অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

বিশ্বব্যাপী শিশু শ্রম ও দাসত্বের নুতন ধরন দিনে দিনে বাড়ছে: নোবেল পুরস্কার জয়ী কৈলাশ সত্যার্থী


নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী কৈলাশ সত্যার্থী বলেছেন, বিশ্বব্যাপী শিশু শ্রম, শিশু দাসত্ব ও শিশু পাচারের নুতন ধরন দিনে দিনে বাড়ছে। তিনি শিশু শ্রম বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে অতীতের মত নেতৃত্ব দেবার আহবান জানান। ওয়াশিংটনের ক্যাপিটল হিলে এক ব্রিফিং-এ কৈলাশ সত্যার্থী এ আহবান জানান। সেখানে ছিলেন সহকর্মী তাওহীদুল ইসলাম।

ওয়াশিংটনে ক্যাপিটল হিলের কংগ্রেশনাল ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির শুনানী কক্ষে এক ব্রিফিং-এ নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী ভারতের মানবাধিকার কর্মী কৈলাশ সত্যার্থী বিশ্বব্যাপী শিশু শ্রমের নানা দিক তুলে ধরেন। এসময় আর্ন্তজাতিক শ্রম সংস্থা সহ শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠেনর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ব্রিফিং-এ কৈলাশ সত্যার্থী শিশু শ্রম বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দেবার আহবান জানান।

“আমরা প্রতিটি শিশুর জন্য নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও শিক্ষা নিশ্চিত না করে, নিরাপদ ও সুরক্ষিত পৃথিবী তৈরী করতে পারবো না। আমি দৃঢ় ভাবে সমর্থন করছি যে, ক্রমবর্ধমান সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গীবাদ এবং মৌলবাদ থেকে পৃথিবীকে রক্ষার জন্য সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী সুরক্ষা হচ্ছে গুনগত মানের ও অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা। শিশু শ্রম, নিরক্ষরতা ও দারিদ্রতা একটি চক্র তৈরী করে। তারা কিভাবে ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে শ্রমিক হিসাবে কাজ করেত দিচ্ছে এবং ২১ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের চাকরী নেই। আইএলও সহ অন্য সংস্থাগুলো অনেক কাজ করছে। কিন্তু এখনো অনেক কিছু করতে হবে। আজ আমি আবারো যুক্তরাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দেবার আহবান জানাচ্ছি। কেবল নিজের দেশের শিশু শ্রমের ইতি টানতে নয়, অতীতের মত নেতৃত্ব প্রদর্শন করার জন্য, যা আপনারা অতীতে প্রমান করেছেন। একটি শিশু ভারত, আফ্রিকা অথবা ল্যাটিন আমেরিকায় দাস হলেও সে আপনাদের শিশু। তুরস্কে একটি উদ্বাস্তু শিশু পতিতালয়ে বিক্রি হয়েছে, সিরিয়ার একটি শিশু পরিবার ও দেশ হারিয়েছে কোন কারন ছাড়াই। কোন শিশু যুদ্ধা বা সন্ত্রাসের জন্য দায়ি না।“

শিশু শ্রম ও দাসত্বের নুতন ধরন দিনে দিনে বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেন কৈলাশ সত্যার্থী।

“বর্তমানে আমরা অনেক ধরনের সমস্যা দেখছি। কেবল সনাতন পদ্ধতিতে শিশু শ্রম নয়, সংঘর্ষ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে সারা পৃথিবীতে শিশু দাস, শিশু পাচার ও শিশু শ্রম কিভাবে বাড়ছে আমরা তাও দেখছি। ৫৬ কোটি শিশু সংকট, সংঘর্ষ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগপূর্ন অবস্থার মধ্যে বসবাস করছে, যা প্রায় পৃথিবীর অর্ধেক শিশু। তুরস্কের উদ্বাস্তু শিবিরে আমি কিছু মানুষের সঙ্গে দেখা করেছি। তারা সিরিয়া ও ইয়েমন থেকে এসেছে, মুলত সিরিয়া থেকে এসেছে। সেখানে নুতন ধরনের শিশু দাসত্ব, শিশু পাচার ও শিশু শ্রম বাড়ছে। আমরা জানি আমাদেরকে এর সমাধান খুঁজে পেতে হবে।“

