অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা- সতর্ক না হলে বাংলাদেশে করোনা অনিয়ন্ত্রিত হতে পারে


ফাইল ছবি-মানবজমিন

বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ আর মৃত্যু দুইই নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। দুইদিন কোনো মৃত্যু ছিল না। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ফের পরিস্থিতি অনিয়ন্ত্রিত হতে পারে। পর্যাপ্ত টিকা না দেয়া, স্বাস্থ্যবিধি না মানার কারণে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট ওমিক্রন বাংলাদেশে নতুন এক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে বলে তারা মনে করছেন। সরকার মনোনীত জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটিও একই আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও মনে করছেন- আসছে ফেব্রুয়ারি, মার্চ এবং এপ্রিলে সংক্রমণ বাড়তে পারে। এই আশঙ্কা থেকেই সরকারের তরফে ইতিমধ্যেই বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকে এই বিধিনিষেধ কার্যকর হবে।

যদিও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, টিকা দেয়ার কার্যক্রম আরও বাড়ানো না হলে, স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষিত থাকলে এই বিধিনিষেধ কোনো ফল বয়ে আনবে না।

সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শুরু থেকে টিকার ওপর জোর দেয়ার কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত দেশে মাত্র ৩২ শতাংশের মতো মানুষকে দুই ডোজ করে টিকা দেয়া সম্ভব হয়েছে। অন্তত একডোজ টিকা পেয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যাও মোট জনগোষ্ঠীর অর্ধেকেরও কম।

করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকার গঠিত জাতীয় পরামর্শক কমিটির অন্যতম সদস্য এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলামের আশঙ্কা, এবার সংক্রমণ আগের বছরের চেয়ে বেশি হতে পারে। তাই দ্রুত সব মানুষকে টিকার আওতায় আনার ব্যবস্থা করতে হবে। মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারের জারি করা নতুন নির্দেশনার বিষয়ে এই ভাইরোলজিস্ট বলেন, অতীত অভিজ্ঞতা বলে এটি বাস্তবায়ন করা কঠিন হবে। সরকারকে বেশি বেশি অভিযান পরিচালনা করতে হবে। তিনি বলেন, নতুন নির্দেশনা ১৩ই জানুয়ারি থেকে বাস্তবায়নের কথা বলছে। অথচ নির্বাচন কমিশন নারায়ণগঞ্জে ১৬ তারিখে নির্বাচন করবে। অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানও হচ্ছে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর উপদেষ্টা ডা. মুস্তাক হোসেন বলেন, স্বাস্থ্যবিধি না মানলে সংক্রমণ আরো দ্রুত বাড়বে। যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে তা সঠিকভাবে মানা হলে সংক্রমণ হয়তো কম থাকবে। না হলে সামনে হয়তো কঠোর বিধিনিষেধ দিতে হবে। তাই নিজেদের প্রয়োজনেই সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে।

করোনা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সোমবার নতুন করে বিধিনিষেধ আরোপের ঘোষণা দেয় সরকার। ১৩ই জানুয়ারি থেকে ১১ দফা নির্দেশনা মানতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। ওই প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী পরবর্তী নির্দেশনা দেয়ার আগ পর্যন্ত সব সভা-সমাবেশ বন্ধ থাকবে। সব ধরনের গণপরিবহন অর্ধেক যাত্রী বহন করতে পারবে। এছাড়া হোটেল-রেস্তোরাঁয় বসে খেতে হলে সঙ্গে টিকা সনদ রাখতে হবে। উন্মুক্ত স্থানে মাস্ক পরতে হবে। এই বিধি ভঙ্গ করলে শাস্তির হুঁশিয়ারিও দেয়া হয়েছে সরকারি প্রজ্ঞাপনে।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, সব মানুষকে টিকার আওতায় আনার আগে টিকা সনদ সঙ্গে নিয়ে রেস্তোরাঁয় যাওয়ার বাধ্যবাধকতা নিয়ে। এছাড়া সরকার সভা, সমাবেশে বিধিনিষেধ দিলেও সরকারি দপ্তরের অধীনে ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা চলমান রয়েছে। আপাতত এটি চলবে বলে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো-ইপিবি জানিয়েছে। তবে মেলায় প্রবেশ করতে হলে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পহেলা ফেব্রুয়ারি অমর একুশে গ্রন্থমেলা আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়ে এগোচ্ছে বাংলা একাডেমি। এই মেলা আদৌ শুরু হবে কিনা তা এখনও স্পষ্ট নয়। সরকারি বিধিনিষেধের মধ্যেই আসছে ১৬ই জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠানের কথা রয়েছে । সোমবার সরকারি বিধিনিষেধ জারির দিনে ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই এসোসিয়েশনের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসেবে করোনা প্রতিরোধে প্রায় এক বছরে দেশে সাড়ে ১৩ কোটি ডোজ টিকার কিছু বেশি বিতরণ করা হয়েছে। মোট জনসংখ্যার ৪৮ শতাংশ প্রথম ডোজ নিয়েছেন। দ্বিতীয় ডোজ টিকা গ্রহণকারীর সংখ্যা ৩৩ শতাংশ। অর্থাৎ ৬৭ শতাংশ মানুষ এখনও পূর্ণডোজ টিকা পাননি। যদিও এরই মধ্যে তৃতীয় বা বুস্টার ডোজ দেয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এ পর্যন্ত সাড়ে ৪ লাখের কিছু বেশি মানুষ তৃতীয় ডোজ গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএস’র সর্বশেষ তথ্য মতে, দেশে মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৯১ লাখ ১০ হাজার।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ১০ই জানুয়ারি পর্যন্ত প্রথম ডোজ টিকা নিয়েছেন ৮ কোটি ৩ লাখ ২৭ হাজার ৩৫১ জন। দ্বিতীয় ডোজ গ্রহণ করেছেন ৫ কোটি ৫১ লাখ ৭০ হাজার ১৫৭ জন। এখন পর্যন্ত প্রথম ও দ্বিতীয় ডোজ মিলে বিভিন্ন টিকা দেয়া হয়েছে ১৩ কোটি ৫৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫০৮ ডোজ।

ওদিকে সর্বশেষ একদিনে নতুন করে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আরও বেড়েছে। দৈনিক শনাক্তের হার পৌঁছেছে ৯ শতাংশের কাছাকাছি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ২ হাজার ৪৫৮ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। মৃত্যু হয়েছে ২ জনের।

ঢাকা থেকে মতিউর রহমান চৌধুরী

XS
SM
MD
LG