অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

মমতার ‘মিশন ফিফটি’, চব্বিশে ‘দিদি সরকারের’ লক্ষ্যে কৌশলে এগোচ্ছে তৃণমূল


ফাইল ফটোঃ দিল্লীতে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে "গণতন্ত্র বাঁচাও" আন্দোলনে অংশ নিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যাণার্জী। ফেব্রুয়ারী ১৩, ২০১৯।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী পদে তৃতীয় বার শপথ গ্রহণের পর সদ্য নয়াদিল্লি সফরে গিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই সফরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মমতা বারবারই বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী পদের বাসনা তাঁর নেই। তবে হ্যাঁ, কেন্দ্রে ‘স্বৈরাচারী নরেন্দ্র মোদী’ সরকারের পতন ঘটাতে তিনি চান তামাম অবিজেপি শক্তি জোটবদ্ধ হোক। সেই সেতুবন্ধের কাজে এখন থেকে ঘনঘন দিল্লি যাবেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী পদ নিয়ে তাঁর উচ্চাকাঙ্খার কথা মমতা অস্বীকার করেছেন ঠিকই, কিন্তু তৃণমূলের শীর্ষ সূত্রে খবর, ২০২৪ সালে লোকসভা ভোটের আগে ‘মিশন ফিফটি’ নিয়ে এগোচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী। ‘মিশন ফিফটি’ কী? তা হল, লোকসভা ভোটে অন্তত ৫০ টি আসন তৃণমূলের দখলে রাখা। পশ্চিমবঙ্গে লোকসভার ৪২ টি আসন রয়েছে। তার মধ্যে যথাসম্ভব আসন জিতে নেওয়া। সেই সঙ্গে আসাম, ত্রিপুরা, উত্তর-পূর্বের অন্যান্য রাজ্য এবং ঝাড়খণ্ডে একটা দুটো করে আসন জেতার চেষ্টা করা। একা ৫০টি আসন জিততে না পারলেও ছোট ছোট আঞ্চলিক দল বা নির্দলদের নিয়ে ওই লক্ষ্যে পৌঁছে যাওয়া।

কেন? কারণ, বিজেপিকে পরাস্ত করে কেন্দ্রে অবিজেপি জোট সরকার গঠনের পরিস্থিতি তৈরি হলে ৫০ জন সাংসদ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী পদের জোরালো দাবিদার হয়ে উঠতে পারেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

মিশন ফিফটি-র কথা স্পষ্ট করে তৃণমূল এখন ঘোষণা করেনি। তবে দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কলকাতায় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, “বাংলার বাইরেও তৃণমূল এবার সাংগঠনিক শক্তি বাড়াবে। শুধু একটা দুটো আসন জেতা নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাবধারায় সেখানে আগামী দিনে সরকার গঠনই দলের লক্ষ্য।”

রাজ্যসভায় তৃণমূলের উপ দলনেতা সুখেন্দু শেখর রায় এ প্রসঙ্গে প্রতিবেদককে বলেন, “দেশের সামনে এখন দুটো মডেল রয়েছে। মোদী-শাহর মডেল। যা মিথ্যা ও প্রবঞ্চনার উপর দাঁড়িয়ে। আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মডেল। যা হল, প্রান্তিক, অনগ্রসর মানুষকে তাঁদের অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষা পাইয়ে দেওয়ার মডেল”। সুখেন্দু শেখরের কথায়, “আগামী লোকসভা ভোটে নরেন্দ্র মোদী সরকারের পতন অনিবার্য। একে তো কোভিড মোকাবিলায় পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে বর্তমান সরকার। সেই সঙ্গে সরকারের শঠতা প্রতিদিনই বেআব্রু হয়ে পড়ছে। বিরোধীদের ফোনে আড়ি পাতা, সরকারি তদন্ত এজেন্সি লেলিয়ে দিয়ে ভয় দেখানোর চেষ্টা—এ সবই স্বৈরাচারী সরকারের লক্ষণ।” তাঁর মতে,“দেশের অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি মোকাবিলারও ক্ষমতা নেই বর্তমান সরকারের। বরং আশঙ্কা আগামী দিনে কর্মসংস্থানের অভাব, মানুষের ন্যূনতম রোজগার আরও বিপন্ন হতে পারে।”

