অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

ওবামা আফগানিস্তান থেকে ৩৩ হাজার সৈন্য প্রত্যাহারের আদেশ দিলেন


ওবামা আফগানিস্তান থেকে ৩৩ হাজার সৈন্য প্রত্যাহারের আদেশ দিলেন

ওবামা আফগানিস্তান থেকে ৩৩ হাজার সৈন্য প্রত্যাহারের আদেশ দিলেন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা , ওয়াশিংটনে বুধবার রাতে , হোয়াইট হাউজে দেওয়া এক ভাষণে আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করেন। নীচে এই ভাষণের বৃহত্তর অংশ দেখুন :

শুভ সন্ধ্যা। প্রায় দশ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র পার্ল হারবারের আক্রমণের শিকার হবার পর , আমাদের ভূমিতে সব চেয়ে মারাত্মক আক্রমণের শিকার হয়। এই গণহত্যার পরিকল্পনা করে ওসামা বিন লাদেন ও আফগানিস্তানে তার আল ক্বায়দা চক্র এবং আমাদের নিরাপত্তার বিরুদ্ধে নতুন হুমকির ইঙ্গিত দেয় , যেখানে আর যুদ্ধক্ষেত্রের সৈন্যরা এই আক্রমণের লক্ষ্য রইলো না, লক্ষ্য হলো, দৈনন্দিন জীবনযাপনকারী নিরপরাধ নারী , পুরুষ ও শিশু।

পরবর্তী দিনগুলোতে আমরা জাতি হিসেবে একতাবদ্ধ হয়ে আল ক্বায়দার উপর আঘাত হানি এবং আফগানিস্তান থেকে তালিবানদের বিতাড়িত করি। তার পর আমাদের মনোযোগ অন্য দিকে নিবিষ্ট হয়। ইরাকে দ্বিতীয় আর একটি যুদ্ধ শুরু হয় এবং সেখানে আমরা একটি নতুন সরকারকে সমর্থন দিতে প্রচুর রক্ত ও অর্থ ব্যয় করি। আমি এই দায়িত্ব যখন গ্রহণ করি , তখন আফগানিস্তানের যুদ্ধ সপ্তম বছরে পৌছেছে। কিন্তু আল ক্বায়দার নেতারা পাকিস্তানে পালিয়ে যায় এবং তারা নতুন আক্রমণের ষড়যন্ত্র করতে থাকে আর তালিবানরা আবার সংগঠিত হয় আক্রমনাত্মক অবস্থায় চলে আসে। , আমাদের সেনা অধিনায়করা আমাদের সতর্ক করে দেন যে নতুন কোন কৌশল এবং চূড়ান্ত কোন ব্যবস্থা ছাড়া আমাদের পুনরুত্থিত আল ক্বায়দা এবং আফগানিস্তানের বৃহত্তর অংশ দখলে উদ্যত তালিবানদের সম্মুখীন হতে হবে।

এই কারণে , প্রেসিডেন্ট হিসেবে গৃহীত আমার অন্যতম এক কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল আফগানিস্তানে অতিরিক্ত ৩০,০০০ আমেরিকান সৈন্য পাঠানো। আমি যখন ওয়েস্ট পয়েন্ট এ এই অতিরিক্ত সৈন্য পাঠানোর ঘোষণা দিই , তখণ আমরা এর স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করি, যেগুলো হচ্ছে , আল ক্বায়দার ব্যাপারে অধিকতর মনোযোগ দেওয়া , তালিবানের গতিকে রুদ্ধ করা এবং নিজ দেশের প্রতিরক্ষার জন্যে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা। আমি এটাও পরিস্কার করে বলেছি যে আমাদের এই প্রতিশ্রুতি কোন অনির্দিষ্ট ব্যাপার নয় এবং আমরা এই জুলাই থেকে( আফগানিস্তানে) আমাদের সৈন্য হ্রাস করা শুরু করবো।

আজ রাতে আপনাদের বলতে পারি যে আমরা সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করছি। সেনাবাহিনীতে আমাদের সদস্য ও সদস্যাদের প্রতি ধন্যবাদ , ধন্যবাদ আমাদের অসামরিক কর্মিদের প্রতি এবং আমাদের জোটের অনেক শরীকদের প্রতিও যে আমরা আমাদের লক্ষ্য অর্জন করছি। আর এ কারণেই , আগামি মাস থেকে শুরু করে আমরা এ বছরের শেষ নাগাদ ১০,০০০ সৈন্য আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে আনতে পারবো এবং আগামি বছর গ্রীষ্মকালের মধ্যেই আমরা দেশে ফিরিয়ে আনবো সর্বমোট ৩৩,০০০ সৈন্য এবং এর ফলে অতিরিক্ত যে সৈন্যের কথা আমি ওয়েস্ট পয়েন্টে ঘোষনা করেছিলাম , তাদের সবাইকেই ফিরিয়ে আনা সম্পন্ন হবে।

