অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

দুই সন্তানকে কাছে রাখতে ঢাকা-টোকিও আইনি লড়াই


তিন কন্যা সন্তানসহ শরীফ-নাকানো পরিবার (ফাইল ছবি)

ইমরান দাবি করেন, এরিকোকে মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত করে তিনি বিয়ে করেছিলেন। পরে ধর্মীয় নিয়ম কানুন নিয়েও তার সঙ্গে কিছুটা সমস্যা দেখা দেয়। এক পর্যায়ে তারা আলাদা বাসায় চলে যান। তখন মেয়েরা কার সঙ্গে থাকবে এ নিয়ে জটিলতার শুরু।

জাপানি নাগরিক নাকানো এরিকো। পেশায় চিকিৎসক। বাংলাদেশি নাগরিক শরীফ ইমরান। পেশায় প্রকৌশলী। দুই জনের পরিচয় টোকিও-র একটি হাসপাতালে। পরিচয় থেকে ভাললাগা। পরে বিয়ে। ২০০৮ সন থেকে ২০২০ সন পর্যন্ত থেকেছেন এক ছাদের নিচে। ঘর আলো করে এসেছে তিন কন্যা সন্তান।
সম্পর্কে জড়ানোর এক যুগ পর এরিকো-ইমরান এখন আলাদা দুনিয়ার বাসিন্দা। গত জানুয়ারিতে বিচ্ছেদের পথ বেছে নিয়েছেন দুইজনই। বিষয়টি এখানেই শেষ হয়ে যেতো পারতো। কিন্তু না।
তিন সন্তানের অভিভাবকত্ব নিয়ে আইনী লড়াইয়ে নেমেছেন দুইজন। বিষয়টি গড়িয়েছে দুই দেশের আদালতে। জাপানে এরিকোর দায়ের করা একটি মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার মধ্যেই ইমরান তার দুই মেয়েকে নিয়ে বাংলাদেশে চলে এসেছেন। ওই দুই মেয়েকে পেতে এরিকো টোকিও থেকে উড়ে এসেছেন ঢাকায়।
ঢাকায় এসে এরিকো সন্তানদের ফিরে পেতে রিট আবেদন করেছেন হাইকোর্টে। আদালত এই রিট আবেদন গ্রহণ করে ৩১শে আগস্ট দুই সন্তানকে হাজির করতে পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

বাংলাদেশ হাইকোর্ট
বাংলাদেশ হাইকোর্ট

এই নির্দেশের দুই দিনের মাথায় সিআইডি এরিকোর দুই শিশু কন্যাকে তাদের বাবার বাসা থেকে নিয়ে আসে। রোববার মধ্যরাতে তাদের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে নিয়ে রাখা হয়। সোমবার শিশু দুটিকে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে নিয়ে যাওয়ার তথ্য হাইকোর্টে উপস্থাপন করেন শিশুদের পিতা ইমরানের আইনজীবী এডভোকেট ফাওজিয়া করিম। পরে ভার্চুয়াল বেঞ্চে দুই পক্ষের শুনানি হয়। শুনানির পর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও মোস্তাফিজুর রহমানের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ শিশু দুটিকে ৩১শে আগস্ট পর্যন্ত ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে উন্নত পরিবেশে রাখার নির্দেশ দেন।
এই সময়ে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শিশু দুটির মা এবং দুপুরের পর থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তাদের বাবা ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে থাকতে পারবেন। আদালত দুই পক্ষের আইনজীবীদের এও নির্দেশনা দিয়েছেন যে, এই সময়ের মধ্যে তারা নিজেরা আলোচনা করে একটি সমাধানের পথ বের করে নিতে যাতে শিশু দুটি পরবর্তীতে আর কোনো ভোগান্তির শিকার না হয়। আদালত আদেশ দেয়ার সময় উল্লেখ করেন, বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের কারণে শিশু দুটি ভোগান্তিতে পড়েছে। এটি কারও কাম্য নয়।

ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে এরিকোর দুই শিশু কন্যা
ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে এরিকোর দুই শিশু কন্যা

