অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

উমাশঙ্কর মণ্ডল: সুন্দরবনে গাছ লাগান যে মানুষ


বারো বছর আগে যে সব চারা লাগানো হয়েছিল, এখন সেগুলো অনেক বড়। ঝড় আটকানোর ক্ষমতা হয়েছে। তার মাঝখানে ছেলে আর ভাইয়ের সঙ্গে ম্যানগ্রোভ ম্যান

পড়াশোনা করে স্কুলে পড়ানোর কাজ পেলেন। নিজের দেশগাঁয়ের মাটি ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেলেন, তবে তার মধ্যেই ভূগোলের জ্ঞান তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিয়েছে। তিনি বুঝেছেন, 'প্রকৃতিকে বাঁচালে মানুষ বাঁচবে।' কিন্তু সুন্দরবনে জীবন পাল্টায় না। একের পর এক ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়ে সব তছনছ করে দেয়। 

প্রকৃতির ক্ষতি করলে প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নেবে, এটা নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পেরেছিলেন পশ্চিমবঙ্গে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ উমাশঙ্কর মণ্ডল, এখন যাঁকে বনের বন্ধু, 'ম্যানগ্রোভ ম্যান' হিসেবে সবাই জানে। ভূগোলের শিক্ষক, মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরে একটি হাই স্কুলে পড়ান। কিন্তু মন পড়ে থাকে পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবনে একটা গ্রামে, যেখানে তাঁর জন্ম, কর্ম।

কলকাতা থেকে শ'দেড়েক কিলোমিটার দূরে সুন্দরবনের সাতজেলিয়া দ্বীপ। সেখানকার চরঘেরি গ্রামেই মানুষের বসতি শেষ। তার পর নদী, জঙ্গল, বাঘের ডেরা পেরোলে বাংলাদেশের সুন্দরবন শুরু। ওই চরঘেরিতেই উমাশঙ্করের ভিটেবাড়ি।

পড়াশোনা করে স্কুলে পড়ানোর কাজ পেলেন। নিজের দেশগাঁয়ের মাটি ছেড়ে অনেক দূরে চলে গেলেন, তবে তার মধ্যেই ভূগোলের জ্ঞান তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে দিয়েছে। তিনি বুঝেছেন, 'প্রকৃতিকে বাঁচালে মানুষ বাঁচবে।' কিন্তু সুন্দরবনে জীবন পাল্টায় না। একের পর এক ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়ে সব তছনছ করে দেয়।

এরই মধ্যে এল প্রবল ঘূর্ণিঝড় আয়লা। স্মরণকালের সবচেয়ে বিধ্বংসী সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়। সেটা ছিল ২০০৯ সাল।

উমাশঙ্কর মণ্ডলের কথায়, "তখন আমি গ্রামে। আয়লার প্রকোপে নদীর জলে ছ-সাত ফুট উঁচু ঢেউ উঠছে। হঠাৎ দেখি একজনের বাড়ির ওপর জলের ঢেউ আছড়ে পড়ল আর বাড়িটাকে জমি থেকে যেন তুলে নিয়ে চলে গেল। কিন্তু দেখলাম, আশপাশে যেখানে ম্যানগ্রোভ ছিল, ঝড় আটকেছে। সেদিন ঠিক করলাম ম্যানগ্রোভ গাছ লাগাতেই হবে।"

উমাশঙ্কর নিজের উদ্যোগে ম্যানগ্রোভের চারা রোপণ শুরু করলেন। সঙ্গে স্ত্রী প্রণতি। স্কুল থাকলে মুর্শিদাবাদে, আর ছুটি পেলেই সুন্দরবনে। এর মধ্যে কিছু লোককে বুঝিয়ে গাছের চারা পোঁতার কাজে লাগানো গেল। মহিলাই বেশি। কিন্তু অভাবী মানুষগুলোকে তাঁদের পরিশ্রমের বিনিময়ে কিছু দেয়ার জন্য উমাশঙ্কর সাহায্য চাইলেন তাঁর বন্ধুদের কাছে, সহকর্মীদের কাছে, সোশ্যাল মিডিয়ায়। অভূতপূর্ব সাড়াও পেলেন। এইভাবে ওঁর স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা দাঁড়িয়ে গেল।

সুন্দরবনে গ্রামের মহিলারা দলবেঁধে ম্যানগ্রোভের চারা লাগানোর কাজে লেগেছেন
সুন্দরবনে গ্রামের মহিলারা দলবেঁধে ম্যানগ্রোভের চারা লাগানোর কাজে লেগেছেন


উমাশঙ্কর জানালেন, ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত ১২ বছরে সাড়ে ছয় লক্ষ ম্যানগ্রোভ লাগিয়েছেন তাঁরা। প্রথমদিকের ম্যানগ্রোভগুলো এখন অনেকটাই বড় হয়েছে, ঝড়ের মহড়া নেওয়ার ক্ষমতা হয়েছে। কিন্তু আরো দরকার। ইদানিং গাছের চারা লাগাতে গ্রামের লোকজন আসছেন, বিশেষ করে মেয়েরা। তাঁদের পরিশ্রমের বিনিময়ে নগদ টাকা নয়, কাউকে শাড়ি, কাউকে মশারি ও অন্যান্য জামাকাপড়, কিংবা স্যানিটারি প্যাড দেওয়া হচ্ছে। ঝড়ের পরে খাবার দাবারও বিলি করা হচ্ছে। সবই ওই শুভানুধ্যায়ীদের দানের টাকা থেকে। এই সব কাজের সুফলও পাওয়া যাচ্ছে।

উমাশঙ্কর জানালেন, সাতজেলিয়া দ্বীপের যে সব জায়গায় গাছপালা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পশুপাখি, ছোট ছোট প্রাণীরা চোখের আড়ালে চলে গিয়েছিল , নতুন করে ম্যানগ্রোভের বন হওয়ার পর তারা আবার ফিরে এসেছে

উমাশঙ্কর মণ্ডল বললেন, আগামী ২৬শে জুলাই ইউনেস্কো ঘোষিত 'আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ দিবস'। ওই দিন জনা পঞ্চাশেক স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে ওঁরা সুন্দরবন যাবেন। সাতজেলিয়া আর গোসাবা দ্বীপে সেদিন দশ হাজার ম্যানগ্রোভের চারা লাগানোর ইচ্ছে। মূলত বাইন গাছ, কাদামাটিতে লাগাতে সুবিধা, বাড়েও তাড়াতাড়ি।

এখন তো আপনার পরিচয় 'ম্যানগ্রোভ ম্যান' হিসেবে! শুনে একটু লাজুক স্বরে উমাশঙ্কর মণ্ডল বললেন, "এই নামটাকে আমি আমার সেবাকাজের স্বীকৃতি হিসেবে দেখি। স্বেচ্ছাসেবকদের বুকে যেমন ব্যাজ আঁটা থাকে, এও তেমনি। কাজে সুবিধা হয়, ভালও লাগে।" খুশির হাসি হাসলেন 'ম্যানগ্রোভ ম্যান'।

XS
SM
MD
LG