অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

ইসলামিক স্টেট এবং ইউরোপীয় জিহাদিঃ একটি পর্যালোচনা


ইউরোপের ২৬টি দেশ নিয়ে যে শেনগেন ট্রাভেল যোন, তার ভেতরে এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত করা যায় কোন কাগজপত্র ছাড়াই। ফ্রান্স এবং জার্মানী ঐতিহ্যগতভাবে, দৃঢ়তার সঙ্গে এই নীতির পক্ষাবলম্বন করে এসেছে। অবশ্য সম্প্রতি তারা নীতিটি পুনর্বিবেচনা করছে। এর কারণ, ক্রমবর্ধমান সংখ্যায় ইউরোপীয় তরুণরা জিহাদে যোগ দিতে ইরাক ও সিরিয়ায় যাচ্ছে।

ফ্রান্স এবং জার্মানীই শুধু নয়, অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোও ঐ সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। তারাও বুঝে উঠতে পারছে না কিভাবে তারা তাদের নাগরিকদের বিদেশে গিয়ে যুদ্ধে যোগ দেয়া ঠেকাবে।

বৃটেন শেনগেনের আওতাভূক্ত নয়। জানুয়ারি মাসে, বৃটেনে নতুন আইন বলবত হবে। এই আইন কার্যকর হলে, যে বৃটিশ নাগরিকরা সশস্ত্র দলগুলোর সঙ্গে যুক্ত তাদের বৃটিশ পাসপোর্ট বাতিল করা হবে। যে ব্রিটনরা বিদেশে যুদ্ধে যোগ দিতে গেছে, তারা আর বৃটেনের মাটিতে ফিরতে পারবে না। তারা স্বদেশবিহীন হয়ে পড়বে।

সিরিয়া এবং ইরাকে যুদ্ধরত উগ্রবাদী দলে যে পশ্চিমা নাগরিকরা যোগ দিয়েছেন তাদের তুলনা করা হচ্ছে টাইম বোমার সঙ্গে। মে মাসে, তাদের একজন, আলজেরিয় বংশোদ্ভূত ফরাসী নাগরিক মেহদি নেমুশ ব্রাসেলসের একটি উহুদী যাদুঘরে এলোপাথারি গুলি চালায়। ঘটনায় ৪জন মারা যায়। নেমুশই ছিল প্রথম পশ্চিমা নাগরিক যে স্বেচ্ছায় সিরিয়ায় গিয়েছিল, সেহানে জঙ্গীদের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্যে। পরে সে ইউরোপে ফিরে এসে ঐ হামলা চালায়।

ঐ ঘটনা বিপদের আশংকা বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেকে আশংকা করছেন, এই বিদেশী জিহাদীরা দেশে ফিরে এসে এই ধরনের আরো হামলা চালাবে এবং, জিহাদী ও পশ্চিমের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে যে যুদ্ধ চলবে তার এক নতুন অধ্যায় শুরু হবে।

ইউরোপীয় সরকারবৃন্দ কিভাবে এই সমস্যার মোকাবিলা করবে তা নির্ধারণ করতে হিমশিম খাচ্ছে। তাদের কলাকৌশল বের করতে চেষ্টা করছে, কিভাবে পরস্পরকে গোয়েন্দা তথ্য সম্পর্কে অবহিত করা যায়, এবং তাদের দেশের মুসলমান সম্প্রদায়ের ওপর নজর রাখা যায়।

এমনকি ব্রাসেলসের হামলার আগেও আশংকা ঘনীভূত হচ্ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে যে ১৫ হাজার বিদেশী যোদ্ধার যোগ দিয়েছে তার মধ্যে ৩০০০ তাদের নিজ দেশে ফিরে এসেছে।

এর প্রেক্ষিতে অবসরপ্রাপ্ত এফ-বি-আই Agent Martin Reardon বলেছেন, এই হুমকিকে ছোট করে দেখা ঠিক হবে না।।

