অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

"লাভ জিহাদ": সেক্যুলার ভারত কোন পথে? 


ভারতের আহমেদাবাদে হাতে মেহেন্দি পরা বিয়ের পাত্রী- ফাইল ফটো- এপি

যুবকটি যে মেয়েটির পাশে বসেছিলেন তিনি তাঁর পুরনো বান্ধবী। এক সময় এক ক্লাসের বন্ধুও ছিলেন তাঁরা। বাসে করে তাঁরা যাচ্ছিলেন কর্নাটকের ম্যাঙ্গালুরু থেকে বেঙ্গালুরুর দিকে। রাত তখন সাড়ে ৯টা। আচমকাই জনা পঁচিশের একটি দল বাসটি থামিয়ে সেটিতে উঠে পড়ে। ওই যুবককে রীতিমতো মারধর করে তারা জানতে চায়, তিনি কেন ওই মহি‌লার পাশে বসেছেন? সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক যুবক কেন সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের এক মহিলার পাশে বসছেন? তাঁদের দু’জনকেই বাস থেকে টেনে নামানো হয়। গোটা বাসের সহযাত্রীরা সে সময়ে অবশ্য নিশ্চুপ থেকেছেন। বেধড়ক মারধরের সময়ে ওই যুবককে ছুরিকাঘাতও করা হয়। এই ঘটনা এ বছরের ১ এপ্রিলের। এই ঘটনায় পুলিশ যে চার জনকে গ্রেফতার করে তারা সকলেই হিন্দুত্ববাদী বজরং দলের সদস্য।

আর একটি ঘটনার উল্লেখ করা যাক। গুজরাট হাইকোর্টে এক দম্পতি আবেদন করেন, ভদোদরা (বরোদা) পুলিশের কাছে ‘দায়ের’ করা একটি এফআইআর বাতিল করা হোক। গত জুন মাসে আদালতে ওই মহিলা সুনির্দিষ্ট ভাবে জানান, স্বামীর বিরুদ্ধে করা তাঁর ওই এফআইআর ‘ভুলে’ ভরা এবং ‘ভুয়ো’। কারণ, স্বামীর বিরুদ্ধে অভিযোগে তিনি যা যা বলেছেন বলে পুলিশ দাবি করছে, সে সব অভিযোগ তিনি আদৌ করেননি। বিশেষত, বলপ্রয়োগে ধর্মান্তরকরণ করে বিয়ের যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা একেবারেই অসত্য। দাম্পত্য সংক্রান্ত এক ছোট বিষয় নিয়ে তিনি পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। যদিও গুজরাট সরকার ওই এফআইআর বাতিল করতে রাজি হয়নি। এর পরেই হাইকোর্টের বিচারপতি ইলেশ জে ভোরা-র বেঞ্চ এ ব্যাপারে রাজ্য সরকারকে নোটিস দিয়েছে।

গুজরাট হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি বিক্রম নাথ এবং বিচারপতি বীরেন বৈষ্ণব গত ১৯ অগস্ট তাঁদের অন্তর্বর্তী এক আদেশে বলেছেন, আন্ত-ধর্ম বিবাহের ক্ষেত্রে যেখানে কোনও রকম বলপ্রয়োগ হয়নি, প্রলোভন দেখানো হয়নি বা প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হয়নি, সেখানে ২০২১-এর গুজরাত মুক্ত ধর্ম (সংশোধনী) আইনের (লাভ জেহাদ আইন) ধারা প্রয়োগ করা যাবে না। এবং এই ধরনের বিয়েকে ধর্মান্তরকরণের জন্য বিয়ে বলা যাবে না।

আরও একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এলাহাবাদ হাইকোর্টের একটি রায়ের উল্লেখ করা যাক। এ বারে আদিত্যনাথ যোগীর রাজ্য উত্তরপ্রদেশ। সেখানে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এক তরুণীর সঙ্গে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের এক যুবকের প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই তরুণীর বয়স ১৯। যুবকের বয়স ২৪। তাঁরা বিয়ে করতে চান। কিন্তু দু’জনেরই বাবা-মা এবং বাড়ির লোকজন কিছুতেই এই সম্পর্কে রাজি হননি। ওই প্রণয়ী যুগল নিরাপত্তারও অভাব বোধ করছিলেন। তাঁরা এলাহাবাদ হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। সব পক্ষের আবেদন শুনে বিচারপতি দীপক বর্মা এবং বিচারপতি মনোজ কুমার গুপ্তকে নিয়ে গঠিত বেঞ্চ গত ১৬ সেপ্টেম্বর স্পষ্ট ভাবে জানিয়ে দেয়, দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তাঁদের পছন্দের যে কাউকে বিয়ে করতে পারেন, তা তিনি যে ধর্মেরই হোন না কেন। এই সিদ্ধান্তে কেউই, এমনকি তাঁদের বাবা-মায়েরাও হস্তক্ষেপ করতে পারেন না। আদালত ওই দু’জনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করারও নির্দেশ দিয়েছে।

