অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের সঙ্গে একমত শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, আইনজীবী ও অধিকারকর্মী


ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের সঙ্গে একমত শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, আইনজীবী ও অধিকারকর্মী

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে শুরু থেকেই বিতর্ক জারি রয়েছে। সাংবাদিক, লেখক, আইনজীবী, অধিকারকর্মী, শিক্ষাবিদ সহ সমাজের নানা স্তরের মানুষ এই আইনের অপপ্রয়োগ নিয়ে সোচ্চার। রাজনীতিকরাও মনে করেন, এই আইনের মাধ্যমে কণ্ঠ রোধ করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ডিজিটাল জগতে বাংলাদেশের সবাইকে সুরক্ষিত রাখতেই এই আইন। সাংবাদিকরা বলছেন, এই আইন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করার পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। সাম্প্রতিককালে এই আইনের অপপ্রয়োগ বেড়েছে। গ্রেপ্তার হচ্ছেন সাংবাদিক, অধিকারকর্মী থেকে শুরু করে শিক্ষাবিদ পর্যন্ত। এই যখন অবস্থা, তখন যুক্তরাষ্ট্রের তরফে এই আইনের অপপ্রয়োগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এই উদ্বেগের সঙ্গে এক মত পোষণ করেছেন দেশের শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, আইনজীবী ও অধিকারকর্মীরা। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এই আইনটির অপপ্রয়োগ বন্ধে সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছেন। অনেকে আবার বিতর্কিত ধারা বাতিল, আইনটি পুরোপুরি বাতিলের পক্ষেও মত দিয়েছেন। এ নিয়ে আমাদের ঢাকা সংবাদদাতা মতিউর রহমান চৌধুরী কথা বলেছেন- শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, সাংবাদিক, অধিকারকর্মীদের সঙ্গে।

ড. আসিফ নজরুল

শিক্ষক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অপরাধীর যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা খুবই অস্পষ্ট। এতে যে কোনও শাসক গোষ্ঠী ইচ্ছেমতো এই আইনের অপপ্রয়োগ করতে পারে।​

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বড় ধরণের তিনটি সমস্যা রয়েছে। দুই ধরণের অপরাধের কথা বলা হচ্ছে। একটি হচ্ছে কম্পিউটার সংক্রান্ত অপরাধ অন্যটি বাক স্বাধীনতা সংক্রান্ত অপরাধ। কম্পিউটার সংক্রান্ত অপরাধ থাকতে পারে কিন্তু বাক স্বাধীনতা সংক্রান্ত অপরাধ নিয়ে মারাত্মক কিছু সমস্যা রয়েছে।

এক. অপরাধীর যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তা খুবই অস্পষ্ট। এতে যে কোনও শাসক গোষ্ঠী ইচ্ছেমতো এই আইনের অপপ্রয়োগ করতে পারে। যেমন, স্বাধীনতার চেতনা, দেশের ইমেজ। দেশের ইমেজ কি? ধরুণ, বাংলাদেশ ব্যাংক লুট হয়ে গেল, একজন সাংবাদিক তা নিয়ে রিপোর্ট লিখলো। সরকার বলতে পারে তিনি দেশের ইমেজ নষ্ট করছেন। সংজ্ঞার ক্ষেত্রেই এতে বড় সমস্যা দেখা যাচ্ছে।

দুই. এই আইনে পুলিশ এবং কিছু সরকারি এজেন্সিকে অসীম ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। বিনা ওয়ারেন্টে পুলিশ গ্রেপ্তার আপনাকে করতে পারবে, বাসা সার্চ করতে পারবে, কম্পিউটার জব্দ করতে পারবে। পুলিশকে অসীম ক্ষমতা দেয়া হয়েছে অথচ তাদের কোন জবাবদিহিতা নেই।

তিন. এই আইনে ডিস প্রপোরসনেট শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্যানাল কোডে মানহানির মামলা হলে দু বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে কিন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে পাঁচ বছর কারাদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। একই অপরাধের জন্য দু রকম শাস্তির বিধান, এটা তো হতে পারে না।

