অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

শিশু পাচার হচ্ছে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির থেকে


ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হয়ে নিজেদের দেশ মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসতে হয়েছে মিয়ানমারের বহু রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষকে। মিয়ানমারে তারা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি বলে পরিচিত। পালিয়ে বাংলাদেশে আসা নতুন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির মানুষেরা এখানে এসে মুখোমুখি হচ্ছে নতুন নতুন নানা সমস্যার। পাচারকারীদের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশু গুম হয়ে যাওয়া তার মধ্যে একটি। বাংলাদেশের কক্সবাজার থেকে ভয়েস অব আমেরিকার সংবাদদাতা জন জন ওয়েনসের পাঠানো রিপোর্টে রয়েছে বিস্তারিত।

বাংলাদেশের বিভিন্ন শরনার্থী শিবিরে রোহিঙ্গা শরনার্থীদের মানবেতর জীবন কাটানোর খবর অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়ে আসছে। এখন নতুন খবর হচ্ছে বিভিন্ন শরণার্থী শিবির থেকে রোহিঙ্গা শিশু গুম হয়ে যাওয়া। মানব পাচারকারীরা শিশু চুরি করে পাচার করছে; আর সেটিই এখন সবচেয়ে দুশ্চিন্তার বিষয়।

রাশিদা নামের এক রোহিঙ্গা নারীর ১০ বছরের ছেলে মুহাম্মদ গুম হয়ে গেছে। ছেলের ব্যাবহার করা জিনিষপত্র ধরে আহাজারি করে সময় কাটে এখন তার। গত বছর রাশিদার স্বামীকে মেরে ফেলার পর সে মিয়ানমার থেকে ছেলে এবং মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বাংলাদেশে আসার কয়েকদিন পরই ১০ বছরের ছেলে মোহাম্মদ নিখোঁজ হয়। রাশিদা জানায় তার ছেলে খুব মেধাবী ছিল, "সে লেখাপড়ায় ভালো ছিল; খুব মেধাবী কিন্তু একটু দুষ্টু ছিল। মেয়েটা সারাক্ষন কাঁদে। বলে সে কি আর তার ভাইকে দেখতে পাবে না?”

গত বছর অক্টোবর থেকে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আসা প্রায় ৭০ হাজার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর একজন হচ্ছে এই রাশিদা। মিয়ানমারে এই সংখ্যালঘূ মুসলমান সম্প্রদায় নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হতো। স্থানীয় জাতিগোষ্ঠী এবং মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানে নির্মম ভাবে অত্যাচারিত হতো এই রোহিঙ্গা মুসলমান জনগোষ্ঠি।

অক্টোবরে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীরা হামলা চালিয়ে ৯জন পুলিশ কর্মকর্তাকে হত্যার পর শুরু হয় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির ওপর সেনা অভিযান। সেই থেকে বিভিন্ন রোহিঙ্গা মুসলমান পরিবারের ওপর নানাভাবে নির্যাতন শুরু হয়। অভিযোগ ওঠে তখন শুরু হয় রোহিঙ্গা মুসলমান নারীদেরকে ধর্ষণ করা; রোহিঙ্গা পুরুষদেরকে হত্যা করা। তবে মিয়ানমার সরকার ঐসব অভিযোগ অস্বীকার করে।

বাংলাদেশের কক্সবাজারের সীমান্তের বিভিন্ন গ্রামে শরণার্থী হিসাবে তারা আশ্রয় নিয়েছে। সেসব স্থানে বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে শিশু চুরির ঘটনা এখন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা সেখানে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সেবা করার চেষ্টা করছে।

এ্যাকশন এ্যাগেইনস্ট হাঙ্গার নামের একটি সংগঠনের তথ্য মতে তারা জানুয়ারী থেকে এ পর্যন্ত ১৬টি অপহরণের ঘটনা জানে। সারা বাংলাদেশে ৩ থেকে ৫ লাখ রোহিঙ্গা শরনার্থীর বসবাস। এদের অনেকেই বাস করেন মিয়ানমার সীমান্তের কাছে কুটাপালাং শরণার্থী শিবিরে।

এ্যাকশন এ্যাগেইনস্ট হাঙ্গার সেখানে শরণার্থীদের নানাভাবে সহায়তা করে থাকে। তারই অংশ হিসাবে ঐ শিবিরে রয়েছে তাদের শিশু সেবা কেন্দ্র। নতুন আসা শরনার্থীদের শিশুদের পাচার হওয়ার ঘটনায় উদ্বিগ্ন এই সংগঠনটি। বললেন এর কর্মকর্তা নিপিন গঙ্গাধারান।