‘লাভ জিহাদ’-এর নামে গত কয়েক বছর ধরেই ভারতের কিছু মৌলবাদী গোষ্ঠী ব্যক্তিস্বাধীনতায় বারে বারে হস্তক্ষেপ করছে বলে অভিযোগ উঠছে। নারীদের অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা বা মানবাধিকার সংগঠনগুলিও এ ব্যাপারে তাঁদের আপত্তির কথা জানিয়ে আসছে। বামপন্থী দলগুলি সমেত বিরোধী নানা রাজনৈতিক দলও ধর্মের নামে বিভেদ সৃষ্টির অভিযোগ তুলে আসছেন।

এ ব্যাপারে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের একটি মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। গত বছরের ৩১ অক্টোবর উত্তরপ্রদেশের জৌনপুরে একটি নির্বাচনী জনসভায় যোগী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘‘যারা নিজেদের পরিচয় গোপন রেখে আমাদের মেয়েদের সম্মান নিয়ে খেলছে তারা যদি নিজেদের শুধরে না নেয় তা হলে শীঘ্রই তাদের ‘রাম নাম সত্য হ্যায়’ যাত্রার ব্যবস্থা হবে।’’ সাধারণ ভাবে এই ‘রাম নাম সত্য হ্যায়’ মন্ত্রোচ্চারণ করা হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের কারও শেষযাত্রার সময়।

বিজেপি শাসিত বিভিন্ন রাজ্যে ‘লাভ জিহাদ’ রুখতে তৎপরতা তুঙ্গে উঠলেও খাস ভারতীয় সংসদে কিন্তু নরেন্দ্র মোদী সরকারের পক্ষ থেকে অন্য কথা বলা হয়েছিল। ২০২০-র ৪ ফেব্রুয়ারি সংসদে দাঁড়িয়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জি কিসান রেড্ডি বলেছিলেন, ‘লাভ জিহাদ’ শব্দটির সংজ্ঞা বর্তমান আইনে ব্যাখ্যা করা নেই। কোনও কেন্দ্রীয় এজেন্সি-ও ‘লাভ জিহাদ’ সংক্রান্ত কোনও ঘটনার ব্যাপারে রিপোর্ট করেনি।

অথচ, উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, কর্নাটক, হরিয়ানার মতো কয়েকটি রাজ্যে ‘লাভ জিহাদ’ ঠেকাতে অর্ডিন্যান্স বা আইন জারি হয়েছে। এই গোটা বিষয়টি নিয়েই প্রতিবাদে শামিল হয়েছে বিভিন্ন মহল।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মহিলা কমিশনের চেয়ারপার্সন লীনা গঙ্গোপাধ্যায় ভয়েস অব আমেরিকাকে বলেন, ‘‘এটা খুব সাম্প্রতিক বিষয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এক বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডাকে আইনের মোড়ক দেওয়া হচ্ছে। দুই ভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে প্রণয়ের সম্পর্কের ভিত্তিতে এবং পারস্পরিক সম্মতিতে বিয়ে হলে হবে। এটা আটকানোর পাশাপাশি নীতি পুলিশগিরি করাটা একটা মারাত্মক পদক্ষেপ।’’ লীনার অভিমত, ‘‘বিশেষ করে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে এটা ঘটছে। তা হলে এর পিছনে হয়তো কোনও হিংসা আছে, অথবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে, কিংবা এই পারস্পরিক বিদ্বেষ টিকিয়ে রাখার সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা আছে কারও স্বার্থসিদ্ধির জন্য।’’ তাঁর দাবি, একটি গণতান্ত্রিক দেশে স্বাধীন ভাবে বেঁচে থাকাটা সাংবিধানিক অধিকারের মধ্যে পড়ে।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে নারীদের অধিকার আন্দোলন নিয়ে কাজ করছেন‌ শাশ্বতী ঘোষ। ভয়েস অব আমেরিকা-কে তিনি বললেন, ‘‘যখন একজন আরেকজনকে পছন্দ করছে তখন সেই সম্পর্কে নাক গলানোর কারও অধিকার অবশ্যই নেই। সংশ্লিষ্ট দু’টি মানুষের সুরক্ষার ব্যবস্থা অবশ্যই করতে হবে সংশ্লিষ্ট মহলকে। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলিও পড়ে। বার বার তাঁদের আদালতের দ্বারস্থ হতে হয়। সেটা কেন হবে? কোর্ট বলা সত্ত্বেও পুলিশ এই নিরাপত্তা দেওয়ার ব্যাপারে গড়িমসি করে চলেছে।’’

পাশাপাশি, ভয়েস অব আমেরিকা-র কাছে মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্রের মন্তব্য: ‘‘লাভ জিহাদ’ নিয়ে দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখে ১৯৩৫ সালে হিটলারের আনা আইনের কথা মনে পড়ে যায়। ওই আইনের ফাঁদে পড়ে কোনও জার্মান নারী বা পুরুষ কোনও ইহুদি নারী বা পুরুষের সঙ্গে বিবাহ বা অন্য সম্পর্কে লিপ্ত হতে পারতেন না। এখানেও নানা রাজ্যে এখন এই চেষ্টাই শুরু হয়েছে। কোন ধর্মাবলম্বী কার সঙ্গে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হবেন বা সম্পর্ক তৈরি করবেন, তা ঠিক করে দেবে কোনও মৌলবাদী গোষ্ঠী বা দল, এটা কখনওই মেনে নেওয়া যায় না।’’

XS
SM
MD
LG