অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাংলা বিভাগ অবহেলিত

বাংলাদেশের মাতৃভাষা বাংলা হলেও, দেশের বেশিরভাগ প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় উচ্চ শিক্ষার সুযোগ নাই। বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ পরিচালিত হয় ১৯৯২ সালের ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন’ দ্বারা। দেশে বর্তমানে ১০৭টি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মাঝে কাগজে কলমে ১৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের কথা বলা হলেও বাস্তবে ৭/৮টির বেশির খোঁজ পাওয়া যায়নি।

গত তিন দশকে গড়ে ওঠা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসায় শিক্ষা, কম্পিউটার, আইসিটি, আইন, প্রকৌশল ও মেডিকেল শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। ঠিক বিপরীতে বাংলায় শিক্ষার তেমন কোনো সুযোগই নেই। এর জন্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আগ্রহকে দায়ী করছে অনেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।


তবে শিক্ষাবিদ ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উদ্যোক্তা হিসাবে যারা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করেন, তারা বিভাগগুলো খোলার ক্ষেত্রে দেখেছেন, কোন বিভাগগুলোর প্রতি বাজারের আগ্রহ আছে।

সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জারিন তাসনিম
সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জারিন তাসনিম

জারিন তাসনিম ঢাকার সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে স্নাতকোত্তর পড়ছেন। গাইবান্ধা থেকে এইচএসসি সমমানের পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় এসেছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য। এসএসসি এবং এইচএসসি-তে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করা জারিন উচ্চমাধ্যমিকে আশানুরূপ ফল না পাওয়ায় উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হয়েছিলেন বাংলায়। ইচ্ছে ছিল উচ্চশিক্ষায় ভালো ফল করার। স্নাতক পর্যায়ের পরীক্ষার ফলাফলে আশানুরূপ ফল পাওয়ায় খুবই খুশি এই শিক্ষার্থী।

বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে কিনা জানতে চাইলে জারিন বলেন, "আমাকে কোনো বিরূপ পরিস্থিতিতে পড়তে হয়নি। আমাদের ক্যাম্পাসে সব শিক্ষার্থীই একই অধিকার ও সুযোগ ভোগ করছে।"

সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. এশান আমিন
সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মো. এশান আমিন

এই বিষয়েই কথা হয় একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী মো. এশান আমিন এর সঙ্গে। এশান পটুয়াখালী থেকে ঢাকায় এসেছিলেন উচ্চশিক্ষার জন্য। এইচএসসির পরে তার দুইবছরের শিক্ষা বিরতি ছিল। পরে ভর্তি হয়েছেন সাউথ্ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে।


এশান বলেন, "আমি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারিনি। পরে গ্যাপ দিয়ে বাংলায় এখানে পড়াশোনা শুরু করেছি।"


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, "অনেকে মনে করেন যে, বাংলায় পড়াশোনা করে অপেক্ষাকৃত কম মেধাবী শিক্ষার্থীরা। বাংলায় পড়ালেখা করে চাকরি পাওয়া যায় না। তাই বাংলায় শিক্ষার্থী কম। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পড়াশোনা যেখানে ব্যয় সাপেক্ষ, তাই সেখানে তুলনামূলক ‘কম কর্মমুখী বিষয়’ বাংলায় শিক্ষার্থীর সখ্যা কম।"


তবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে এখন কর্মমুখী শিক্ষার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয় বলে মনে করছেন বিসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় শিক্ষাদানের সঙ্গে জড়িতরা।

সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারপারসন ড. হামিদা বেগম
সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারপারসন ড. হামিদা বেগম

সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের চেয়ারপারসন ড. হামিদা বেগম বলেন, "সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিভাগ। ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি-চেতনা ও মাতৃভাষার বিকাশ ও মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় এর উজ্জ্বল অভিযাত্রা শুরু হয় ২০০৯ থেকে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষার্থীবৃন্দ বি.এ. (অনার্স) ও এম. এ. (১ বছর) পর্যায়ে উন্নত ও মানসম্পন্ন পাঠ নিচ্ছে। এ বিভাগে শুধু একাডেমিক কাজই নয় সৃজনশীল ও মননশীল জার্নাল প্রকাশ, শিক্ষার্থীদের লেখা সম্বলিত বিভিন্ন প্রকাশনা ও জাতীয় দিবসের বর্ণিল অনুষ্ঠানের আয়োজনের মধ্য দিয়ে বিরাজ করছে এক তারুণ্যদীপ্ত স্ফূর্তিময় পরিবেশ। বাংলা বিভাগে দেয়ালিকা প্রকাশ, বার্ষিক বনভোজন, খেলাধুলা, বিতর্ক প্রতিযোগিতার নিয়মিত আয়োজন রয়েছে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ ’৫২-র ভাষা আন্দোলন এবং ’৭১-র মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারাবাহিকতায় উন্নত ও সময়োপযোগী সিলেবাস প্রণয়ন করেছে। বাংলা বিভাগ এখন আইটি বিশ্বেও হয়ে উঠছে স্বপ্নমুখর। সিলেবাসে ইংরেজি, কম্পিউটার. দর্শন ও সামাজিক বিজ্ঞানের মতো সমন্বয়ী কোর্স যুক্ত হয়েছে- যার ফলে তাদের প্রতিযোগিতামূলক বাজারে প্রবেশযোগ্যতা অধিকতর হয়েছে।"

তবে বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে অন্যান্য বিভাগের শিক্ষকের তুলনায় সুযোগ-সুবিধা কম বলেও খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে। শারমিনুর নাহার সাউথইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগেই শিক্ষকতা করেন। তবে তিনি জানালেন, অন্য বিভাগের শিক্ষকের তুলনায় বাংলা বিভাগের শিক্ষকদের বেতন কম।

