অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

শহীদ দিবসে শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে ছেয়ে গেছে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার


কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ফুল দিয়ে সাজাচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। (ছবি- মুনির-উজ-জামান/ এএফপি)

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ২১ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই সবার সব পথ এসে মিশে গিয়েছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। কালো ব্যানার নিয়ে, কালো ব্যাজ পড়ে ধীর কদমে এগিয়ে গেছেন সবাই শহীদ মিনারের বেদির দিকে। হাতে ছিল এই বসন্তে ফোটা গোলাপ, গাঁদা, ডালিয়া, মল্লিকার গুচ্ছে ও মালা। আর কণ্ঠে হৃদয় মথিত করা সেই গান—“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/আমি কি ভুলিতে পারি...।”

২১ ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাংলাদেশের মানুষ ৭০ বছর আগে মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ করা বীর সন্তানদের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর কৃতজ্ঞতায় দিবসটি পালন করে। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে “প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে বহুভাষার জ্ঞানার্জন: সংকট এবং সম্ভাবনা।”

ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ১৯৪৭ সালে দ্বি–জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হলে পাকিস্তান রাষ্ট্রটির সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানিদের প্রথম আঘাত আসে মাতৃভাষার ওপরে। গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪৮ সালে ঢাকায় উর্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রাভাষা হিসেবে ঘোষণা দেন। সঙ্গে সঙ্গে তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ে ছাত্রসমাজ। প্রতিবাদে সোচ্চার হয় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিরা। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য শুরু হয় দীর্ঘ আন্দোলন। এরই এক পর্যায়ে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করলে মিছিলে গুলি চালানো হয়। সালাম, বরকত, রফিক, শফিক, জব্বারসহ নাম না জানা আরও অনেক বীর সন্তানের রক্তে রঞ্জিত হয় ঢাকার রাজপথ। সারা পূর্ব পাকিস্তানে গড়ে ওঠে দুর্বার আন্দোলন। অবশেষে ১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সরকার সংবিধানে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। বাংলা ভাষাকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, সেখান থেকেই বাঙালির জাতীয় চেতনা উন্মেষ ঘটে। সেই আন্দোলন ধাপে ধাপে এগিয়ে যায় স্বাধিকার ও স্বাধীনতার সংগ্রামের দিকে। অবশেষে ১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি অর্জন করে তার চির কাঙ্খিত স্বাধীনতা। বাঙালির জীবনে এ কারণেই একুশের গুরুত্ব অপরিসীম।

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর অমর একুশে ফেব্রুয়ারিকে জাতিসংঘের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংগঠন ইউনেসকো আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এরপর ২০০১ সাল থেকে সারা বিশ্বেই মাতৃভাষার জন্য বাঙালির আত্মদানের গৌরময় দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে ।

মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ তার বাণীতে বলেন, “কালের আবর্তে পৃথিবীতে অনেক ভাষাই আজ বিপন্ন। একটা ভাষার বিলুপ্তি মানে একটা সংষ্কৃতির বিলোপ, জাতিসত্তার বিলোপ, সভ্যতার অপমৃত্যু। তাই মাতৃভাষা ও নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশসহ সব জাতিগোষ্ঠীর ভাষঅ ও সংস্কৃতি রক্ষায় বিশ্বাবাসীকে সোচ্চার হতে হবে।”

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে বলেন, “বাঙলির মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলনের গুরুত্ব অপরিসীম। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই একটি অসম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের ভিত রচিত হয়েছিল।”

বরাবরের মতোই এবারেও অমর একুশে উপলক্ষে রাজধানী ঢাকায় কেন্দ্রীয় শাহীদ মিনার চত্বর ও সামনের সড়কে আঁকা হয় ঐতিহ্যবাহী আলপনা। পাশের দেয়ালগুলো চারুকলার শিক্ষার্থীরা ভরিয়ে তোলেন স্মরণীয় বাণী আর শহীদ দিবসকে বিষয় করে আঁকা চিত্রমালায়।

রঙে রেখায় সাজিয়ে তোলা শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে পুষ্পস্তবক অর্পণ শুরু হয় একুশের প্রথম প্রহর রবিবার রাত ১২টা এক মিনিটে। করোনা মহামারির কারণে এবার রাষ্ট্র্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শহীদ মিনারে আসতে পারেননি। রাষ্ট্রপতির পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এস এম সালাহউদ্দিন ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে তার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল নকিব আহমদ চৌধুরী পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এ সময় অমর একুশের গান “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো...” বাজানো হয়। তারা কিছু সময় নীরবে অপেক্ষা করেন।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সর্বসাধারণের জন্য শহীদ মিনারের প্রবেশ পথ খুলে দেওয়া হয়। করোনা অতিমারির কারণে শ্রদ্ধা নিবেদনের ক্ষেত্রে কড়াকড়িভাবে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা হয়। আগেই জানানো হয়েছিল সবাইকে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে এক সঙ্গে দুজন এবং সাংগঠনিকভাবে পাঁচজন একত্রে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারবেন। প্রথম দিকে সে নিয়ম মানা সম্ভব হলেও পরে তা মানা সম্ভব হয়নি। এক পর্যায়ে ভিড় ভেড়ে যায়।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী, শ্রমজীবী সংগঠন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, বিভিন্ন সংস্থা, সরকারি–বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ শহীদ মিনারে আসেন ফুল নিয়ে। শ্রদ্ধা জানাতে আসা মানুষের লাইন একপর্যায়ে পলাশী ছাড়িয়ে নিউ মার্কেট পর্যন্ত পৌঁছে যায়। শহীদ মিনার থেকে অনেকই গেছেন আজিমপুর কবরস্থানে ভাষা শহীদের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে প্রার্থনা করতে।

প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পক্ষে সভাপতিমন্ডলির সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরীর নেতৃত্বে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) পক্ষে মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং পরে আজিমপুর কবরস্থানে ভাষাশহীদের আত্মার শান্তি কামনা করে দোয়া করা হয়।

জাতীয় পার্টির (জাপা) পক্ষে চেয়ারম্যান গোলাম মোহামদ কাদেরের নেতৃত্বে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। দিনের প্রথম ভাগ পর্যন্ত চলে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব।

এ ছাড়া বাংলাদেশের সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয় এবং কালো পতাকা উত্তোলন করা হয়।

দিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা

দিবসটি উপলক্ষে এদিন বিভিন্ন সংগঠন আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করছে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও ছায়ানটসহ অন্য সংগঠন দিনব্যাপী বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে।

বিকেল ৪টায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সেখানে বিশেষ বক্তব্য দেবেন অধ্যাপক মেসবাহ কামাল। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের শিল্পীরা আবৃত্তি পরিবেশন করবেন এবং অনুষ্ঠানটিতে গারো কালচারাল একাডেমির গানের পরিবেশনা এবং আদিবাসী নৃত্যদল কালারস অফ হিলের নৃত্য আবৃত্তিও পরিবেশিত হবে।

সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শিল্পকলা একাডেমি জাতীয় নাট্যশালায় “বিশ্বের সব দেশে মাতৃভাষা রক্ষা করবে বাংলাদেশ” শীর্ষক সেমিনার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের অংশগ্রহণ থাকবে।

সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট রাত ৮টায় ফেসবুক ও ইউটিউবে একটি বিশেষ অনুষ্ঠান “ফাগুন মাসের আগুন” সম্প্রচার করবে। যেখানে গান, আবৃত্তি ও একটি বিশেষ তথ্যচিত্র উপস্থাপনা থাকবে।

XS
SM
MD
LG