চার. এই আইনের অপপ্রয়োগ রোধে বিচার বিভাগও কোনও ভূমিকা রাখছে না। কোনও এক কারণে বিচার বিভাগ হয়তো মনে করছে আইনটি সরকারের জন্য খুবই দরকারি। ফলে বিচারবিভাগ মনে করছে এই আইনের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনও ব্যবস্থা নিলে সরকার হয়তো পছন্দ করবে না। বিচারবিভাগের স্বাধীনতা না থাকাতেই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হচ্ছে।

আইনটি এমনভাবে করা হয়েছে যেখানে দোষি সাব্যস্থ হওয়ার পরে শাস্তির চেয়ে দোষি সাব্যস্থ হওয়ার আগে শাস্তিটা অনেক বেশি নিশ্চিত, অনেক বেশি ডিস প্রপোরসনেট, অনেক বেশি অযৌক্তিক। এই আইনটি করা হয়েছে মানুষকে ভয় দেখানোর জন্য, মানুষকে নিপীড়ন করার জন্য।

নূরুল কবীর

সম্পাদক, নিউএজ

একটা বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সরকার বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে, স্বাধীন জনমতকে ভয় পায়।

যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ আমরা লক্ষ্য করেছি। আমরা যারা বাংলাদেশে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা করি, তারা এ বিষয়ে অনেক বেশি উদ্বিগ্ন। একটা বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সরকার বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে, স্বাধীন জনমতকে ভয় পায়। আর এই ভয় থেকেই বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাকে, স্বাধীন জনমতকে দমন করার জন্য নানা অগণতান্ত্রিক আইন, বিধান ও কর্মকাণ্ডের আশ্রয় নেয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার তার প্রমাণ। এই অবস্থা থেকে মুক্তির পথ হচ্ছে- একদিকে সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ, অন্যদিকে গণতন্ত্রের জন্য রাজনৈতিক সংগ্রামের বিকাশ।

ড. শাহদীন মালিক

সিনিয়র আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

তবে আজ হোক কাল হোক এই আইনের অপপ্রয়োগের খেসারত সরকারকে দিতেই হবে। ​

এই আইনের শুরু থেকেই যে সমালোচনাটা হচ্ছিল সেটা হচ্ছে এই আইনের অপব্যবহার এবং অপপ্রয়োগের মাধ্যমে বাক স্বাধীনতাকে আরও সীমিত করা হবে। গত তিন বছরে সেই প্রক্রিয়াটাই চলমান আছে। সরকারের অনেকগুলি ব্যর্থতা নিয়ে যাতে আলাপ আলোচনা না হতে পারে সেজন্যই যেনতেন ছুতায় বিভিন্ন পেশার লোকজনকে গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি করা হচ্ছে। বিচার বিভাগের অবস্থানও ক্রমশঃ এই আইনের পক্ষেই যাচ্ছে বলে অনেকক্ষেত্রে ধারণা করা যায়। তবে আজ হোক কাল হোক এই আইনের অপপ্রয়োগের খেসারত সরকারকে দিতেই হবে।

ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন

ইতিহাসবিদ ও বঙ্গবন্ধু চেয়ার, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস

বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজন আছে জননিরাপত্তার জন্য, সরকারের জন্য নয়। ​

বাংলাদেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োজন আছে জননিরাপত্তার জন্য, সরকারের জন্য নয়। কারণ, সরকার জনগণের জন্য কাজ করে। ইতিমধ্যেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বেশকিছু ধারা নিয়ে দ্বিমত প্রকাশ করা হয়েছে। সরকারকে সেগুলি বিবেচনায় নেয়া উচিৎ ছিল। এই আইনকে বর্ম হিসাবে ব্যবহার করে সরকার অনেক অপকর্ম আড়াল করার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে এই আইন ব্যবহারের চেয়ে অপব্যবহার বেড়েছে যা উদ্বেগজনক। এই আইনে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ করা হয়েছে। মনে রাখতে হবে, বঙ্গবন্ধুর সতীর্থ ইত্তেফাক সাংবাদিক যস্বশী সিরাজউদ্দিন হোসেন এ দেশে সর্বপ্রথম অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সূচনা করেছিলেন। জনমতকে বিবেচনায় নিয়ে জনপ্রতিনিধিত্বশীল সরকারের এই আইন নিয়ে নতুন করে ভেবে দেখার চেষ্টা করা উচিৎ বলে মনে করি।

