অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

সুস্থ হয়েও বাড়ি ফিরতে পারেননি পাবনার মানসিক হাসপাতালের ১০ রোগী


মানসিক হাসপাতাল পাবনার মূল ভবন

চিকিৎসা শেষে পুরোপুরি সুস্থ হলেও বাড়ি ফিরতে পারেনি এমন ১০ জন বছরের পর বছর ধরে পাবনার মানসিক হাসপাতালে পড়ে আছেন। এদের কেউ ৩২ বছর কেউ ২৫ বছর কেউ আছেন এক যুগ ধরে। ভুল ঠিকানায় ভর্তি করার পর এসব রোগীদের আর খোঁজ রাখেনি পরিবার। ফলে কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকায় তারা হাসপাতালেই রয়ে গেছেন। পাবনার মানসিক হাতপাতালের কর্মকর্তা ফরিদ উদ্দিন এমন তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

এসব রোগী যখন ভর্তি হয়েছিলো তখন জাতীয় পরিচয়পত্র ছিলো না। ফলে রোগীর স্বজনদের দেয়া তথ্যের উপর ভরসা করেই রোগী ভর্তি করা হতো। যার কারণে কিছু রোগীর স্বজন প্রতারণা করে ভুল ঠিকানা দিয়েছে হাসপাতালকে। যদিও এখন হাসপাতাল কর্তৃপতক্ষ বলছে বর্তমানে রোগী এবং রোগীর স্বজনদের জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া কোন রোগী ভর্তি নেয়া হচ্ছে না।

এদিকে সুস্থ হয়ে ওঠা ওই ১০ জন স্বজনদের মুখ ফিরে নেয়ার বিষয়টি নিয়ে সারাক্ষণ হতাশায় ভুগছেন। আবারও মানসিক চাপের সম্মুখীন হয়েছেন তারা। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এলেও এদের বেশির ভাগই বাড়ি ফিরতে উন্মুখ হয়ে আছেন। অনেকটা বন্দি জীবন কাটাতে হচ্ছে এসব নারী-পুরুষদের। কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। এদের অনেকেই বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। শেষ জীবনে পরিবারের সদস্যদের ছাড়াই একাকিত্ব জীবন তাদের কাছে দুর্বিসহ হয়ে উঠছে।

এদের একজন নাজমা নিলুফার। মানসিক সমস্যার চিকিৎসার জন্য স্বজনরা ১৯৮৯ সালে এই হাসপাতালে ভর্তি করেন তাকে। প্রথম দিকে পরিবারের লোকজন খোঁজ খবর রাখলেও একটা সময় গিয়ে তারা আর কোন খবর রাখেনি। দীর্ঘদিন ডাক্তারদের নিয়মিত চিকিৎসায় এক সময় নিলুফার পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন। ভর্তির সময় তার বাড়ির ঠিকানা অনুযায়ী হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যোগযোগ করলে সেই ঠিকানা অনুযায়ী নিলুফার পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। পরিবার থেকে ভর্তির সময় ভুল ঠিকানা দিয়েছিলো।

ভর্তির সময় নিলুফারের বয়স ২৮ বছর ছিলো। এখন নিলুফারের বয়স চলছে ৫৮ বছর। পাবনা মানসিক হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ডের সুপারিশে নিলুফার অনেক আগেই ছাড়পত্রের জন্য উপযুক্ত ঘোষিত হয়েছেন। স্বজনরা কেউ না আসায় তিনি এখন হাসপাতালেই জীবনের শেষ সময়গুলো পার করছেন। হাসপাতালের রেজিস্ট্রেশন বই অনুযায়ী ভর্তির সময় নিলুফারের পিতার নাম দেয়া ছিলো এ.কে.লুৎফুল করিম। তার ভাই এর নাম পারভেজ করিম। ঢাকা মিরপুর ১১ নম্বর উল্লেখ ছিলো। নিলুফার বর্তমানে হাসপাতালের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে আছেন।

