণ এলাকা সুরক্ষিত করার চেষ্টা করছে এবং পুর্ব দিকের মরু অঞ্চলে , তুরস্ক কিংবা ইরাকের কাছাকাছি এলাকাগুলো আইসিস কিংবা অন্যান্যদের হাতে ছেড়ে দিচ্ছে।

অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন সিরিয়ায় রাশিয়ার প্রত্যক্ষ ও নিবিড় হস্তক্ষেপ সম্ভবত সেখানকার সমস্যার কোন দ্রুত সমাধান আনবে না । বরঞ্চ আফগানিস্তানের মতো সেখানকার লড়াই হতে পারে দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী । এই মন্তব্যের সঙ্গে ড রায়ান ও সহমত পোষণ করেন।

তিনি আরও বলেন যে রাশিয়া যে কথা বলছে যে সেখানে তাদের ভূমিকা সীমিত , সেটা তারা নিজেরাই বিশ্বাস করে কী না সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে । অনেক রিপোর্টেই বলা হচ্ছে যে তারা সেখানকার লাতাকিয়া প্রদেশে অতিরিক্ত বিমান ঘাঁটি নির্মাণ করছে । বাহ্যত হয়ত তারা সীমিত ভূমিকা পালন করবে কিন্তু আসাদ সরকারকে বাঁচিয়ে রেখে তারা তাদের প্রভাব বজায় রাখবে। আর এটা ও সত্যি কথা যে সেখানকার সমস্যাগুলোর সমাধার কি ভাবে হতে পারে তার চাবিকাঠি বস্তুত কারও হাতে আছে বলে মনে হয় না। এটাতো ঠিক যে সামরিক তৎপরতা তো অনির্দিষ্ট কালের জন্য চলতে পারে না , একটা নিস্পত্তিতে আসতেই হবে। কিন্তু রাজনৈতিক সমাধানটাই বা কি ? সেটা ও তো পরিস্কার নয়। আর সে জন্যই মনে হচ্ছে সেখানে দীর্ঘ দিন ধরে লড়াই চলতেই থাকবে। তবে রাশিয়া প্রাথমিক ভাবে আসাদ সরকারকে সিরিয়ার মূল ভূখন্ডে নিশ্চিত ভাবে প্রতিষ্ঠিত রাখার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু এর বেশি কিছু নয়। মনে রাখা দরকার যে কেবল আর্থিক ভাবেই নয় , সামরিক সাজসরঞ্জামের দিক থেকেও এটা হচ্ছে রাশিয়ার জন্য অত্যন্ত ব্যয় বহুল এক অভিযান।

যে আইসিসকে দমন করার কথা যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া উভয়ই বলছে , সেই আইসিস কি শেষ পর্যন্ত একেবারেই কোণঠাসা হয়ে পড়বে না কি আফগানিস্তানে আল কায়দা ও তালিবানের মতো একটা স্থায়ী সমস্যা হয়ে থাকবে ? এ সম্পর্কে ড মাইকেল রায়ানের অভিমত হলো আইসিস শেষ পর্যন্ত সবার জন্যই একটা বড় রকমের সমস্যা হয়েই থাকবে ।অন্যদের কৌশল বোঝা মুস্কিল হতে পারে কিন্তু আইসিসের কৌশল বেশ পরিস্কার। তাদের চাইছে একটি অঞ্চল তাদের নিয়ন্ত্রণে নিতে যাকে তারা নিজেদের বলে দাবি করতে পারবে। তারা হয়ত তাদের এলাকার সম্প্রসারণ করার চেষ্টা করবে কিন্তু ঠিক লড়াইয়ে সম্পৃক্ত নাও হতে পারে। তবে সিরীয় অঞ্চলের বেশ কিছুটা তারা দখল করেছে কাজেই সেখানেতো ইরানি পরামর্শকদের সাহায্যে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাদের লড়াই হতেই পারে। আর তখন তাদের এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা সেখানে টিকে থাকার চেষ্টা করবে না কি সেখান থেকে সরে আসবে। তারা হয়ত নিজেদের পুরোনো অবস্থানেই ফিরে যাবে। আমেরিকানরা ছাড়া অন্যরা বোধ হয় তাদের সেখানে অবস্থান করার খুব একটা বিরোধী নয় যদি না তারা ক্রমাগত সমস্যা সৃষ্টি করতেই থাকে। তবে একথা বলাই বাহুল্য যে আইসিস সেখানকার জটিল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে রাখবে দীর্ঘ দিন, হয়ত রয়ে যাবে বিষ ফোঁড়া হয়ে।

XS
SM
MD
LG