অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

ভালবাসা সিক্ত একটি অনন্য অলিম্পিক


ট্রাইথলনে বেলজিয়ান ক্লেয়ার মিশেল পড়ে গেলে ২৪তম স্থান পাওয়া নরওয়ের লোট মিলার তাঁর সঙ্গে কথা বলেন, সান্ত্বনা দেন। ফাইল ফটো- এপি

বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদদের মধ্যে একে অপরের প্রতি ভালবাসা, সহানুভূতি, ভদ্রতা ও আন্তরিকতার প্রমাণ স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে এবারের অলিম্পিকে। একে অপরের সাফল্য তাঁরা যেমনভাবে উদযাপন করছেন, তেমনি ভাগাভাগি করছেন কষ্ট, হতাশা ও বিফলতা। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে কথা বলছেন একে অন্যের সঙ্গে। 

জাপানের টোকিওতে এবারের অলিম্পিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ভালবাসায় ভরা অসাধারণ একটি ক্রীড়া আসর যা অনুষ্ঠিত হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দিয়ে। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদদের মধ্যে একে অপরের প্রতি ভালবাসা, সহানুভূতি, ভদ্রতা ও আন্তরিকতার প্রমাণ স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে এবারের অলিম্পিকে। একে অপরের সাফল্য তাঁরা যেমনভাবে উদযাপন করছেন, তেমনি ভাগাভাগি করছেন কষ্ট, হতাশা ও বিফলতা। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে কথা বলছেন একে অন্যের সঙ্গে।

ক্রীড়াবিদের মধ্যে সহানুভূতির অসংখ্য প্রমাণ দেখা গেছে এবারের অলিম্পিকে। সামান্য আগে যে সার্ফারের কাছে হেরেছেন তাকেই গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় অনুবাদে সহায়তা করতে এগিয়ে এসেছেন হেরে যাওয়া সার্ফার।

হাই জাম্প-এ টাইব্রেকার না করে স্বর্ণ পদক ভাগাভাগি করতে রাজি হয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে। দৌড় প্রতিযোগিতায় ধাক্কা লেগে পড়ার পর দুজনে ধরাধরি করে উঠে দৌড় শেষ করেছেন।

প্রথমবার অলিম্পিকে অংশ নিয়ে ব্রাজিলের ইটালো ফেরেইরার কাছে হেরেছেন জাপানের সার্ফার কানোয়া ইগারাশি। তিনি হতাশ। উপরন্তু তিনি অনলাইনে বিদ্রূপের শিকার হয়েছেন। চুপ না থেকে সংবাদ সম্মেলনে প্রতিদ্বন্দ্বী ফেরেইরাকে পর্তুগিজ ভাষা অনুবাদ করে কথা বলতে সহায়তা করেছেন এই জাপানি-আমেরিকান সার্ফার। উপস্থিত লোকজন সেটা উপভোগ করেছেন, অনুবাদে সহায়তার জন্যে একজন কর্মকর্তা ইগারাশিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। প্রফুল্ল চিত্তে সদ্য ইংরেজি শেখা ফেরেইরা বলেছে, “হ্যাঁ, ধন্যবাদ কানোয়া”।

আরেকটি উদাহরণ ইতালির গিয়ানমারকো তাম্বেরি ও কাতারের মুতাজ বারশিমের হাই জাম্পের টাই। দুজনই ২.৩৯ মিটার (৭ ফুট ১০ ইঞ্চি) উচ্চতায় লাফাতে তিনবার করে ব্যর্থ হন। টাইব্রেকারের মাধ্যমে এর সমাধান হয়তে পারতো। কিন্তু দুজনেই সম্মত হন স্বর্ণ পদক ভাগাভাগি করে নেয়ার।

বারশিম বলেন, “আমি মনে করি যতোটুকু আমি করেছি তাতে আমি পদক দাবী করতে পারি। তাম্বেরিও একই কাজ করেছেন। একইভাবে আমি মনে করি তিনিও পদক দাবী করতে পারেন। বিষয়টি আসলে খেলার চাইতেও বড়। নতুন প্রজন্মের কাছে আমরা এই বার্তা দিতে চাই”।

