অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

ভারত সব সময়েই বলেছে উগ্রপন্থা ও আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না – বিবেক কাটজু


বিবেক কাটজু
বিবেক কাটজু

গত ১৬ মে ২০২৩, পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি ভারতে আসেন সাংহাই কর্পোরেশন-এর সদস্য দেশগুলির বিদেশমন্ত্রীদের এক অধিবেশনে যোগ দিতে। দীর্ঘ ১২ বছর পর ভারতের এই প্রতিবেশী দেশের কোনও প্রথম সারির মন্ত্রীর এটিই ছিল প্রথম ভারত সফর। এই সফর ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশেই আলোচনা তৈরি করেছিল, ভারত ও পাকিস্তানের পারস্পরিক সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে।

ভয়েস অফ আমেরিকা এই সফর বিষয়ে কথা বলেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রাক্তন সচিব বিবেক কাটজু-র সঙ্গে। ভয়েস অফ আমেরিকা-র পক্ষে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন সুদর্শনা চক্রবর্তী।

ভয়েস অফ আমেরিকা: পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি-র সাম্প্রতিক ভারত সফরের সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্ব বিষয়ে আপনি কী বলবেন?

বিবেক কাটজু: পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রী বিলাওয়াল ভুট্টো জরদারি ভারতে এসেছিলেন সাংহাই কর্পোরেশন-এর বিদেশমন্ত্রীদের কাউন্সিল-এর এক অধিবেশনে যোগ দিতে। কোনও দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের প্রেক্ষাপটে তাঁর সফর ছিল না। এবং নিশ্চিতভাবেই এখন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনও দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ নেই। হ্যাঁ, অবশ্যই দু’টি দেশ যেহেতু প্রতিবেশী, সেইজন্য কিছু মানবিক ইস্যু যেমন যেগুলি একক ব্যক্তি, মৎস্যজীবী বা সিভিলিয়ান প্রিজনার্সদের অযাচিতভাবে সীমান্ত পেরোনো, আমার মনে হয়, এই বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন। কিন্তু এই দিকগুলি বাদ দিয়ে দুই দেশের মধ্যে অর্থপূর্ণ যোগাযোগ তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে ভারতের অবস্থান অনুযায়ী - পাকিস্তান যতদিন উগ্রপন্থা চালাবে তাদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ গড়ে তোলা সম্ভব নয় - ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডঃ জয়শঙ্কর ও বিলাওয়াল ভুট্টো জরদারির মধ্যে কোনও দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সুযোগ ছিল না।

ভয়েস অফ আমেরিকা: পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রীর ভারত সফর নিয়ে ভারতের অবস্থান কী আগ্রাসী ছিল?

বিবেক কাটজু: আমি মনে করি না ভারত কোনও আগ্রাসী অবস্থান নিয়েছিল, ভারত একটি নির্দিষ্ট নীতিগত অবস্থান নিয়েছিল এবং এই অবস্থানটি বহু পুরনো। ভারত সব সময়েই বলেছে – উগ্রপন্থা ও আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না। ২০১৯-এ পুলোওয়ামা-এ উগ্রপন্থী হামলার পর ভারত তার জবাব দিয়েছিল বালাকোট স্ট্রাইক-এর মধ্যে দিয়ে এবং স্পষ্ট করে দিয়েছিল যে পাকিস্তানের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ তৈরি হবে না যতদিন না পাকিস্তান উগ্রপন্থা বন্ধ করে। এমন কোনও প্রমাণ নেই যে পাকিস্তান তা করেছে। এবং সেই কারণেই ভারতের বর্তমান অবস্থান একটি নীতিগত অবস্থান ও নিশ্চিতভাবেই তা আগ্রাসী নয়।

ভয়েস অফ আমেরিকা: বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি-র নিজের ভারত সফরকে ‘সফল’ বলে মন্তব্য করেছেন। আপনি একে কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

