অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

ইসি গঠনে সার্চ কমিটিঃ প্রতিক্রিয়া


বাংলাদেশে বর্তমান নির্বাচন কমিশনারের মেয়াদ শেষ হচ্ছে ১৪ ফেব্রুয়ারি। আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের জন্য নতুন নির্বাচন কমিশন অপরিহার্র্য। স্বাধীনতার ৫০ বছরেও নির্বাচন কমিশন আইন তৈরি হয়নি। এমন প্রেক্ষিতে বর্তমান সিইসি নূরুল হুদা কমিশনের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নির্বাচন কমিশন গঠন আইন নিয়ে সংসদের ভেতরে এবং বাইরে নানামুখী আলোচনা চলেছে। গত ২৭ জানুয়ারি একাদশ জাতীয় সংসদের ষোড়শ অধিবেশনে ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন, ২০২২’ বিলটি পাস হয়।


নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনে ২০১২ সালে সার্চ কমিটি গঠনের প্রথা চালু হয়। এই আইনটিতে আগের সার্চ কমিটির মতামতের মাধ্যমে কমিশন গঠনের রীতিকেই আইনি কাঠামো দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ দুটি নির্বাচন কমিশন গঠন করা হয়েছিল সার্চ কমিটির মাধ্যমে। তবে দুটি কমিশনই বিতর্কিত হয়েছে।

ইসি গঠনে ইতিমধ্যে ৬ সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। গত ৫ ফেব্রুয়ারি এই সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, অনুসন্ধান কমিটি ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন, ২০২২’ মোতাবেক দায়িত্ব ও কার্যাবলী সম্পন্ন করবে। এবার প্রথমবারের মতো আইনের মাধ্যমে সার্চ কমিটি কাজ করতে যাচ্ছে।

বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে সার্চ কমিটিতে অন্য পাঁচ সদস্য হলেন-হাইকোর্টের বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামান, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মো. মুসলিম চৌধুরী, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান মো. সোহরাব হোসাইন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার মুহাম্মদ ছহুল হোসাইন ও কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক আনোয়ারা সৈয়দ হক।

অনুসন্ধান কমিটি গঠনের ১৫ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতির কাছে যোগ্য ব্যক্তিদের নাম প্রস্তাব করার বিধান রাখা হয়েছে আইনে।

আসিফ নজরুল

বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ ছাড়া অন্য সব দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে হয়। এই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, "আগে যেভাবে সার্চ কমিটি গঠন করা হতো শাসকদলের পছন্দমতো লোকদের দিয়ে সেদিক থেকে এবার যেটি হয়েছে তা আগের সার্চ কমিটির পুনরাবৃত্তির প্রচেষ্টা বলেই আমি মনে করছি। এবারে নতুন করে তা আইনের মোড়ক ছাড়া আর কিছু নয়। এখন বলা হচ্ছে, রাষ্ট্রপতি এই কমিটি করেছেন। কিন্তু, বাংলাদেশের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়া রাষ্ট্রপতি কোনো কাজ করতে পারে না।"


কমিশন ভালো হলেই যে নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, "একটি ভালো কমিশন দিয়েই যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করা যাবে তা নয়। নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতার উপর নির্ভর করবে নির্বাচন কতোটা অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে। তাই নির্বাচন কমিশন যতোই নিরপেক্ষ হোক না কেন, বর্তমান সরকারের যে কাঠামো, এর মধ্যে থেকে নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব নয়। এজন্য নির্বাচনকালীন একটি সরকার তাকে যে নামেই বলা হোক না কেন... তত্ত্বাবধায়ক সরকার, জাতীয় সরকার কিংবা অর্ন্তবতী সরকার তা থাকতে হবে। তা না হলে বর্তমান সরকার কাঠামোর মধ্যে নিরপেক্ষ নির্বাচন অসম্ভব। নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি যদি বাছাই করে একটি তুলনামূলক ভালো কমিশন গঠনও করে সেটি হতে পারে নির্বাচনকালীন সরকারের সহায়ক শক্তি। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করা যাবে না।"

নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ

নির্বাচন কমিশন গঠন আইনটি জাতীয় সংসদে তড়িঘড়ি করে উপস্থাপিত হয়েছে উল্লেখ করে জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ বলেন, "বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ ১৪ ফেব্রুয়ারি শেষ হতে যাচ্ছে। যেহেতু এটি একটি সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ পদ তাই এটিকে খালি রাখা উচিত হবে বলে আমার মনে হয় না। সিইসি এবং অন্যান্য কমিশনারগণ না থাকলে কেবল ইসি সচিবের দ্বারা কমিশনের সকল কাজ সম্পাদন করা সহজ হবে না। কমিশনে বিভিন্ন মামলা চলমান রয়েছে, স্থানীয় সরকারের নির্বাচনের রেজুলেশন বাকি রয়েছে। এছাড়াও কমিশনের নিয়মিত কাজ রয়েছে, যা সিইসি এবং কমিশনার ছাড়া এগিয়ে নেওয়া যাবে না। তাই দ্রুততম সময়ের মধ্যেই কমিশন গঠিত হবে এবং সার্চ কমিটি তা করতে সহযোগিতা করবে।"

চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সকল দলের মতামতের প্রকাশ ঘটবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক কলিম উল্লাহ বলেন, "সার্চ কমিটি গঠিত হওয়ার পরে ইতিমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে - আগ্রহী যে কেউ আবেদন করতে পারবে। এর মধ্য দিয়ে সকলের মতামত দেওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তাই নির্বাচন কমিশন গঠনে সার্চ কমিটি একটি গ্রহণযোগ্য ভূমিকা রাখবে বলেই মনে করছি।"