সাঈদ হোসেন। ১৯৯৬ সালের ২২ শে জুলাই পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে পাবনা মানসিক হাসপাতলে ভর্তি হয়েছিলেন। ভর্তির সময় তার বাবার নাম লেখা ছিলো আবুল হাসেম মিয়া। মায়ের নাম দেয়া ছিলো হেলেনা বেগম। ঠিকানা ছিলো পাবনার রাঘবপুর এলাকা। ভর্তির সময় সাঈদের বয়স ছিলো ৩৬ বছর। বর্তমানে তার বয়স ৫৯ বছর। দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে মেডিকেল বোর্ড তাকেও ছাড়পত্রের জন্য উপযুক্ত বলে সুপারিশ করেছে। কিন্তু পরিবারের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ওই ঠিকানায় তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি। পরিবারের পক্ষ থেকেও কেউ যোগাযোগ করেনি। ফলে তিনিও লম্বা সময় ধরেই হাসপাতালের ০৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হয়েই রয়েছেন।মাত্র ২৬ বছর বয়সে মানসিক রোগী হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন শাহানারা আক্তার। ১৯৯৯ সালের ৪ মে। বাবার নাম উল্লেখ ছিলো মৃত সিদ্দিকুর রহমান, মাতা জরিনা বেগম। ভাই মানিক মিয়া (দর্জী)। ঢাকার মানিক নগর এলাকা তার ঠিকানায় লেখা ছিলো। শাহানারার পরিবারও প্রথম দিকে খোঁজ নিতে আসতো। সময়ের ব্যবধানে তার পরিবারও খোঁজ নেয়া বন্ধ করে দেয়। নিয়মিত চিকিৎসা চলে শাহানারার। এক সময় ভালো হয়ে গেলেও পরিবারের কাছে আর ফিরে যেতে পারেননি তিনি। এখন তার বয়স ৪৬ বছর। হাসপাতালের ১৪ নম্বর ওয়ার্ড তার জন্য বরাদ্দ।

একই পরিণতি অনামিকা বুবি, শিপ্রা রাণী রায়, গোলজার বিবি, বদিউল আলম, নাইমা চৌধুরী, জাকিয়া সুলতানা এবং ডলির। এদের মধ্যে শিপ্রা রাণী রায় ছাড়া বাকি সবাই পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে উঠেছেন। মেডিকেল বোর্ড তাদেরকে সুস্থ বলে ছাড়পত্রের জন্য সুপারিশ করেছেন। শিপ্রা রাণী রায় এখনো সুস্থ হয়ে ওঠেননি। তার চিকিৎসা চলমান।

এরা কোথায় যাবে ঠিকানা জানে না। চিকিৎসায় সেরে ওঠার পর তারা যখন বুঝতে পারছে যে তাদের পরিবার তাদেরকে নিতে চাচ্ছে না, খোঁজ নিচ্ছে না, তখন তারা হতাশ হয়ে পড়েছে। তারা কোথায় যাবে ভেবে না পেয়ে এখানেই থেকে গেছে। মানসিক রোগীদের সাথেই জীবন কেটে যাচ্ছে সেরে ওঠা এসব মানুষদের। মানসিক কষ্ট বুকে চেপেই তারা চুপচাপ অন্যের স্বজনদের আসা যাওয়ার দৃশ্য দেখে। ঈদ যায়, পুজো যায় তারা পরিবারের সদস্যদের অপেক্ষায় থাকে। এই পরিবেশ থেকে মুক্তি চায় তারা।

পাবনা মানসিক হাসপাতালের আবাসিক সাইকিয়াট্রিস্ট ডাক্তার মাসুদ রানা ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, আজ থেকে বিশ ত্রিশ বছর আগে জাতীয় পরিচয়পত্র ছিলো না। ফলে রোগীর স্বজনদের দেয়া তথ্যের উপর ভিক্তি করেই রোগী ভর্তি করানো হতো। পরবর্তীতে দেখা গেছে কিছু রোগীর ঠিকানায় ভুল তথ্য দিয়েছে স্বজনরা। সুস্থ্য হয়ে ওঠা এসব রোগীদের ঠিকানা অনুযায়ী আমরা খোঁজ নিয়ে তাদের কোন স্বজনকে পাইনি। ফলে তারা এখন হাসপাতালেই রয়েছে। পরিবার থেকে খোঁজ নেয় না এমন রোগীদের বেশির ভাগই নারী। তিনি আরো বলেন, এমন পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য এখন রোগী এবং রোগীর স্বজনদের জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া ভর্তি নেয়া হচ্ছে না।

XS
SM
MD
LG