অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

টিসিবির ট্রাক থেকে পণ্য কেনার জন্য মানুষের দীর্ঘ লাইন


টিসিবি ট্রাকের সামনে নারী-পুরুষের দীর্ঘ লাইন। (ছবি- রুবেল রশীদ)

বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধিতে ভোগান্তি বেড়েছে নিম্ন -মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির। চরম সংকটে পড়েছে বস্তিবাসী ও নিম্ন আয়ের মানুষেরা। এমন পরিস্থিতিতে ভোক্তাদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য বিক্রি করছে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)।

ঢাকাসহ সারাদেশে ৪৫০টি পয়েন্টে এখন ট্রাকে করে টিসিবির পণ্য বিক্রি হচ্ছে৷ এর মধ্যে ঢাকা শহরসহ ঢাকা বিভাগে ১০১টি পয়েন্টে পণ্য বিক্রি শুরু হয়েছে৷ শুক্রবার বাদে সপ্তাহে প্রতিদিন প্রতিটি ট্রাকে দিনে ৬০০ লিটার সয়াবিন তেল, ৪০০ কেজি ডাল, ৫০০ কেজি চিনি এবং ৫০০ কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে৷ একজন ক্রেতা সয়াবিন তেল দুই লিটার, চিনি ও মসুর ডাল দুই কেজি এবং পেঁয়াজ সর্বনিম্ন দুই কেজি থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ কেজি কিনতে পারেন৷

টিসিবির ট্রাকে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকা, মসুর ডাল প্রতি কেজি ৬৫ টাকা, চিনি ৫৫ টাকা, পেঁয়াজ ৩০ টাকায়। উল্টোদিকে, খোলা বাজারে তেলের মূল্য ১৬৮ টাকা, মসুর ডাল ১০০ টাকা, চিনি ৮০ টাকা এবং পেঁয়াজ ৩৮ টাকা।

টিসিবি ট্রাকের সামনে নারী-পুরুষের দীর্ঘ লাইন। কথা বলে জানা গেল, তাদের কেউ কেউ দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। মিরপুরের আনসারক্যাম্প এলাকায় টিসিবির ট্রাকে পণ্য কিনতে আসা

ষাটোর্ধ্ব জব্বার মিয়া বললেন, "আগেরদিন দুই ঘণ্টা লাইনে খাড়ায়া থেকেও কিছু নিতে পারি নাই। খালি হাতে ফিরতে হইছে। অনেক লম্বা সিরিয়াল ছিল। তাই আইজকা তাড়াতাড়ি আইসা সামনে খাড়াইছি।"

জব্বার মিয়া একটি গার্মেন্টস কারখানায় সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে কাজ করেন। করোনার সময়ে গত বছর চাকরি হারিয়েছিলেন। পরে বেশ কয়েকমাস বেকার থাকার পর নতুন চাকরি পেয়েছেন। যা বেতন পান তা দিয়ে চারজনের সংসার চালানো মুশকিল। তাই টিসিবির ট্রাকে পণ্য কিনতে এসেছেন। এখানে বাজারের দামের থেকে কম দামে পাওয়া যায়। সপ্তাহে দুইদিন তিনি এখানে লাইনে দাঁড়ান।

এখানেই কথা হয় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা খাদিজা বেগমের সঙ্গে। কাছে গিয়ে কথা বলতে চাইলে প্রথমে রাজি হলেন না। পরে জানালেন, বাড়ি চাঁদপুরে। ঢাকায় মিরপুরে চিড়িয়াখানা এলাকার রাইনখোলা বস্তিতে থাকেন। মানুষের বাসাবাড়িতে ছুটা বুয়া হিসেবে কাজ করেন। নিজের দুইবেলা খাবার মানুষের বাসাতেই জোগাড় হয়। কিন্তু পরিবারের বাকি সবার জন্য রান্না করতে বাসায়। স্বামী রিকশা চালান। দৈনিক আয় গড়ে মোটামুটি ৫০০-৬০০ টাকা। তা থেকে রিকশার মহাজনকে দিয়ে ও গ্যারেজ ভাড়া দিয়ে যা থাকে তাতে সংসার চালাতে কষ্ট হয়। এখন বাজারে তেল, পেঁয়াজের দাম বাড়ায় তিনি লাইনে এসে দাঁড়িয়েছেন।

মিরপুরে টিসিবির পণ্য বিক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মানুষের চাহিদার তুলনায় পণ্য কম সরবরাহ করা হচ্ছে। তাছাড়া পণ্যের ট্রাক দুপুরের আগে আসে না। ট্রাক আসার আগেই অসংখ্য নারী-পুরুষ সকাল থেকেই লম্বা সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষা করেন। এই পণ্য বিক্রেতা জানান, তাদের প্রতিদিন মাত্র ২০০ জনের পণ্য দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু ট্রাকের সামনে ক্রেতা থাকে আরও অনেক বেশি। তাই যারা সিরিয়ালে আগে থাকেন তারা পণ্য কিনতে পারেন। আবার অনেক সময়ে লাইনে আগে দাঁড়ানো নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ ঘটে।

ঢাকার আজিমপুরের বাসিন্দা সুনির্মল ফার্মগেটে একটি কাজে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে ট্রাক সেল দেখতে পান পান্থকুঞ্জের সামনে পাবলিক টয়লেটের সামনে। তিনি তার প্রয়োজনীয় কিছু পণ্য কেনেন এখান থেকে।

সুনির্মল বলেন, ট্রাক সেলে যেসব পণ্য পাওয়া যায়, যেমন: চিনি, মসুর ডাল, সয়াবিন তেল সেগুলো কিনেছেন তিনি। "এখানে কম দামে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়া যায়। তাই সুযোগ বুঝে এখান থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো কিনে নিলাম। আমার কিছু টাকা সাশ্রয় হয়েছে।"

পান্থকুঞ্জের সামনেই কথা হয় আকলিমা খাতুনের সঙ্গে। আকলিমা থাকেন কাঁঠালবাগান। এখানে ছোট সন্তান কোলে নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। তার স্বামী কারওয়ান বাজারে এক দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করেন। বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় তিনি এখানে লাইনে এসে দাঁড়িয়েছেন। এর আগে কখনো আসেননি। এবারই প্রথম এখানে এসেছেন। তেল ও মসুর ডাল কিনবেন জানালেন। তবে প্রথমবার আসায় লাইনে দাঁড়াতে বেশ সংকোচ করছেন বলেও জানালেন প্রায় ত্রিশ বছর বয়সী এই নারী।

টিসিবি সূত্রে জানা গেছে আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি ট্রাকে করে পণ্য বিক্রির কর্মসূচি শেষ হবে। তবে মার্চ থেকে আবারো শুরু হবে৷ এছাড়া রমজান মাসেও চলবে বিশেষ কর্মসূচী।

XS
SM
MD
LG