অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে গজিয়ে উঠেছে বহু সংগঠন


আওয়ামী লীগের নাম ভাঙিয়ে গজিয়ে উঠেছে বহু সংগঠন

যেহেতু আওয়ামী লীগ একযুগ ধরে ক্ষমতায়, সে কারণে গড়ে উঠেছে বহু সাইনবোর্ড সর্বস্ব, অস্তিত্বহীন রাজনৈতিক সংগঠন। যাদের কাজ হচ্ছে, বিভিন্ন দিবসে অনুষ্ঠান আয়োজন করা। নেতাদের সঙ্গে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করা। উদ্দেশ্য চাঁদাবাজি। সারা বছর ধরেই চলে এই বাণিজ্য। তবে বিশেষ বিশেষ দিবসে এর মাত্রা বেড়ে যায়

প্রচার লীগ থেকে শিশু লীগ, বাহারি সব নাম। বাংলাদেশে এটা নতুন কোনো ঘটনা নয়। যে দল ক্ষমতায় আসে সে দলের নেতা-নেত্রীর নামে এ ধরনের প্যাড সর্বস্ব সংগঠন গড়ে ওঠে।

যেহেতু আওয়ামী লীগ একযুগ ধরে ক্ষমতায়, সে কারণে গড়ে উঠেছে বহু সাইনবোর্ড সর্বস্ব, অস্তিত্বহীন রাজনৈতিক সংগঠন। যাদের কাজ হচ্ছে, বিভিন্ন দিবসে অনুষ্ঠান আয়োজন করা। নেতাদের সঙ্গে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করা। উদ্দেশ্য চাঁদাবাজি। সারা বছর ধরেই চলে এই বাণিজ্য। তবে বিশেষ বিশেষ দিবসে এর মাত্রা বেড়ে যায়। এসময় অনেক ব্যবসায়ী নিজের প্রতিষ্ঠানে যাওয়া থেকে বিরত থাকেন। চাঁদাবাজিই শুধু নয়- জমি দখল, বাড়ি দখল, হাট দখল, ফুটপাত দখলসহ নানাবিধ কাজ তারা করে থাকে।

এসব কর্মকান্ডে আওয়ামী লীগ নিজেই বিব্রত। হার্ডলাইনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। এ ধরনের সংগঠনের সঠিক কোনো তালিকা নেই। মিডিয়া অনুসন্ধান চালিয়ে ৭৪টির খোঁজ পেয়েছে। এসব সংগঠনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো সম্পর্ক নেই। যদিও দলটির অনেক নেতার নাম আসছে এসব সংগঠনের সঙ্গে।

অস্তিত্বহীন এসব সংগঠনের অনুষ্ঠানে অনেক প্রভাবশালী নেতাদের দেখা যায়। বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর নাম ও ছবি ব্যবহার করে সুযোগ সন্ধানীরা ফায়দা তোলার চেষ্টা করে। শেখ রাসেল ও সজীব ওয়াজেদ জয়ের নামেও একাধিক ভুঁইফোঁড় সংগঠন রয়েছে। এছাড়া জননেত্রীর নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে এসব সংগঠনের হদিস পাওয়া যায়।

অতি সম্প্রতি হেলেনা জাহাঙ্গীরের 'চাকরিজীবী লীগ' শিরোনামে আসে। ভাইরাল হয়ে যায় ওয়েব দুনিয়ায়। বিস্তর সমালোচনার মুখে আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য পদ থেকে বহিস্কার করা হয় হেলেনা জাহাঙ্গীরকে। গুলশানের বাসায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে। তাকে নেয়া হয়েছে রিমান্ডে। একাধিক নেতার সঙ্গে তার ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়। শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও তিনি বিদেশ সফর করেন একাধিকবার।

এ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, স্বীকৃত সংগঠনের বাইরে যেকোনো নামের সঙ্গে 'লীগ' বা 'আওয়ামী' শব্দ জুড়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

কাদের বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, স্বীকৃত সংগঠনের বাইরে কোনো মনগড়া বা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা সংগঠনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি বলেন, দল ক্ষমতায় থাকলে নানান সুবিধাভোগী শ্রেনী এ ধরনের চেষ্টায় লিপ্ত হয়। যুক্ত হয় নানান আগাছা-পরগাছা।

লেখক, গবেষক ও বহু রাজনৈতিক বইয়ের প্রণেতা মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগে বানের পানির মতো মানুষ ঢুকছে। এর সঙ্গে ঢুকছে আবর্জনা। এই সুযোগে মতলববাজরা এসব সংগঠনের জন্ম দিয়ে স্বার্থ হাসিল করছে। নেতারাও যাচ্ছেন এসব ভুঁইফোঁড় দোকানে। এদের কোনো রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নেই। এদের কাজ শুধু দেয়া, নেয়ার মধ্যে।

গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ৮ টি। এগুলো হচ্ছে যুবলীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, যুব মহিলা লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, মৎস্যজীবী লীগ ও তাঁতি লীগ। আর ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন হচ্ছে- ছাত্রলীগ ও শ্রমিক লীগ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বা তার পরিবারের সদস্যেদের নামে কোনো সংগঠন করতে হলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টের অনুমোদন নিতে হয়। কিন্তু কে নেয় এই অনুমোদন?