“তাদের কোনো ধরনের সহায়তা নেই। জীবন ধারনের জন্য পরিবারেরর কর্তাদেরকে আয় রোজগার করতে হয়। সন্তান ঘরে রেখে তারা কাজের জন্যে বাইরে চলে যায়। নতারা ভাবে ঘরে তাদের সন্তান নিরাপদ রয়েছে। এই ধরনের অবস্থা ভীষণ ঝুঁকিপূর্ন হয়ে পড়েছে:”।

নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক অপর এক মানবাধিকার কর্মী ভয়েস অব আমেরিকাকে জানান বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ১৫০জন রোহিঙ্গা শিশু এসেছে অভিভাবক ছাড়া। তারা কেউ কেউ শরণার্থী শিবিরে আবার কেউ শিবিরের বাইরে থেকেছে।

২০১৪ সালের বাংলাদেশের একটি শিশু অপরহরন প্রতিবেদনে বলা হয় ঐ বছর যে ৪৯জন অপহৃত শিশু উদ্ধার করা হয় তাইর মধ্যে ১৫ জনই কক্সবাজার থেকে অপহৃত হওয়া। গত বছর স্থানীয় গনমাধ্যমের রিপোর্ট অনুসারে কক্সবাজারের মানব পাচারকারী চক্রে রয়েছে ২ হাজার জন্য সদস্য। এটি ভীষণ শক্তিশালী একটি চক্র।

পাচারকারীরা শিশুদরেকে জোর করে কাজে লাগায়। তাদরেকে দিয়ে ভিক্ষা করায়। চোরা কারবারী করায়। মাদক পাচার করায় এমনকি অনেকের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ বিক্রি করে দেয়।

গঙ্গা জানান সম্প্রতি নিঁখোজ হওয়া শিশুদেরকে এই চক্রই হয়তো পাচার করেছে।

গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রানায়লয় প্রকাশিত এক মানবাচাপাচার প্রতিবেদনে বলা হয় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির পাচার হওয়ার আশংকা বেশী। মানব পাচার বন্ধে বাংলাদেশ সরকারের যা করা দরকার যতটুকু করা দরকার তা করা হচ্ছে না।

বাংলাদেশ সীমান্ত নিরাপত্তা কতৃপক্ষের কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন আবুজার আল জাহিদ বললেন তার টিম মানবপাচার ঠেকাতে শক্তভাবে কাজ করছে।

গঙ্গাধারান বলেন বাংলাদেশ সরকার মানবপাচার রোধে প্রয়াস চালাচ্ছে সত্য। তবে গুম হওয়া রোধে কার্যকর ব্যাবস্থা নেয়া সহজ হচ্ছে না।
এই অপহরণ গুম বা শিশু চুরির ব্যাপারে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি। যারা সংকটে পড়েন, বৈধ কাগজপত্র না থাকায় সেইসব রোহিঙ্গারা যথাযযথ কতৃপক্ষের কাছে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগও দাখিল করতে পারে না।

তবে ঐ সীমান্ত অঞ্চলটি মানব পাচারের জন্য অনেক আগে থেকেই পরিচিত। এই কারনে রোহিঙ্গা শরনার্থীদের জন্য পরিচালিত স্কুলে শিক্ষকরা এবং শিবিরে অভিভাবকরা শংকিত। মোহাম্মদ ইদ্রিস একজন রোহিঙ্গি শিক্ষক। জানালেন, “আমরা শুনছি পাচারকারীরা নাকি শিশুদেরকে অপহরণ বা চুরি করে কিডনি বিক্রি করে দিচ্ছে”।

এই বিষয়টি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি চেষ্টা চলছে নানা মহল থেকে। রাশিদা তার হারানো ছেলেকে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তার আশা সে তার ছেলেকে ফিরে পাবেই, “আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ একদিন আমার ছেলেকে ফিরিয়ে দেবে”। কুটুপালাং শরনার্থী শিবিরের সকলেই প্রার্থনা করছে নিখোঁজ হওয়া সন্তানদেরকে যেনো সৃষ্টিকর্তা ফিরিয়ে দেন।

XS
SM
MD
LG