এরপর ভয়েস অফ আমেরিকার বাংলা বিভাগের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে কৈলাশ সত্যার্থী, শিশু শ্রম বন্ধে কি করা যেতে পারে, তা তুলে ধরেন।

“আমি দেখতে পাচ্ছি গত ১৫ বছরে শিশু শ্রম উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্বদিচ্ছা, সামাজিক সংহতি এবং পর্যায়ক্রমে গন আন্দোলন। এর জন্য আরো অর্থ ব্যয় এবং শিশু সংক্রান্ত বিষয়কে সরকারের অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। এর জন্য ব্যবসা খাত থেকে শক্তিশালী সমর্থন প্রয়োজন। সুতরাং সুশীর সমাজ, রাষ্ট্র ও ব্যবসা খাতকে হাতে হাত মিলিয়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হবে।“

দক্ষিন এশিয়ার দেশগুলো শিশু শ্রম বন্ধে কতটা সফল, এমন প্রশ্নে কৈলাশ সত্যার্থী বলেন,

“বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে, যেমনটি ভারত করেছে। আমরা দক্ষিন এশিয়ার বেশিরভাগ দেশে শিশু শ্রমের হ্রাস দেখতে পাচ্ছি। আমরা দেখতে পাচ্ছি শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার সংখ্যা বেড়েছে। উদাহরন হিসাবে বলা যায়, ভারতে বিদ্যালয়ে শিশুদের দুপুরের খাবার দেযা হয়। বাংলাদেশের বিদ্যালয়গুলোতে বৃত্তি ও শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচী রয়েছে এবং মেয়েদের অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়টি বেশ সফল হয়েছে। সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি, দক্ষিন এশিয়ার দেশগুলো সফল হচ্ছে। কিন্তু আরো বড় ধরনের উদ্যোগ, আরো বেশি অগ্রাধিকার ও রাজনৈতিক স্বদিচ্ছার প্রয়োজন।“

শিশু শ্রম বন্ধে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন এই নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী।

“আমি বলতে চাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন হচ্ছে শিক্ষা। সরকারকে বাজেট বরাদ্দে শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটা উন্নয়নশীল দেশগুলোর যেমন দায়িত্ব তেমনি শিল্পান্নোত বিশ্বেরও। বিষয়টি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত এবং সমস্যা ও সমাধানও পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। আমারা যদি মৌলবাদ বা বৈশ্বিক উষ্মায়ন বা কর্মসংস্থানের অভাবে যে সংকট বা সংঘর্ষ হয়, তা থামাতে চাই তাহলে আমাদেরকে শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ করতে হবে। গুনগত ও বিনা খরচে গনশিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অধীনে তা নিশ্চিত করতে বিশ্ব প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সুতরাং শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশ্বের সব শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিবছর অতিরিক্ত ৭ হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন। এটা বড় কোন বিষয় নয়। কারন বিশ্ব তথাকথিত নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র ও সেনাবাহিনীর জন্য ব্যয় করে এক লাখ ৬০ হাজার কোটি ডলার। এই খাতে এক সপ্তাহে যে ব্যয় হয়, প্রায় তার সমান পরিমান অর্থ প্রয়োজন সব শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করতে। সুতরাং সমগ্র সমাজ যদি এককভাবে শিশুদের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে পারে, আমরা অবশ্যই শিশু শ্রমের ইতি টানতে পারবো।“

বিশ্ব সংস্থাগুলো শিশু শ্রম বন্ধে কি যথাযথ পদক্ষেপ নিতে পারছে, এমন প্রশ্নে কৈলাশ সত্যার্থী বলেন,

“আর্ন্তজাতিক শ্রম সংস্থা, ইউনেস্ক, ইউএনডিপি, বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা—এইসব সংস্থা মানবাতা ও শিশুদের নানা বিষয় নিয়ে কাজ করে। তাদের নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের চেয়ে তাদের আরো সক্রিয় হতে হবে এবং তাদের নেতৃত্বের প্রদর্শন করতে হবে। আমি দেখতে পাচ্ছি শক্তিশালী, সক্রিয় ও গতিশীল জাতিসংঘ ছাড়া অনেক মানবিক সংকটের ইতিটানা সম্ভব নয় এবং শিশু শ্রম তার মধ্যে একটি।“

XS
SM
MD
LG