অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

অন্তর্জালে বন্দী জীবন, বেরিয়ে আসার উপায়


ঢাকায় করোনাভাইরাসের কারণে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা এক যুবক নিজের বাড়িতে মোবাইলে গেম খেলছেন।
ঢাকায় করোনাভাইরাসের কারণে হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা এক যুবক নিজের বাড়িতে মোবাইলে গেম খেলছেন।

আমাদের জীবন এখন ইন্টারনেট বা অন্তর্জালে বন্দী। পড়াশুনা থেকে অফিস আদালত সকল কাজেই বাড়ছে ইন্টারনেটের ব্যবহার। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রযুক্তি নির্ভরতা। ফোন, ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার দিন দিন প্রয়োজনের তাগিদে বাড়ছে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালের জুন মাসে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১২ কোটিতে পৌঁছায়। শুধু জুন মাসেই প্রায় ৩০ লাখ ইন্টারনেট গ্রাহক বেড়েছে। ২০২১ সালে ডিসেম্বর শেষে গ্রাহক সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ কোটি ৩৮ লক্ষে। এক বছরে ইন্টারনেট গ্রাহকসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১ কোটিরও বেশি।

এই ইন্টারনেটমুখিতা জীবনকে সহজ করবার সাথেসাথে একটা মারাত্মক সমস্যাও তৈরি করছে। সেটা হলো ইন্টারনেট ‍ও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি আসক্তি। আমরা কাজের প্রয়োজনে যতক্ষণ ইন্টারনেট এবং ডিভাইস ব্যবহার করছি তার চেয়েও বেশি সময় ডিভাইস ব্যবহার করছি ভিডিও গেম, চ্যাটিং, ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব ইত্যাদি ব্যবহারে। অর্থাৎ ঘন্টার পর ঘন্টা অনলাইনে থাকা, সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট দেয়া, চ্যাটিং করা, অন্যদের পোস্ট ফলো করা, কমেন্ট করা, গেম খেলা, বিভিন্ন ভিডিও কন্টেন্ট দেখা এ সবকিছু যখন আমাদের যাপিত জীবনের অনেকটা সময়কে নষ্ট করে তখন তাকে আসক্তি বলা যায়। সব বয়সের মানুষের মধ্যেই এ আসক্তি বাড়ছে তবে শিশু-কিশোরদের মধ্যে ইন্টারনেট আসক্তি বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। ২০২০ সালের শুরু থেকে করোনার ছোবলে লকডাউনে স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় অনলাইনে পড়াশুনা শুরু হয়। অভিভাকরা শিশুকিশোরদের হাতে মোবাইল, ল্যাপটপ, ট্যাব সহ বিভিন্ন ডিভাইস তুলে দিতে বাধ্য হন। ফলে বাড়তে থাকে ইন্টারনেট আসক্তি। মাত্রাতিরিক্ত ইন্টারনেট আসক্তি এডিএইচডি (অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার অ্যাক্টিভিটি ডিজঅর্ডার) তৈরি করে। এটি একটি মানসিক সমস্যা। এ সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তি নির্দিষ্ট কোনো কাজে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে না, অসহিষ্ণু আচরণ করে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের মতে, চার থেকে সতেরো বছর বয়সি অন্তত ষাট লাখ শিশু-কিশোর ‘এডিএইচডি’তে আক্রান্ত। গত দুই দশকে এ রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল এন্ড কাউন্সিলিং সাইকোলোজি বিভাগের সহকারি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজহারুল ইসলাম বলেন, "আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশনের (এপিএ) মেন্টাল ডিজঅর্ডার গাইডলাইনে ‘ইন্টারনেট গেমিং ডিজঅর্ডার’ নামক অসুখকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই ইন্টারনেট গেমিং আসক্তি বিশ্বব্যাপি এতটাই উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যে একে ক্লিনিক্যাল ডিজঅর্ডার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ইন্টারনেটের অন্যান্য আসক্তিগুলোর উপরও এখন গবেষণা শুরু হয়েছে।"