এই প্রাথমিক সৈন্য হ্রাসের পর , আমাদের সৈন্যরা ধীরে ধীর দেশে ফিরে আসা অব্যাহত রাখবে , যেমন আফগান নিরাপত্তা বাহিনী নের্তৃত্বের দিকে এগিয়ে যাবে। আমাদের মিশন তখন হবে যুদ্ধ করা নয় , সহযোগিতা করা। ২০১৪ সাল নাগাদ এই রদবদলের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে এবং আফগান জনগণ , তাদের নিরাপত্তার জন্যে নিজেরাই দায়িত্ব বহন করবে।

আমরা এই সৈন্য হ্রাস শুরু করছি আমাদের শক্ত অবস্থান থেকে। ৯/১১ ‘র পর যে কোন সময়ের চেয়ে এখন আল ক্বায়দা অনেক বেশি চাপের মুখে আছে। পাকিস্তানিদের সঙ্গে মিলে আমরা , আল ক্বায়দার অর্ধেক নের্তৃত্বকে নিঃশেষ করেছি। আর আমাদের পেশাজীবি গোয়েন্দা এবং বিশেষ বাহিনীকে ধন্যবাদ যে আমরা আল ক্বায়দার পরিচিত একমাত্র নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করেছি । ৯/১১’র পর থেকে যারা দেশের সেবা করেছে তাদের সবার জন্যে এ ছিল এক বিজয়। একজন সৈন্য খুব চমৎকার ভাবে বলেছে । সে বলেছে, “ বার্তাটা হচ্ছে , আমরা ভুোল যাই না , তোমাদের এর জবাবদিহিতা করতেই হবে , তা যতদিনই লাগুক না কেন”।

বিন লাদেনের বাড়ি থেকে আমরা যে তথ্য পেয়েছি , তাতে দেখা যাচ্ছে আল ক্বায়দা প্রচন্ড চাপে রয়েছে । বিন লাদেন উদ্বেগ প্রকাশ করে যে আল ক্বায়দা কার্যকর ভাবে নিহত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের স্থলাভিষিক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং আল ক্বায়দা যুক্তরাষ্ট্রকে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত দেশ হিসেবে চিত্রিত করতেও ব্যর্থ হয়েছে। আর এর ফলে তাদের ব্যাপক সমর্থন নিঃশেষ হয়ে পড়ে। আল ক্বায়দা বিপজ্জনক হয়ে রয়েছে এবং আক্রমণের বিরুদ্ধে আমাদের সদা সতর্ক থাকতে হবে। তবে আমরা আল ক্বায়দাকে পরাজয়ের পথে নিয়ে গেছি এবং এই কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আমরা বিশ্রাম নেবো না।

আফগানিস্তানে আমরা তালিবানদের বিপুল ক্ষতি সাধন করেছি এবং তাদের একাধিক শক্ত ঘাটিঁ দখল করে নিয়েছি । আমাদের এই সৈন্য বৃদ্ধির সঙ্গে আমাদের মিত্ররাও তাদের প্রতিশ্রুতি বাড়িয়েছে এবং এর ফলে সে দেশের আরও অংশ স্থিতিশীল হতে পেরেছে। আফগান নিরাপত্তা বাহিনীতে এক লক্ষ্য সৈন্য বৃদ্ধি ঘটেছে এবং কোন কোন প্রদেশ ও পৌর এলাকায় , আফগান জনগণের নিরাপত্তার ভার আমরা এরই মধ্যে ওদের হাতে তুলে দেওয়া শুরু করেছি। সহিংসতা এবং ভীতি প্রদর্শনের মুখে , আফগানরা লড়াই করছে , দেশের জন্যে প্রাণ দিচ্ছে। তারা স্থানীয় পুলিম বাহিনী গঠন করছে , বাজার ও বিদ্যালয় খুলছে , নারী ও মেয়েদের জন্যে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে এবং কয়েক দশকের যুদ্ধের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করছে।