যোগেন্দ্র যাদবের মতো রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও মনে করেন, মহামারী পরিস্থিতি মোদী সরকারের জন্য শুভ লক্ষণ নয়। সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে একটি অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, “অতীতে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে বারবার দেখা গিয়েছে, মহামারী, বন্যা, খরা পরিস্থিতির পর সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা তৈরি হয়েছে।"

বস্তুত সেই সুযোগটাই নেওয়ার জন্য অবিজেপি শক্তিগুলিকে জোটবদ্ধ হতে বলছেন মমতা। দিল্লি সফরে গিয়ে সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী সহ প্রবীণ কংগ্রেস নেতাদের সঙ্গে তিনি দেখা করেছেন। শরদ পাওয়ার, উদ্ধব ঠাকরে, এম কে স্ট্যালিনের মতো বিজেপি বিরোধী নেতাদের সঙ্গেও প্রতিনিয়ত যোগাযোগে রয়েছেন তিনি। আর তার সমান্তরালে তাঁর দল তৃণমূল মমতাকে নিয়ে এখন থেকেই সমাজ মাধ্যমে প্রচারে নেমে পড়েছেন। দলের শীর্ষ সারির মন্ত্রী, সাংসদ, বিধায়করা টুইটারে পোস্ট করতে শুরু করে দিয়েছেন, ‘এ বার দিদির সরকার’, ‘সাচ্চে দিন আসছে’।

এ ব্যাপারে তৃণমূল সাংগঠনিক সম্পাদক কুণাল ঘোষ প্রতিবেদককে বলেন, “কেন্দ্রে অবিজেপি জোট সরকার গঠন হলে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিকল্প নেই। কারণ, তাঁর মতো রাজনৈতিক উচ্চতা ও অভিজ্ঞতা বিরোধী শিবিরের কারও নেই। তিনি সাত বারের সাংসদ। নব্বইয়ের দশকে নরসিংহ রাও জমানা থেকে কেন্দ্রে মন্ত্রী। পরবর্তীকালে অটলবিহারী বাজপেয়ী ও মনমোহন সিংহ জমানায় রেলমন্ত্রী হয়েছেন। এ ছাড়া তিন বারের মুখ্যমন্ত্রী। এই রাজনৈতিক রেখচিত্র সমকালীন সর্বভারতীয় রাজনীতিতে কারও নেই।”

প্রশ্ন হল, বাস্তবে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে কংগ্রেস কি এই দাবি মেনে নেবে? নয়াদিল্লির রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অধিকাংশই মনে করেন, কেন্দ্রে অবিজেপি দলগুলির জোট সরকার গড়তে গেলে কংগ্রেসকে ন্যূনতম দেড়শ আসনে জিততে হবে। সেই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য স্বাভাবিক দাবি থাকতে পারে কংগ্রেসের। কিন্তু এও ঠিক মমতার রাজনৈতিক উচ্চতা ও অভিজ্ঞতা রাহুল গান্ধী বা সনিয়া ব্যতিরেকে কংগ্রেসের যে কোনও নেতার তুলনায় বেশি। ফলে তখন যদি অন্যান্য আঞ্চলিক নেতৃত্বের সমর্থন তৃণমূল জোটাতে পারে তা হলে অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠতে পারেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে লোকসভায় কংগ্রেস দলনেতা অধীর চৌধুরী ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, “কংগ্রেস সহ সমস্ত অবিজেপি শক্তির সামনে এখন প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত মোদী সরকারের পতন নিশ্চিত করা। এই সরকার কতটা মিথ্যাবাদী, কতটা ব্যর্থ, কতটা স্বৈরাচারী তা দেশের মানুষের সামনে তুলে ধরা। কে প্রধানমন্ত্রী হবেন তা এখনই বিচার্য নয়।” তাঁর কথায়, “ভুলে গেলে চলবে না গান্ধী পরিবার প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য কখনও লালায়িত ছিল না। সোনিয়া গান্ধীও হেলায় প্রধানমন্ত্রী পদের দাবি ছেড়েছিলেন। বিজেপিকে হারাতে পারলে স্বাভাবিক নিয়মে নেতা উঠে আসবেন।”

XS
SM
MD
LG