বিবেক কাটজু: আমার মনে হয়, যদি পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রীর কথা বলা হয়, তাহলে তিনি পাকিস্তানের জনমতের একাংশের দ্বারা ভারত সফরে না আসার জন্য চাপে ছিলেন, কারণ পাকিস্তান সরকার বলেছিল, জম্মু ও কাশ্মীরে যতদিন পর্যন্ত না যে সাংবিধানিক পরিবর্তন ভারত করেছে, তা বদল করছে, ততদিন পর্যন্ত তারা ভারতের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ রাখবে না। তাই তারা জিজ্ঞেস করছিলেন – “বিদেশমন্ত্রী ভারতে কেন যাচ্ছেন?” আমার মনে হয়, মিস্টার ভুট্টো জরদারি, এই সমালোচনাকেই থামাতে চেয়েছেন এটা বলে যে ভারতীয় গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার সময়ে তিনি পাকিস্তানের মতামতকেই তুলে ধরতে সফল হয়েছেন। কিন্তু আমি মনে করি, এ সবই হতাশার যুক্তি।

ভয়েস অফ আমেরিকা: ভারতের পররাষ্টমন্ত্রী মন্তব্য করেছিলেন যে পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রী ‘উগ্রপন্থার মুখপাত্র’। আপনি কি মনে করেন এই মন্তব্যটি ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হতে পারে?

বিবেক কাটজু: না, ভারতের নির্দিষ্ট অবস্থানের জন্য আন্তর্জাতিক মহলে কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা আমি দেখছি না, কারণ পররাষ্ট্রমন্ত্রী যা বলেছেন তা নতুন কিছু নয়। এটা বরাবরই ভারত অবস্থান নিয়ে বলে এসেছে যে পাকিস্তানের নাগরিক তথা মিলিটারি নেতৃত্ব উগ্রপন্থীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় বানিয়ে রেখেছে, তারা উগ্রপন্থাকে প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে, বিশেষত ভারতের বিরুদ্ধে এবং তারা সেটা করেই চলেছে। গত তিন দশক ধরে এইটিই আসলে ভারতের অবস্থান। সুতরাং, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এমন কিছু বলেননি যা অতীতে ভারতের নেতৃবৃন্দ কেউ বলেননি। তিনি হয়ত অন্যভাবে বলতে পারতেন, কিন্তু নিঃসন্দেহে তাঁর কথার বিষয়বস্তু আগেও বলা হয়েছে।

আমার মনে হয়, মিস্টার জয়শঙ্কর বলেছিলেন, এসসিও-র বিদেশমন্ত্রীদের বৈঠকে মিস্টার ভুট্টো জরদারির অংশগ্রহণেযা যা সৌজন্য প্রকাশ করা হবে বলে আশা করা হয়েছিল, এসসিও-র এক সদস্য রাষ্ট্রেরএকজন বিদেশমন্ত্রী হিসাবে, তা সবটাই করা হয়েছিল। কিন্তু একটি বহুপাক্ষিক বৈঠক, যেমন এসসিও এবং একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে অংশগ্রহণ করার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সাধারণত, যে অতিথি এরকম বহুপাক্ষিকবৈঠকে অংশগ্রহণ করছেন, তিনি সংগঠকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, আর কিছুর জন্যই নয়, যে ব্যবস্থাপনা করা হয় ও যে আতিথেয়তারআয়োজন করা হয় তার জন্য ধন্যবাদ জানাতে। গোয়াতে এসসিও বৈঠকে অংশগ্রহণকারী অন্য সমস্ত বিদেশমন্ত্রীরা, আমি যতদূর জানি এই অনুরোধ করেছিলেন ও মিস্টার জয়শঙ্কর-এর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিকভাবে সাক্ষাৎ করেছেন। মিস্টার ভুট্টো জারদারি এমন কোনও অনুরোধ করেননি। সুতরাং আমার ধারণা, বৈঠকে আসা বাকি আমন্ত্রিত মন্ত্রীরা এই বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন। আর তাছাড়া গোয়া বৈঠকের ফোকাস ভারত-পাকিস্তানদ্বিপাক্ষিক বৈঠক ছিল না, ছিল সেই বিষয়গুলি যা এই বছর জুলাই মাসে দিল্লিতে হতে চলা এসসিও সামিট-এর জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ভয়েস অফ আমেরিকা: চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর বিষয়ে ভারতের অবস্থানকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