নিশ্চয়ই বিশাল সব চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এই যুদ্ধকে গুটিয়ে আনার জন্যে এটা কেবল শুরু , শেষ নয়। আমরা যখন আমাদের সৈন্য হ্রাস করছি এবং আফগান সরকারকে যখন নিরাপত্তার অন্তবর্তী দায়িত্ব দিচ্ছি তখন এই অর্জনকে টিকিয়ে রাখতে আমাদের কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। আর আগামি মে মাসে , শিকাগোতে আমরা আমাদের নেটো মিত্র এবং শরিক দেশগুলির নিয়ে , এই হস্তান্তরের পরবর্তী পর্যায়ে আলোচনার জন্যে একটি শীর্ষ বৈঠকের আয়োজন করেছি।

আমরা জানি যে এমন দেশে শান্তি আসতে পারেনা যে দেশটি কোন রাজনৈতিক নিস্পত্তি ছাড়া কেবল যুদ্ধাই দেখেছে । সুতরাং আমরা যখন আফগান সরকার এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে শক্তিশালী করে তুলছি , আমেরিকা তালিবান সহ আফগান জনগণকে একত্রিত করার উদ্যোগেও যোগ দেবে। এই আলোচনার ব্যাপারে আামাদের অবস্থানটা পরিস্কার : এই সব আলোচনার নের্তৃত্ব দিতে হবে আফগান সরকারকে আর যারা একটি শান্তিপুর্ণ আফগানিস্তানের অংশ হতে চায় তাদেরকে আল ক্বায়দা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আসতে হবে, সহিংসতা পরিত্যাগ করতে হবে এবং আফগান সংবিধান মেনে চলতে হবে। তবে , অংশত আমাদের সামরিক প্রচেষ্টার কারণেও , আমাদের এটা মনে করার কারণ আছে যে অগ্রগতি সাধন করা যেতে পারে।

আমরা যে লক্ষ্য অর্জন করতে চাইছি , সেটা অর্জন করা সম্ভব এবং তা সহজেই প্রকাশ করা যায় : এমন কোন অভয় আশ্রয় নেই যেখান থেকে আল ক্বায়দা এবং তার সহযোগিরা আমাদের কিংবা আমাদের মিত্রদের আবাস ভুমির উপর আক্রমণ চালাতে পারে । আমরা আফগানিস্তানকে একেবারে আদর্শ স্থানে রূপান্তরের চেষ্টা করবো না। আমরা সেখানকার রাস্তায় কিংবা কোন পুলিশি ভূমিকা পালন করবো না , কোন টহল দেবো না। সেটা হচ্ছে আফগান সরকারের দায়িত্ব । তাদেরকে তাদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে তাদের জনগণকে রক্ষার জন্যে এবং যুদ্ধের অর্থনীতি থেকে তাদেরকে এমন অর্থনীতির দিকে যেতে হবে যা স্থায়ী শান্তির সময়ে টেকসই হতে পারে। আম রা যা করতে পারি , এবং আমরা করবোও তা হলো আফগান জনগণের সঙ্গে একটি টেকসই সহযোগি সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং যাতে এই নিশ্চয়তা থাকে যে আমরা সন্ত্রাসীদের আমাদের লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত করতে থাকবো এবং একটি সার্বভৌম আফগান সরকারের প্রতি আমাদের সমর্থন থাকবে।

অবশ্যই আমাদের প্রচেষ্টায় নজর দেয়া হবে পাকিস্তানে সন্ত্রাসীদের অভয় আশ্রয়ের দিকেও । কোন দেশই , সহিংস উগ্রপন্থিদের সহিংস উপস্থিতি দ্বারা এতটা বিপন্ন নয় আর সে জন্যেই আমরা পাকিস্তানের প্রতি এই চাপ অব্যাহত রাখবো যাতে করে ঐ যুদ্ধ বিধ্বস্ত অঞ্চলের আরো শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে তারা তাদের ভুমিকা সম্প্রসারিত করবে। আমরা সহিংস উগ্রপন্থিদের উৎখাত করতে পাকিস্তানি সরকারের সঙ্গে কাজ করে যাবো। কারণ এ নিয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে আমি যতদিন প্রেসিডেন্ট থাকবো , যুক্তরাষ্ট্র কখনই তাদের অভয় আশ্রয় সহ্য করবে না যাদের লক্ষ্য হচ্ছে আমাদের হত্যা করা, তারা আমাদের সঙ্গে ছলনা করতে পারে না , তারা যে বিচারের সম্মুখীন হবার যোগ্য সেই বিচার থেকেও তারা পালাতে পারবে না।

XS
SM
MD
LG