অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

ঈদের সময় অনেকেই শহর ছেড়ে পরিবার পরিজনের সঙ্গে ঈদ পালনের জন্যে গ্রামের বাড়ি চলে যান। ঢাকা শহর প্রায় ফাঁকা হয়ে। ঢাকার অধিবাসীদের অনেকেই সেসময় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন এই ভেবে যে রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম নেই। কোথাও যেতে চাইলে চট করেই চলে যাওয়া যাবে।

বছরের অন্য সময়টাতে ঢাকার চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার অন্যতম বড় পরিচয় এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে ট্রাফিক জ্যামের শহর। ১৫মিনিটের পথ যেতে ১ ঘন্টা এমনকি দু ঘন্টাও লেগে যেতে পারে।

লিটল জুয়েলস স্কুলের ভাইস প্রিন্সিপাল তারজিয়া ইয়াসমিন খান। তেজগাঁওতে নিজের বাড়ি থেকে পুরানা পল্টনে স্কুলে তাঁকে প্রতিদিন যাওয়া আসা করতে হয়। ঢাকার যানজট নিয়ে দৈনন্দিন দুর্ভোগের কথা তিনি আমাদের জানালেন।

প্রিমিয়ার ব্যাংক-এর কর্মকর্তা গালিব হামিদ প্রতীক মনে করেন এর মূল কারণ জনসংখ্যা।

জনসংখ্যার দিক দিয়ে ঢাকা শহরের অবস্থান ২০তম। উন্নয়নশীল দেশের আর সব রাজধানীর মত ঢাকার অবকাঠামো এই জনসংখ্যার ভার বহনের উপযুক্ত নয়।

সারা ঢাকা শহর জুড়ে ৬শ ৫০টি মোড়ে ট্রাফিক সিগ্নাল বাতি রয়েছে মাত্র ৬০টি। বিভিন্ন গতির, বিভিন্ন মাপের যানবাহন একই সময়ে একই সঙ্গে রাস্তায় চলাচল করছে। একই সড়কে পাশাপাশি চলছে বাস, ট্রাকসহ ব্যক্তিগত ব্যবহারের মোটরগাড়ি, সি এন জি, রিকশা পথচারী। ট্রাফিক আইন থাকলেও তার প্রয়োগ নেই। লোকজন ফুট ওভারব্রিজ ব্যবহার না করে যে যেভাবে পারছে রাস্তা পার হচ্ছে, বাসগুলো রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে লোক তুলছে, নামাচ্ছে। নির্দিষ্ট জায়গায় পার্ক না করে যত্র তত্র গাড়ি পার্ক করছে। সম্প্রতি ঢাকায় কয়েকটি ফ্লাইওভার নির্মাণ করা হলেও যানজটের সমস্যা রয়েই গেছে।

ঢাকার যানজট নিয়ে আমরা কথা বলেছিলাম নগর বিশেষজ্ঞ সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজের প্রধান অধ্যাপক নজরুল ইসলামকে।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুগোল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বললেন একটি বড় সমস্যা রিকশা।

রিকশা চলে ধীর গতিতে, রিকশাওয়ালারা যেখানে সেখানে রিকশা ঢুকিয়ে দিয়ে পথ আটকে দেয়।

অনেক রাস্তায় এখন রিকশা চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হলেও, সরকারের ওপর চাপ দেওয়া হচ্ছে, অন্যান্য রাস্তাতেও রিকশা চলাচল যাতে নিষিদ্ধ করা হয়। অবশ্য এখানে মনে রাখা দরকার, প্রায় ১৫ লক্ষ মানুষ জীবিকা নির্ধারণ করে রিকশা চালিয়ে। এই রিকশার বিকল্প হতে পারে, বাস বা অন্য কোন জনপরিবহন ।

কিন্তু ঢাকার রাস্তায় আরো বাস নামানো শুনতে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা নয়। ২০০৯ সালে বিশ্ব ব্যাঙ্কের একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঢাকায় ৬০টি বাসের কম্পানী আছে, যারা তাদের যাত্রাপথ ও সময়সূচী সারাক্ষণ পরিবর্তন করছে। বাস ড্রাইভাররা বেশি লাভের জন্যে বেপোরোয়াভাবে জোরে গাড়ি চালায়, এবং ধারণক্ষমতার চাইতে বেশি যাত্রী বাসে তোলে। আর বাসমালিকরা পেয়ে থাকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতা।

ঢাকার আয়তনের মাত্র ৭ শতাংশ জুড়ে আছে রাস্তাঘাট বা যাতায়াতের পথ। যেখানে প্যারিসে তা ২৫ শতাংশ, এবং ওয়াশিংটন ও শিকাগোতে তা ৪০ শতাংশ।

ওদিকে, প্রতি বছর ঢাকায় রাস্তায় যোগ হচ্ছে, প্রায় ৩৭ হাজার ব্যক্তিগত ব্যবহার উপযোগী গাড়ি বা প্রাইভেট কার। ঢাকার অনেক অধিবাসী মনে করেন, এটি একটি ইতিবাচক দিক, দেশ যে অর্থনৈতিক উন্নতির পথে এগিয়ে চলেছে, এ হচ্ছে তার প্রমাণ।

এর বাইরে রয়েছে পথচারীরা।

এর দীর্ঘমেয়াদী সমাধান কি হতে পারে তা আমাদের জানালেন প্রফেসর নজরুল ইসলাম।

ঢাকার এই ট্রাফিক জ্যামের কারণে প্রতি বছর ৩৮০কোটি ডলারের ক্ষতি হচ্ছে। ঢাকার মত মেগাসিটিগুলোতে ট্রাফিক সমস্যার সমাধান করা না গেলে দেশের উন্নতির পথে তা অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।

XS
SM
MD
LG