বিবেক কাটজু: আগে যা ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ নামে পরিচিত ছিল, এখন যা বিআরআই – চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ, যা চীন-পাকিস্তানের ক্ষেত্রে চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর (সিপিইসি) নামে পরিচিত – তা নিয়ে ভারতের অবস্থান সর্বদাই খুব স্পষ্ট ছিল। ভারত বিশ্বাস করে এবং সঠিকভাবেই, যে, পরিকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থা তৈরির প্রক্রিয়াতে সব রাষ্ট্রের বিষয়গুলিই ভাবনায় রাখতে হবে এবং সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। সিপিইসি-র ক্ষেত্রে ব্যাপারটা নিশ্চিতভাবেই তেমন নয়। তাই, সিপিইসি নিয়ে ভারতের অবস্থান খুবই স্পষ্ট। এটি বহুবার সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে এবং পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রী যদি বলে থাকেন, ভারত সিপিইসি নিয়ে কোনও উৎসাহ দেখায়নি, তাহলে তাঁর আরও ভাবা উচিৎ ছিল এবং লক্ষ্য করা উচিৎ ছিল যে ভারতের সিপিইসি-র বিরোধীতা বা সিপিইসি নিয়ে তার মনোভাবের কারণ, ভারত মনে করে সিপিইসি তার সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ করে।

ভয়েস অফ আমেরিকা: পাকিস্তানের বিদেশমন্ত্রীর ভারত সফরের ঠিক পরেই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেন। রাজনৈতিক দিক থেকে এই সফরের গুরুত্ব কী?

বিবেক কাটজু: আমি মনে করি, ভারত তার প্রতিবেশীরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতি বা বিদেশ নীতিতে কোনও হস্তক্ষেপ করে না। তার ফোকাস সবসময়েই দ্বিপাক্ষিকসম্পর্কের বিকাশ, যা দুই পক্ষের জন্যই লাভজনক এবং আমি আত্মবিশ্বাসী ডঃ জয়শঙ্কর, তাঁর বাংলাদেশ সফরের সময় কথা বলেছেন ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দু’পক্ষের লাভজনক যোগাযোগেরউন্নতি বিষয়ে, যার মধ্যেই নিহিত রয়েছে দু’দেশের বিবিধ ক্ষেত্রে উন্নয়নের বিরাট সুযোগ – যার মধ্যে রয়েছে যোগাযোগব্যবস্থা থেকে শিল্প, অর্থনীতি । এবং এটা খুবই ভালো যে ভারত-বাংলাদেশ খুবই লাভজনক ও সহষযোগিতামূলক সম্পর্ক উপভোগ করে যা দু’পক্ষের জন্যই লাভজনক এবং দু’দেশের মানুষের জন্যও।

ভয়েস অফ আমেরিকা: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আগামী যুক্তরাষ্ট্র সফর ও ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কে তার সম্ভাব্য প্রভাব বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

বিবেক কাটজু: আমি মনে করি, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক উন্নয়নের উর্দ্ধমুখী জায়গায় রয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে রাষ্ট্রীয় সফরে আমন্ত্রণ করেছেন – এই তথ্য এটাই নির্দেশ করে যে ওয়াশিংটন ও দিল্লি উভয়ের মনেই সম্পর্কটিকে আরও শীর্ষের দিকে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে রয়েছে এবং উভয়েই এক বড় সংখ্যক ক্ষেত্র জুড়ে সহযোগীতামূলক সম্পর্ক তৈরি করতে চাইছে, যার মধ্যে রয়েছে অর্থনীতি ও প্রযুক্তি এবং স্ট্র্যাটেজি। সুতরাং, তাঁদের আলোচনায় আন্তর্জাতিক শান্তি ও সুরক্ষা ও একইসঙ্গে আঞ্চলিক শান্তির বিষয়টিও উঠে আসবে এবং আমি আত্মবিশ্বাসী, আলোচনার প্রক্রিয়ায়, আফিগানিস্থানের পরিস্থিতিও উঠে আসবে। আমাদের শুধু অপেক্ষা করতে হবে এবং দেখতে হবে কী কী বিষয় উঠে আসে এই বৈঠক থেকে। অবশ্যই দুই নেতা-ই আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের মূল্যায়ন তুলে ধরবেন, এবং সেক্ষেত্রে এটা স্বাভাবিক যে অঞ্চলের অন্য দেশগুলি নজর করবে যে, দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ ও একটি উদীয়মান বিশ্বশক্তি হিসাবে ভারত এবং বিশ্বের সবচেয়ে প্রধান দেশ হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র – অঞ্চল বিষয়ক কী আলোচনা করছে।

ভয়েস অফ আমেরিকা: অদূর ভবিষ্যতে ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের কোনও সম্ভাবনা আছে বলে কি আপনি মনে করেন?

বিবেক কাটজু: না, অদূর ভবিষ্যতে আমি ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনও দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি না।

XS
SM
MD
LG