পদক ভাগাভাগির সিদ্ধান্ত নেয়ার পর তাম্বেরি বারশিমের হাত ধরে বলেন, “বন্ধুর সঙ্গে ভাগাভাগির আনন্দই অন্য রকম। এটি জাদুকরি”।

৮০০ মিটার দৌড়ের সেমিফাইনালে যুক্তরাষ্ট্রের ইসাইয়াহ জুয়েট ও বতসোয়ানার নিজেল অ্যামোস ধাক্কা লেগে পড়ে যান। রেগে না গিয়ে তাঁরা একে ওপরকে সহায়তা করে একত্রে দৌড় শেষ করেন।

বহু ক্রীড়াবিদের একে ওপরের সঙ্গে পরিচয় খেলার মাঠে এবং তা দীর্ঘ ও ঘনিষ্ঠ হয়। পেশাজীবনের ভালো মন্দে নানা সময়ে তা নানাভাবে প্রভাব ফেলে। আর মহামারির কারণে পিছিয়ে যাওয়া টোকিও অলিম্পিকে সেই আবেগ, অনুভূতি ও ভালবাসার প্রকাশ দেখা যায়।

কভিড-১৯ সংক্রমণ প্রতিরোধে এবারের অলিম্পিকে যেসব কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে তাতে সাধারণত ক্রীড়াবিদরা যেভাবে দেখা সাক্ষাৎ বা মেলামেশা করে থাকেন তা করতে পারার কথা নয়।

শনিবার শিওকাজে পার্কে বিচ ভলিবল প্রতিযোগিতার রাউন্ড রবিন ফাইনালে তিন সেটে জেতার পর উৎফুল্ল ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড় হেবেকা কাভালকান্টি, যুক্তরাষ্ট্রের কেলি ক্লেস যখন খেলা শেষে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন, তাঁর ওপর বোতল খুলে পানি ঢেলে দেন। ক্লেস-এর টিম মেট সেরাহ স্পন্সিল উৎফুল্ল কণ্ঠে বলেন, “আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে কোয়ারেন্টিনের পর আমরা তাদের সঙ্গে এক টেবিলে বসে ডিনার করতে পারবো”।

আমেরিকান সার্ফার কারিসা মুরের মতে মহামারি এবং এর ফলে জারি করা সীমাবদ্ধতা বরঞ্চ তাঁকে অন্যান্য সার্ফারদের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন বলেন তিনি সাধারণত সার্ফিং প্রতিযোগিতায় তাঁর স্বামী বা বাবার সঙ্গে যান। তবে এ বছর ভক্ত অনুরাগীদের আসতে দেয়া হয়নি। তাদের অনুপস্থিতি তাঁর জন্যে কষ্টকর। যুক্তরাষ্ট্র দলের সঙ্গে অলিম্পিক শুরুর ১০ দিন আগে তিনি জাপান আসেন। তিনি বললেন একটি বাড়িতে তাঁর বিবেচনায় তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ক্যারোলিন মার্কসসহ অন্য সার্ফারদের সঙ্গে থেকে বেশ মানিয়ে নিয়েছেন।

মুর জানান টোকিও অলিম্পিকের আগে মার্কসকে তিনি চিনতেন না। তবে যে রাত্রে তাঁকে জয়ের মুকুট পরানো হলো এবং মার্কস চতুর্থ হোলো, মার্কসই প্রথম তাঁকে অভিনন্দন জানান।

মুর বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সার্ফ দলের পাশাপাশি তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়াটা চমৎকার একটি বিষয়। দুই সপ্তাহ পর মনে হলো আরেকটি একটি পরিবার আমরা।

গত সপ্তাহের ট্রাইথলনে ২৪তম স্থানে থাকা নরওয়ের লোট মিলার, বেলজিয়ান ক্লেয়ার মিশেল পড়ে গেলে তাঁর সঙ্গে কথা বলেন। প্রথম হওয়া বারমুডার ফ্লোরা ডাফির চেয়ে ১৫ মিনিট পরে হলেও মিশেল তাঁর দৌড় শেষ করেন।

মিশেলকে মিলার বলেছিলেন, “তুমি একজন সত্যিকার যোদ্ধা। এটাই অলিম্পিকের চেতনা এবং তুমি একশোতে একশো পেয়েছো”।

XS
SM
MD
LG