আক্ষেপ নিয়ে এই শিক্ষিকা বলেন, "কম্পিউটার সায়েন্স, ইইই, ইকোনোমিক্স, ম্যাথম্যাটিকস, ইংরেজির শিক্ষকের তুলনায় বাংলার শিক্ষকদের বেতন কম। এটা যোগ্যতার জন্য নয়, বাংলার শিক্ষক তাই কম।"



নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজধানী ঢাকার আরেক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বলেন , "বাংলায় ভর্তি হতে হতে গিয়েই দেখেছিলাম... অন্য চোখে দেখা হয়। অন্য সহপাঠীরা বন্ধুরা প্রায়ই বলে, বাবার টাকা আছে তাই বেসরকারিতে অনেক টাকা দিয়ে বাংলায় অনার্স করতে এসেছি।"

ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক
ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক

এই বিষয়ে কথা হয় ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের সঙ্গে। তিনি বলেন , "বাংলা ভাষাকে সর্বস্তরে চালু করতে না পারার ফলেই এই বৈষম্য হয়েছে। এর জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা দায়ী। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে জাতি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে পেয়েছে, সেখানে ভাষার এই অবমাননা পরাজয়ের শামিল।" বাংলা ভাষার ক্ষমতায়নে এখনও গুরুত্ব দেওয়া হয় না বলেও মনে করেন প্রবীণ এই রবীন্দ্র গবেষক ও প্রাবন্ধিক।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, "বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কোনোকিছুতে বাধ্য করতে পারে না। তারা কোন কোন বিষয়ে বিভাগ খুলতে চায় সেই বিষয়ে তাদের আবেদন মঞ্জুর করতে পারে অথবা বাতিল করতে পারে। কিন্তু বাধ্য করে কোনো বিভাগ চালু করতে পারে না। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত যে সকল বিষয়ে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ থাকে ...তারা অধিক শিক্ষার্থী ভর্তি করতে পারবে এমন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে থাকে। তবে আমরা দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাবলিক ও প্রাইভেট উভয় ক্ষেত্রেই মাতৃভাষা বাংলার একটি কোর্স ‘বাংলা ভাষা ও সাহিত্য’ বই দিয়েছি। তারা সেটিকে পড়াচ্ছেন। কিন্তু উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থা অনার্স কিংবা মাস্টার্সের বিষয় হিসেবে বাংলা চালুর ব্যাপারে আমরা বাধ্য করতে পারি না।"

তবে শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কেবল কর্মমুখী শিক্ষার দিকে জোর দেওয়াই নয় এর পেছনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণও অনুসন্ধান করতে হবে। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেই কেউ চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে পারে না। তাকেও একটি পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়, আর সেইসব পরীক্ষায় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যে খুব এগিয়ে থাকে এমনটাও দেখা যায় না। তাই বাংলায় পড়ে চাকরি মিলবে না, এই কথা পুরোপুরি সমর্থনযোগ্য নয় বলেও মনে করেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইমেরিটাস সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, "আমরা যে স্বপ্নটা দেখেছিলাম, সেটি কেবলই রাষ্ট্রভাষার স্বপ্ন ছিল না। অর্থাৎ, রাষ্ট্রভাষা ছাড়াও শিক্ষায়, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে, আদালতের ভাষা, দাপ্তরিকসহ সর্বস্তরে মাতৃভাষা বাংলার দাবি তোলা হয়েছিল। এখন দেখা যাচ্ছে তা হয়নি। তখন আমরা মনে করেছিলাম শিক্ষার যে তিনটি ধারা তখন ছিল, সেটি বন্ধ হবে এবং একটি মাধ্যমে বাংলায় তা চালু হবে। পাকিস্তান আমলে যে তিনটি ধারা ছিল বাংলা, ইংরেজি এবং মাদ্রাসা; আমরা ভেবেছিলাম স্বাধীন বাংলাদেশে তা থাকবে না। একটি ধারাই থাকবে এবং সেটি হবে বাংলা। কিন্তু, তা হলো না। সেটি হলো না, কারণ বাংলাদেশে শ্রেণী বিভাজনটি আরও গভীর হয়েছে। এতে করে তিনটি ধারা বাংলা, ইংরেজি ও মাদ্রাসার বিভাজনটি আরও বড় হলো। এরই প্রতিফলন আমরা দেখি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে। বিশেষকরে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষায় ইংরেজি হয়ে পড়ে আগ্রহের বিষয়। আর বাংলায় ধীরে ধীরে তা কমেছে। ইংরেজি একটি আন্তর্জাতিক ভাষা, অভিভাবকেরা মনে করেন তাদের সন্তান ইংরেজিতে পড়লে তাদের কর্মজীবন উন্নত হবে ও নিরাপদ হবে, সামাজিক মর্যাদা বাড়বে। এখানে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বাংলার পিছিয়ে থাকাটা হচ্ছে সামাজিক বাস্তবতা।"

শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী
শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী

দেশের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষায় বাংলা অবহেলিত হচ্ছে কিনা এমন প্রশ্ন ছিল শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরীর কাছে। তিনি বললেন, ‘প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে অনেকের অভিযোগ বাণিজ্যিক চিন্তা থেকে গড়ে উঠেছে এই প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে মনে রাখতে হবে, শিক্ষার যে মানবিক ও গুণগত একটি দিক আছে সেটি নিশ্চিত করাই মূল কাজ। মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাভাষা ও সাহিত্য বিষয়ে কোর্স রাখার দিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উচ্চশিক্ষার বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকেও ভূমিকা রাখতে হবে।"

XS
SM
MD
LG