ইকবাল সোবহান চৌধুরী

সিনিয়র সাংবাদিক ও সম্পাদক, অবজারভার

আইন প্রয়োগের নামে যে নির্যাতনের দৃষ্টান্ত তা বন্ধ করতে হবে। ​

ডিজিটাল আইন করা হয়েছে ডিজিটাল অপরাধ দমনের জন্য। সে আইনে সাংবাদিক বলে কোনো কথা নেই কিন্তু এর অপব্যবহার করা হচ্ছে অনেক সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে। আমি মনে করি, সাংবাদিকরাও আইনের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু আইন প্রয়োগের নামে যে নির্যাতনের দৃষ্টান্ত তা বন্ধ করতে হবে। ডিজিটাল আইনের অপব্যবহারটা বন্ধ করতে হবে। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল আইনে মামলা হতে পারে- তবে গ্রেপ্তার করা যাবে না, সমন দিতে হবে। কোনো সাংবাদিক যদি মিথ্যা তথ্য দেয় অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যাবে। কিন্তু আজকে ডিজিটাল আইন সবচেয়ে বেশি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ হওয়ায় আইনটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। আইনটি অবশ্যই সংশোধন হতে হবে।

গোলাম মোর্তোজা

সিনিয়র সাংবাদিক

আমাদের জোড়ালো দাবি হওয়া উচিৎ স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্তরায় এই আইনটির সংস্কার নয় বাতিল করা।​

শুরু থেকে এখন পর্যন্ত আমরা সবসময় বলে আসছি ডিজিটাল নিরাপত্তা সাংবাদিকদের নিরাপত্তা তো নিশ্চিত করেই না বরং এই আইন সাংবাদিক, সংবাদমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তথা মুক্তভাবে যারা চিন্তা করেন, কথা বলেন তাদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসাবে কাজ করে। একেবারে শুরুতে যা বলেছিলাম তার প্রতিফলনই আমরা দেখছি এই আইনটির ক্ষেত্রে। আমাদের জোড়ালো দাবি হওয়া উচিৎ স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্তরায় এই আইনটির সংস্কার নয় বাতিল করা।

জ্যোতির্ময় বড়ুয়া

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

অপব্যবহার নয় এই আইনের চরিত্রটিই এমন যে, এটি ব্যবহার করলে এর ফল তাই দাঁড়াবে। ​

সাংবাদিকরা বেশকিছু ধারা নিয়ে কথা বলেন, পুরো আইনটিই যেখানে বিতর্কিত। আইনের ব্যবহার সঠিকভাবে করলে এর চরিত্র এমনই দাঁড়াবে। একজন অধিকার কর্মী হিসাবে আমরা শুরু থেকেই এই আইনের বিরোধিতা করে এসেছি এবং আইনটি বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছি। আইনের খসড়া যখন প্রথম হয় তখন থেকেই আমরা আইনটির সমালোচনা করছি। আইনটির ব্যবহার যেমনটি হওয়ার কথা তা হচ্ছে না। অনেকেই বলে থাকেন আইনটির ‘অপব্যবহার’ হচ্ছে। এ শব্দটি ব্যবহারে আমার অপত্তি আছে, অপব্যবহার নয় এই আইনের চরিত্রটিই এমন যে, এটি ব্যবহার করলে এর ফল তাই দাঁড়বে। ফলে, শুরু থেকে আইনটি বাতিলের দাবি কতোটা যৌক্তিক তা প্রতি সপ্তাহে সাংবাদিক এবং অন্যান্য পেশার মানুষকে আইনের মাধ্যমে নিপীড়ন এবং কণ্ঠরোধ করার যে প্রক্রিয়া যে চালু তাতে আমাদের বিরোধিতা আরও স্পষ্ট হয়।

XS
SM
MD
LG