ওদিকে, Chams Eddine Zaogui এবং Peiter Van Ostaeyen-এর মত তাত্ত্বিকরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁরা বলছেন, এই বিদেশী যোদ্ধারা যারা সিরিয়ায় সময় কাটিয়েছে, তাদের নিজ দেশে হামলা চালানোর আশংকা নেই বললেই চলে। New York Times এ প্রকাশিত একটি মতামত প্রবন্ধে তাঁরা লিখেছেন, সিরিয়ার যুদ্ধে তাদের যোগ দেবার কারণ, সিরিয়ার প্রেসিডেণ্ট বাশার আল- আসাদের সরকার যে অত্যাচার পরিচালনা করছে, ব্যারেল বোমা এবং রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করছে, তার বিরুদ্ধে লড়াই করা।

ওদিকে তাঁদের এই যুক্তির বিরোধিতা করেছেন, আরেকজন বিশ্লেষক।

Norwegian Defense Research Establishment এর সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত গবেষণার পরিচালক Thomas Hegghammer-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে প্রতি ৯ জন ইউরোপীয় বিদেশি যোদ্ধার একজন দেশে ফিরে এসে সন্ত্রাসী কর্মাকান্ড পরিচালনা করেছে। এই বিদেশী জিহাদীরা মূলত আফঘানিস্তান এবং বলকানের যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। কয়েকজন বিশ্লেষক জানতে চেষ্টা করছেন, যেই যোদ্ধারা ইরাক বা সিরিয়ার যুদ্ধে যোগ দিতে গেছে, তাদের ক্ষেত্রে এই অনুপাত কি ভিন্ন হবে কিনা। কারণ, পূর্ববর্তী প্রজন্মের তুলনায় তাদের উগ্রবাদের মাত্রা বেশি।

পশ্চিমের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্যে সবচেয়ে আশংকার বিষয় হলো, তারা এতদিন জানতেই পারেনি, কি হারে তরুণরা ইরাক এবং সিরিয়ার যুদ্ধে যোগ দিতে যাচ্ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউরোপের অপেক্ষাকৃত ছোট দেশগুলোর জন্যে এই চ্যালেঞ্জ আরো মারাত্মক। কারণ, তাদের সেরকম শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা নেই।

এরই মধ্যে ফ্রান্স থেকে ৭শ তরুণ সিরিয়ায় যুদ্ধ করেছে। বৃটেন থেকে যুদ্ধে যোগ দিয়েছে ৫শ তরুণ। অবশ্য এই সংখ্যা আরো বড় হতে পারে।

ইসলামিক স্টেইটের নেতা খলিফা আবু-বাকর-আল-বাঘদাদির ঘোষণার পর বিদেশী জিহাদীদের সংখ্যা বাড়ছে।

লন্ডন ভিত্তিক থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক-International Center for the Study of Radicalization-এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো শিরায মাহের বলছেন, গবেষণায় দেখা গেছে, বিদেশী যোদ্ধাদের মাত্র কয়েকজন দেশে ফিরে হামলা চালাচ্ছে। তাই তাদের বিরুদ্ধে শুধু আইনগত শাস্তির ব্যবস্থা না করে, তারা যাতে উগ্রবাদ ত্যাগ করে, সেজন্যে বিশেষ উদ্যোগ নিলে, এই ঝুঁকি আর থাকবে না।

অবশ্য তিনি আরো বলেছেন, সরকারকে তাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আরো শক্তিশালী করতে হবে, যাতে তারা বিদেশী যোদ্ধাদের দেশ ত্যাগের আগেই আটকাতে পারে। ফ্রান্স এবং জার্মানীর সরকার বিমানবন্দরগুলোতে নিরপত্তা কর্মসূচী জোরদার করেছে। পাশাপাশি, একটি database তৈরি করছে, যাতে সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের ওপর নজর রাখা যায়।

জার্মানী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Thomas de Maidiere বলেছেন, জিহাদে যোগ দেয়ার জন্যে ৩ হাজার তরুণ ইউরোপ ত্যাগ করেছে। তাঁরা চাননা, ইউরোপ সন্ত্রাসের রপ্তানীকারকে পরিণত হোক।

XS
SM
MD
LG