শাহদীন মালিক

বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক মনে করেন, "এবারের সার্চ কমিটি গঠন করা নিয়ে সরকারের বাইরেও অন্যান্য রাজনৈতিক দল এবং সুশীলসমাজসহ নানা স্তরে আলোচনা হয়েছে। তাই এবার একটা খোলামেলা পরিস্থিতিতে সার্চ কমিটিকে কাজ করতে হবে।" তিনি বলেন, "সার্চ কমিটি সফল না ব্যর্থ তা এখনই বলা যাবে না। তারা এখনও কাজ করছে। তাই এখনই চূড়ান্ত মতামত দেওয়া যাবে না। তবে আমি মনে করি, সার্চ কমিটি তাদের প্রস্তাবিত নামের তালিকা মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার আগে তা জনসম্মুখে প্রকাশ করলে আরও স্বচ্ছতা আসবে।"

রাশেদ খান মেনন

আওয়ামী সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী নেতৃত্বাধীন জোটের অন্যতম শরিকদল ওয়ার্কাস পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এমপি ইসি আইনকে অসম্পূর্ণ উল্লেখ করে বলেন, "আমরা শুরু থেকেই বলেছি এই আইন অসম্পূর্ণ। কারণ, এখানে সংসদের তেমন কোনো সংশ্লিষ্টতা রাখা হয়নি। তবে এতোদিন যেখানে কোনো আইন ছিল না, সেখানে আইন হওয়াটা একটা একটা ইতিবাচক ঘটনা। এখন আমরা আমাদের দলের পক্ষ থেকে মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে আমাদের প্রস্তাবিত নামের তালিকা সার্চ কমিটির মাধ্যমে তুলে ধরবো। তবে এখানে আমরা একটা বিষয়ে প্রস্তাব দিতে চাই, চূড়ান্তভাবে মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে সার্চ কমিটি তাদের তালিকা দাখিল করার আগে যাতে তা জনসম্মুখে প্রকাশ করে। এটা করা হলে অন্তত আইনটি যে অসম্পূর্ণ ছিল সেখানে জনসাধারণ কিছুটা আশ্বস্ত হতে পারবে, বিশ্বা যোগ্য হবে।"

হাসানুল হক ইনু

আওয়ামী নেতৃত্বাধীন জোটের অপর দল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) এর সভাপতি হাসানুল হক ইনু, যিনি বর্তমান সংসদ সদস্য এবং সাবেক মন্ত্রী, তিনি বলেন, "আগে যেখানে নির্বাচনের জন্য কোনো আইন ছিল না, সেখানে আইন হয়েছে এটা ভালোভাবে দেখতে হবে। শুরু থেকেই নেতিবাচক মনোভাব না রেখে সার্চ কমিটিকে রাজনৈতিক দলসমূহের সহায়তা করতে হবে।"


জাসদের পক্ষ থেকে সার্চ কমিটির কাছে নামের তালিকা দেওয়া হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘"আমরা আমাদের দলের আদর্শ ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বিচার করে একটি নামের প্রস্তাব দিব। তবে তা জনসম্মুখে প্রচার করা বিব্রতকর বলে তা গোপন রাখা হবে।"

কামরুল ইসলাম

সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেন, "মহামান্য রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কের্টের বিচারপতির নেতৃত্বে যে সার্চ কমিটি গঠন করেছেন, তারা প্রথম দিন থেকেই বেশ কর্মতৎপরতা দেখিয়ে যাচ্ছেন। তারা সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এবং সুধীসমাজসহ সকলের মতামতের ভিত্তিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই একটি তালিকা প্রণয়ন করে মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে তুলে ধরতে পারবেন বলে আমি বিশ্বাস করি। পাশাপাশি তাদের বিচক্ষণতা ও কর্মদক্ষতা বেশ প্রশংসনীয় হবে বলেও আমি মনে করি।"

বদিউল আলম মজুমদার

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)- এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, "বর্তমান সার্চ কমিটির যিনি সভাপতি হয়েছেন তিনি এর আগের সার্চ কমিটিরও সদস্য ছিলেন। সেই কমিটির মাধ্যমে বর্তমানের নূরুল হুদা কমিশন গঠন করা হয়েছিল। আর নূরুল হুদা কমিশন নির্বাচন আয়োজনে যে বিতর্ক সৃষ্টি করেছিল, তা সবারই জানা। আগের সার্চ কমিটি গঠন করতে যেভাবে প্রজ্ঞাপণ দেওয়া হতো সেখানে এবার এটা পোশাক পরানো হয়েছে। আইনের মধ্য দিয়ে বিষয়টাকে একইরকম রাখা হয়েছে।"

সার্চ কমিটি কী উদ্যোগ নিলে তা গ্রহণযোগ্য হবে বলে তিনি মনে করেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, "রাজনৈতিক দলগুলোর প্রস্তাবিত নামের উপর গণশুনানি করা যেতে পারে। এছাড়া এর আগে যেভাবে দেখা গেছে সরকারের অনুগত দলসমূহের মাধ্যমে একই নাম বারবার প্রস্তাব করানোর যে খেলা তা বন্ধ করতে হবে। অনুসন্ধান কমিটি যদি সত্যিকার অর্থেই অনুসন্ধান করতে চায়, সত্যিকারের যোগ্য ও সৎ লোকদের খুঁজে বের করা কঠিন হবে না।"

XS
SM
MD
LG