অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

কক্সবাজারে মাতৃভাষার স্বীকৃতি চেয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানববন্ধন


রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানববন্ধন

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বাংলাদেশের কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে নিজেদের মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন রোহিঙ্গা শিক্ষক ও ছাত্রছাত্রীরা। নিজেদের মাতৃভাষার (রোয়াইঙ্গা ভাষা) স্বীকৃতি দিতে তারা আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতা চেয়েছেন।

বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ২১ ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীরা সীমিত আকারে এ বছর প্রথমবারের মতো দিবসটি পালন করেন।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর কয়েক মাসে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে সে দেশের সেনাবাহিনীর নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়ে রোহিঙ্গারা দেশত্যাগ করে বাংলাদেশে আশ্রয় নেন। তারও আগে কয়েক দফায় পালিয়ে এসেছিলেন আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা। বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩৪টি রোহিঙ্গা শিবিরে নিবন্ধিত শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ।

গত তিন দশকে রাখাইন রাজ্যে মাতৃভাষার স্বীকৃতি চেয়ে কোনো আন্দোলনের সুযোগ পায়নি রোহিঙ্গারা। বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়ার সাড়ে চার বছরে মাথায় এই প্রথম রোহিঙ্গারা শিবিরে মানববন্ধন করে নিজেদের মাতৃভাষার স্বীকৃতি চাইলেন।

সোমবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১১টায় টেকনাফের লেদা ক্যাম্পের একটি মাদ্রাসা তাওহিদিয়া কাশেমুল উলুম মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপন উপলক্ষে মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করে “রোহিঙ্গা ন্যাশনাল এডুকেশন বোর্ড” নামে রোহিঙ্গাদের একটি সংগঠন। এখানে রোহিঙ্গা শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মানবন্ধন করে ১৯৫২ সালে বাংলাভাষার জন্য বাংলাদেশে যারা শহীদ হয়েছেন তাদের স্মরণ করার পাশাপাশি নিজেদের মাতৃভাষা “রোয়াইঙ্গ” ভাষার স্বীকৃতি চান তারা।

মানবন্ধনে মাতৃভাষার গুরুত্ব তুলে ধরে বক্তব্য দেন, ওই মাদ্রাসার শিক্ষক হাফেজ সুলতান মাহমুদ, মাওলানা সৈয়দ নুর এবং রোহিঙ্গা ভাষা চর্চা নিয়ে গবেষণারত শিক্ষক মোহাম্মদ খালেদ প্রমুখ।

গবেষক মোহাম্মদ খালেদ ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, “প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষা আছে। শরণার্থীদেরও নিজস্ব ‘রোয়াইঙ্গা’ ভাষার বর্ণমালা আছে। কিন্তু মিয়ানমারে পড়াশোনার পরিবেশ না থাকায় ভাষাটি বিলুপ্তির পথে। তবে বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরে এসে রোহিঙ্গা শিশুরা মাতৃভাষা চর্চার সুযোগ পাচ্ছে।”

আশ্রয়শিবিরে রোহিঙ্গা শিশু-কিশোরদের পড়াশোনা ও শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রোহিঙ্গা শিক্ষকেরা বলেন, "আমরা মর্যাদার সঙ্গে মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাই। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন দ্রুত কার্যকর করতে মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ জরুরি। এ জন্য বাংলাদেশসহ আন্তর্জাতিক মহলের হস্তক্ষেপ দরকার।"

তারা আরও বলেন, তিন দশকের বেশি সময় ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের স্কুল–কলেজে রোহিঙ্গা ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে। “রোয়াইঙ্গা” ভাষায় কিছু বই-পুস্তক থাকলেও সেগুলো গোপনে পড়াতে হতো তাদের সন্তানদের।"

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের তত্বাবধানকারী সরকারি একটি দপ্তরের অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা নয়ন ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, “একুশে ফেব্রুয়ারি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশের আশ্রয়শিবিরেও রোহিঙ্গারা সীমিত আকারে এবং ঘরোয়া পরিবেশে দিবসটি পালন করেছে। মানববন্ধন করে তারাও নিজেদের মাতৃভাষার (রোয়াইঙ্গা) স্বীকৃতি চেয়েছে, এটা তাদের অধিকার।”

কক্সবাজার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সহকারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহীদুল আজম ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, “উখিয়া-টেকনাফের আশ্রয়শিবিরগুলোতে রোহিঙ্গা শিশুদের পড়ানোর শিক্ষাকেন্দ্র আছে প্রায় ৩ হাজার। তাতে পড়ছে ৮০ হাজারের মতো রোহিঙ্গা শিশু।”

দেশি–বিদেশি কিছু সেবা ও এনজিও সংস্থা কেন্দ্রগুলো পরিচালনা করছে। কেন্দ্রগুলো ইংরেজি, গণিত, ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ‘রোয়াইঙ্গা’ ভাষাও পড়ানো হচ্ছে। কিন্তু বাংলা পড়ানো হয় না রোহিঙ্গা শিশুদের।

উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের একটি শিক্ষাকেন্দ্রে পড়ছে শতাধিক রোহিঙ্গা শিশু। সেখানে শিক্ষক মৌলভি আকতার কামাল শিশুদের পড়াচ্ছেন “রোয়াইঙ্গ” ভাষার বর্ণমালা।

ওই শিক্ষক বললেন, "রোহিঙ্গাদেরও পৃথক ভাষা আছে, নাম “রোয়াইঙ্গা ভাষা’। এই ভাষা গঠিত হয়েছে ২৮টি বর্ণ ও ১০টি স্বরচিহ্ন দিয়ে।"

উখিয়া কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা আনোয়ার হোসেন (৫৩) বলেন, "মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা শিশুদের স্কুল–কলেজে পড়াশোনার সুযোগ নেই। এ কারণে শিশুরা অযত্ন-অবহেলায় বড় হচ্ছিল। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নাগরিকদের চাকরি, ব্যবসা বাণিজ্য, স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকার দেওয়া হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশে এসে তার উল্টোচিত্র ভোগ করছেন রোহিঙ্গারা। এখানে (বাংলাদেশে) রোহিঙ্গা শিশুরা ইংরেজি, বার্মিজ ভাষা, ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি “রোয়াইঙ্গা” ভাষা রপ্ত করার সুযোগ পাচ্ছে। এই শিশুরা মিয়ানারে ফিরে গেলে তখন শিক্ষার কী হাল হবে-এ নিয়ে উদ্বিগ্ন সবাই।"

XS
SM
MD
LG