এ ধরণের আসক্তি ও ডিজঅর্ডার থেকে উত্তরণের উপায় সম্পর্কে তিনি বলেন, "মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি হলো যেটাতে সে আনন্দ পায় সেদিকেই বেশি ধাবিত হয়। একসময় মানুষের টিভি দেখায় আসক্তি ছিলো এখন তা ইন্টারনেটমুখী হয়েছে। বড়-ছোটো সবাই ইন্টারনেটে আসক্ত হতে পারে। তবে শিশুকিশোরদের ক্ষেত্রে এ আসক্তি তার দৈহিক-মানসিক বৃদ্ধিকে বাঁধাগ্রস্থ করে। এছাড়া তার সামাজিক আচরণ, আবেগীয় আচরণের উপরও প্রভাব ফেলে। ফলে মানুষের সাথে মেলামেশা, খেলাধুলা, বন্ধুত্ব ও প্রেমের সম্পর্ক স্থাপন সবকিছুতেই তাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এর থেকে উত্তরণের উপায় হলো, পরিবারে কোন শিশুর এ ধরণের ডিভাইস আসক্তি থাকলে তাকে বিকল্প কোনো কাজ, যা তার ভালো লাগে এমন কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। বইপড়া, ছবি আঁকা, সংগীতচর্চা যে কোনো সৃজনশীল কাজে তাকে যুক্ত করতে হবে যাতে সে সারাক্ষণ ইন্টারনেট নিয়ে কাটানোর মতো সময় না পায়। তবে পরিবারের ছোটদের ইন্টারনেটেমুখিতা কমানোর জন্য বড়দেরকেও এই আসক্তি কমাতে হবে। বাড়িতে কাজের বাইরে ডিভাইসের ব্যবহার, সোশ্যাল মিডিয়ায় সময় দেয়া কমিয়ে দিতে হবে। সন্তানকে বকাঝকা না করে, তাদেরকে সময় দিতে হবে। অনেকসময় আমরা নিজেদের সাংসারিক কাজ এবং বিশ্রামের সময়টার যেনো ব্যাঘাত না ঘটে সে জন্য বাচ্চাদের হাতে মোবাইল তুলে দেই। কার্টুন, গেম ইত্যাদি দিয়ে তাদেরকে ব্যস্ত রাখি। কিন্তু এটা না করে তাদেরকে সাথে নিয়ে খেলা, গল্প বলা, বই পড়া, ছবি আঁকা এ ধরণের সৃজনশীল কাজে বেশি বেশি সময় দিতে হবে। তাহলেই ইন্টারনেট আসক্তি থেকে পরিবারের বড়রা এবং তাদের দেখাদেখি ছোটরাও বেরিয়ে আসতে পারবে।

একইরকম মত প্রকাশ করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলোজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারাহ দীবা। তিনি বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘন্টার পর ঘন্টা সময় কাটানো, ঘনঘন পোস্ট দেয়া, ছবি আপলোড করা, চ্যাটিং এসব আসলে আসক্তি। এর থেকে বেরিয়ে আসার জন্য সদিচ্ছা থাকতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়াতে সময় কম দেয়ার সবচে কার‌যকরী উপায় হলো নিজেকে অন্য কোন কাজে ব্যস্ত রাখা। সেটা হতে পারে শরীরচর্চা, গল্পের বই পড়া, ছবি আঁকা কিংবা রান্না করা, বাগান করা অথবা নিজের পছন্দমতো যে কোন কাজ। শিশুদেরকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ ইন্টারনেটের অকারণ ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করার জন্য নিজেদেরও সারাক্ষণ অনলাইনে থাকা অর্থাৎ অকারণে ইন্টারনেট ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। তাহলে শিশুরাও সময় কাটানোর বিকল্প উপায়গুলো খুঁজে নিতে পারবে। আমাদের সকলকেই এ ব্যাপারগুলোর অনুশীলন করতে হবে।"

XS
SM
MD
LG