অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

রাশিয়া থেকে গম ও গ্যাস আমদানি করবে পাকিস্তান—পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাতের পর জানালেন ইমরান খান


করাচির একটি বাজারে এক ব্যক্তি টেলিভিশনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের ভাষণ শুনছেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান সোমবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) ঘোষণা করেছেন যে, তার দেশ রাশিয়া থেকে প্রায় দুই মিলিয়ন টন গম আমদানি করবে এবং প্রাকৃতিক গ্যাসও কিনবে। গত সপ্তাহে মস্কোতে সরকারি সফরের সময় দুই পক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির অধীনে এই আমদানি করা হবে বলে জানান তিনি।

রাশিয়ান বাহিনী ইউক্রেনে আক্রমণ করার কয়েক ঘন্টা পর এবং যখন সমগ্র বিশ্ব রাশিয়াকে বিচ্ছিন্ন করার পরিকল্পনা করছিল, তখন খান দুই দিনের সফরে বৃহস্পতিবার ক্রেমলিনে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দেখা করেন।

সোমবার, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী তার সফরের পক্ষে সাফাই এবং সমালোচনার জবাব দিয়ে জাতির উদ্দেশে এক টেলিভিশন ভাষণে বলেন, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক স্বার্থের জন্য তাকে এটি করতে হয়েছে।

“আমরা রাশিয়া গিয়েছি, কারণ আমাদের সেখান থেকে ২ মিলিয়ন টন গম আমদানি করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমরা তাদের সঙ্গে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছি। কারণ পাকিস্তানের নিজস্ব গ্যাসের মজুদ কমে যাচ্ছে”, খান বলেন।

“ইনশাআল্লাহ (ঈশ্বরের ইচ্ছা), সময়ই বলে দেবে যে আমাদের মধ্যে দারুণ একটা আলোচনা হয়েছে”, পাকিস্তানি নেতা পুতিনের সঙ্গে তার তিন ঘন্টার বৈঠকের কথা উল্লেখ করে খান বলেন। তিনি এ ব্যাপারে বিস্তারিত আর কিছু বলেননি।

সমালোচকেরা অবশ্য ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর রাশিয়ার ওপর আরোপিত কঠোর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে মস্কো-ইসলামাবাদ অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।

বৃহস্পতিবার ক্রেমলিনে পুতিন ক্যামেরার সামনে খানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান এবং করমর্দন করেন। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা জানান, দুই নেতা পাশাপাশি বসে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বিস্তৃত আলোচনা করেন।

“প্রধানমন্ত্রী রাশিয়া ও ইওক্রেনের মধ্যে সাম্প্রতিক পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন যে, পাকিস্তান আশা করেছিল যে কূটনীতির মাধ্যমে একটি সামরিক সংঘাত এড়ানো যাবে”, খানের বরাত দিয়ে বৈঠক-পরবর্তী এক বিবৃতিতে বলা হয়।

পাকিস্তানি কর্মকর্তারা এবং খান নিজে বরাবরই বলে আসছেন যে, মস্কো সফরের বিষয়টি ইউক্রেন সংকট শুরু হওয়ার অনেক আগেই পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং এর উদ্দেশ্য ছিল কেবলমাত্র জ্বালানি সহযোগিতাসহ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক পর্যালোচনা করা।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের শীতল সম্পর্ক, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটিকে তার বৃহত্তর প্রতিবেশী চীন ও রাশিয়ার কাছাকাছি ঠেলে দিয়েছে।

প্রতিনিধিদল পাকিস্তানে ফেরার পর খানের সফরসঙ্গী পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কুরেশি বলেন, মস্কো সফরের আগে ওয়াশিংটন ইসলামাবাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।

“[আমাদের কর্মকর্তারা] তাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন এবং আমরা তাদেরকে আমাদের সফরের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছি এবং সেই মতো এগিয়েছি”, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া সফরের বিরোধিতা করছে কি না জানতে চাইলে কুরেশি সাংবাদিকদের বলেন। “সফরের পরে আমি নিশ্চিত যে আমরা সঠিক কাজটি করেছি”।

খানের রাশিয়া সফরের প্রাক্কালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন মুখপাত্রকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ওয়াশিংটন বিশ্বাস করে যে, “প্রতিটি দায়িত্বশীল” দেশের মতো পাকিস্তানও পুতিনের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে আপত্তি জানাবে।

তবে পাকিস্তানি নেতারা ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে কোনো সমালোচনা করা থেকে বিরত থেকেছেন, এবং আলোচনার মাধ্যমে সংকটের নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।

ইসলামাবাদ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউক্রেনের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। এ ছাড়া পাকিস্তান ইউক্রেনীয় গমের অন্যতম প্রধান আমদানিকারক।

ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের নিয়ত অস্বস্তিকর সম্পর্কের আরও অবনতি হয়েছে সম্প্রতি আফগানিস্তানে ইসলামপন্থী তালিবানের প্রতি পাকিস্তানের সমর্থনের কারণে। এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব বিস্তারের ফলে উদ্ভূত উদ্বেগের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ় হয়েছে।

ইসলামাবাদের প্রধান শত্রু ভারতের সঙ্গে রাশিয়ার স্নায়ুযুদ্ধের সময় ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল, যেহেতু মস্কো নয়াদিল্লির অন্যতম প্রধান অস্ত্র রপ্তানিকারক ছিল।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মস্কো ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনস্থাপন করেছে। দুই দেশ নিয়মিত যৌথ সামরিক মহড়া করে এবং পাকিস্তানকে ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে জ্বালানি সহযোগিতা বৃদ্ধিতে করতেও কাজ করছে রাশিয়া।

খান সোমবার তার ভাষণে আফগানিস্তানে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে যোগ দেওয়ার পাকিস্তানের সিদ্ধান্তকে তার পূর্বসূরিদের “ভুল পররাষ্ট্র নীতির” ফলাফল বলে পুনর্ব্যক্ত করেন।

“আমি প্রথম দিন থেকেই বলে আসছি আমাদের [যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে] অংশ নেওয়া উচিত ছিল না”, তিনি বলেন, ইসলামপন্থীদের প্রতিশোধমূলক হামলায় পাকিস্তানের ৮০ হাজার লোক নিহত এবং বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে।

খান রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্বের কারণে বিশ্বব্যাপী তেলের বাজারে মুল্যবৃদ্ধি সামাল দিতে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম কমানোরও ঘোষণা দিয়েছেন।

আগামী জুনের বাজেট পর্যন্ত নতুন দাম স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। সমালোচকেরা বলেছেন যে, ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির কারণে বিরোধীদের বিক্ষোভের ফলে এই পদক্ষেপটি নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। কর্মকর্তারা করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল থেকে ছয় বিলিয়ন ডলারের প্রনোদনা প্যাকেজের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সরকারের গৃহীত কঠোর অর্থনৈতিক সংস্কারকে এই মূল্যস্ফীতির জন্য দায়ী করেন।

XS
SM
MD
LG