যেসব সংগঠনের নাম মিডিয়ায় এসেছে সেগুলো হলো-

আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ, জননেত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় সংসদ, আওয়ামী মোটরচালক লীগ, দেশরত্ন পরিষদ, জননেত্রী শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় লীগ, আমরা মুজিব সেনা, আওয়ামী প্রচার লীগ, রাসেল মেমোরিয়াল একাডেমি, আওয়ামী সমবায় লীগ, আওয়ামী তৃণমূল লীগ, আওয়ামী ছিন্নমূল হকার্স লীগ, আওয়ামী তরুণ লীগ, আওয়ামী রিকশা মালিক-শ্রমিক ঐক্য লীগ, আওয়ামী যুব হকার্স লীগ, আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ, আওয়ামী তৃণমূল লীগ, মুক্তিযোদ্ধা তরুণ লীগ, আওয়ামী পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা লীগ, আওয়ামী পরিবহন শ্রমিক লীগ, বঙ্গবন্ধু লেখক লীগ, নৌকার নতুন প্রজন্ম, আওয়ামী নৌকার মাঝি শ্রমিক লীগ, আওয়ামী ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী লীগ, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ, বঙ্গবন্ধু একাডেমি, আওয়ামী যুব সাংস্কৃতিক জোট, বঙ্গবন্ধু নাগরিক সংহতি পরিষদ, ওলামা লীগ, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনা গবেষণা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু প্রজন্ম লীগ, বঙ্গবন্ধু যুব পরিষদ, বঙ্গবন্ধু ছাত্র পরিষদ, বঙ্গবন্ধু স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ, বঙ্গবন্ধু বাস্তুহারা লীগ, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী হকার্স ফেডারেশন, বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারা বাস্তবায়ন পরিষদ, বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদ, বঙ্গবন্ধু গ্রাম ডাক্তার পরিষদ, বঙ্গবন্ধু নাগরিক সংহতি পরিষদ, বঙ্গবন্ধু লেখক লীগ, বঙ্গবন্ধু গবেষণা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু আদর্শ পরিষদ, আমরা মুজিব হব, চেতনায় মুজিব, বঙ্গবন্ধুর সৈনিক লীগ, ছিন্নমূল মৎস্যজীবী লীগ, নৌকার সমর্থক গোষ্ঠী, দেশীয় চিকিৎসক লীগ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী লীগ, ডিজিটাল ছাত্রলীগ, ডিজিটাল আওয়ামী প্রজন্ম লীগ, ডিজিটাল আওয়ামী ওলামা লীগ, বাংলাদেশ আওয়ামী পর্যটন লীগ, ঠিকানা বাংলাদেশ, জনতার প্রত্যাশা, জননেত্রী পরিষদ, বঙ্গমাতা পরিষদ, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব পরিষদ, আওয়ামী শিশু যুবক সাংস্কৃতিক জোট, একুশে আগস্ট ঘাতক নির্মূল কমিটি, তৃণমূল লীগ, আমরা নৌকার প্রজন্ম, আওয়ামী প্রচার লীগ, সজীব ওয়াজেদ জয় লীগ, বাংলাদেশ তথ্যপ্রযুক্তি লীগ, আওয়ামী তরুণ প্রজন্ম লীগ, বাংলাদেশ জনসেবা লীগ, অভিভাবক লীগ, উদ্যোক্তা লীগ, আওয়ামী অনলাইন লীগ, বিশ্ব আওয়ামী অনলাইন লীগ, আওয়ামী শিশু-কিশোর লীগ, আওয়ামী শিশু লীগ।

গত ঈদে ময়মনসিংহে শিশু লীগ নামে একটি সংগঠনের খবর পাওয়া যায়। বড় বড় রঙিন পোস্টার দেয়ালে দেখে ময়মনসিংহবাসী কিছুটা হতবাক হন। পোস্টারে শিশু কর্মীর বিরাট ছবি। উপরে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ছবি ছোট্ট করে। পাশে অবশ্য আরেকটি ছবি রয়েছে। যার পরিচয়ে বলা হয়েছে- সাধারণ সম্পাদক, ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগ।

XS
SM
MD
LG