আদালত এমন নির্দেশনা দিলেও শিশু দুটির বাবার তরফে আইনজীবী আর্জি জানিয়েছিলেন, তার বাসাতেই যাতে সন্তানদের রাখা হয়। শিশুদের মায়ের তরফে তাদের জাপান দূতাবাসের জিম্মায় নেয়ার আবেদন করা হয়েছিল। শুনানির সময় এরিকো নিজেও আদালতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি উচ্চ আদালতের নির্দেশনায় সন্তোষ প্রকাশ করেন।
প্রায় এক যুগ সংসার করার পর ঠিক কি কারণে সমস্যা তৈরি হলো-শিশু দুটির বাবা শরীফ ইমরানের কাছে ভয়েস অফ আমেরিকার এই প্রতিনিধি তা জানতে চেয়েছিলেন। জবাবে তিনি বলেন, ভালবেসে বিয়ে করেছিলেন এরিকোকে। শুরুটা ভালই ছিল। পরে কিছু বিষয়ে দ্বিমত তৈরি হয়। একটি ফ্ল্যাট নিয়ে এরিকোর পরিবারের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। ইমরান দাবি করেন, এরিকোকে মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত করে তিনি বিয়ে করেছিলেন। পরে ধর্মীয় নিয়ম কানুন নিয়েও তার সঙ্গে কিছুটা সমস্যা দেখা দেয়। এক পর্যায়ে তারা আলাদা বাসায় চলে যান। তখন মেয়েরা কার সঙ্গে থাকবে এ নিয়ে জটিলতার শুরু। এরিকো অবশ্য সন্তানদের অভিভাবকত্ব পেতে জাপানের আদালতের দ্বারস্ত হয়েছিলেন। ওই আবেদনের রায় হওয়ার আগেই বড় দুই মেয়ে জেসমিন মালিকা ও লাইলা লিনাকে নিয়ে গত ২১শে ফেব্রুয়ারি ঢাকায় চলে আসেন ইমরান।

শিশির মনির, নাকানো এরিকোর আইনজীবী
শিশির মনির, নাকানো এরিকোর আইনজীবী

নাকানো এরিকোর আইনজীবী শিশির মনির জানিয়েছেন, গত ৩১শে মে টোকিওর পারিবারিক আদালত এরিকোর অনুকূলে জেসমিন ও লিনার জিম্মা হস্তান্তরের আদেশ দেন। ছোট মেয়ে সানিয়া হেনাকে মায়ের কাছে রেখে গত ১৮ই জুলাই এরিকো শ্রীলংকা হয়ে বাংলাদেশে আসেন।

তিনি জানান, গত ১৮ই জানুয়ারি ইমরান তার স্ত্রী এরিকোর সঙ্গে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করেন। এরপর ২১শে জানুয়ারি ইমরান টোকিও’র স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে তার মেয়ে জেসমিন মালিকাকে নিয়ে যাওয়ার আবেদন করেন। কিন্তু তাতে এরিকোর সম্মতি না থাকায় স্কুল কর্তৃপক্ষ তার প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। পরে স্কুলবাসে বাড়ি ফেরার পথে বাসস্টপেজ থেকে ইমরান তাদের বড় দুই মেয়ে জেসমিন ও লিনাকে অন্য একটি ভাড়া বাসায় নিয়ে যান। চারদিন পর ২৫শে জানুয়ারি ইমরান তার আইনজীবীর মাধ্যমে এরিকোর কাছে শিশুদের পাসপোর্ট হস্তান্তরের আবেদন করেন। কিন্তু এরিকো তা প্রত্যাখ্যান করেন। এর মধ্যে ২৮শে জানুয়ারি এরিকো টোকিওর পারিবারিক আদালতে তার সন্তানদের জিম্মার জন্য অর্ন্তবর্তীকালীন আদেশ চেয়ে মামলা করেন।

এরিকোর আইনজীবীর অভিযোগ, ৯ই ফেব্রুয়ারি মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে ইমরান তার মেয়েদের জন্য নতুন পাসপোর্টের আবেদন করেন এবং ১৭ই ফেব্রুয়ারি নতুন পাসপোর্ট গ্রহণ করেন। পরে ২১শে ফেব্রুয়ারি তিনি দুই মেয়ে জেসমিন ও লিনাকে নিয়ে দুবাই হয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন।

XS
SM
MD
LG