অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

রোহিঙ্গা নিপীড়নকে 'গণহত্যা' হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষণাঃ প্রতিক্রিয়া


মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীরা। ২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর চালানো সহিংসতাকে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ বলে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্প্রতি আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন এ ঘোষণা দিয়েছেন। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে দেশটির সেনাবাহিনীর নৃশংস দমন-পীড়ন ও হত্যাযজ্ঞের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম সে দেশ থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলায় কয়েকটি শরনার্থী শিবিরে এসব রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়েছেন। বাংলাদেশের পক্ষে এই বাড়তি জনগোষ্ঠির চাপ সামলাতে ইতিমধ্যে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার বারবার রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে দাবি জানিয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও মানবাধিবার লঙ্ঘনের স্বীকৃতি দেওয়ায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এর আগে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালতে মামলা করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ২০১৯ সালে মামলাটির প্রাথমিক শুনানি শুরু হয়েছিল। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের নভেম্বরে মামলাটি করেছিল আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া। অবশ্য তারও অগে জাতিসংঘের একটি ‘ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন’ ২০১৮ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযানে ‘গণহত্যামূলক কাজ’ অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। সেই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এই নৃশংসতাকে ‘জাতিগত নির্মূল’ (Ethnic Cleansing) হিসেবে অভিহিত করেছিল।

সম্প্রতি মিয়ানমার কর্তৃক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিপীড়নকে গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের স্বীকৃতি দেওয়াকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারের ভূমিকার যে স্বীকৃতি দিয়েছে তাকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি। আমরা আশা করি, মিয়ানমার তাদের (রোহিঙ্গা) জনগণকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রত্যাবাসন করবে। এটা ভালো খবর যে, কানাডার পর যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তি রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতাকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই স্বীকৃতি আমাদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করেছে। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নৃশংসতাকে শুরু থেকেই 'গণহত্যা' হিসেবে অভিহিত করে আসছে বাংলাদেশ। মার্কিন এই ঘোষণা মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে গাম্বিয়ার দায়ের করা মামলায় সহায়ক হতে পারে। বর্তমান মার্কিন প্রশাসন বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে বলেও আমরা আশা করতে চাই।"

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন বাংলাদেশের একজন নৃবিজ্ঞানী। রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে তিনি লেখালেখি করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক মনে করেন যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের হত্যার বিষয়টিকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে যে স্বীকৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ এর বেশকিছু সুফল পাবে।

দুটি সুবিধা বাংলাদেশ পাবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, "প্রথমত, আমেরিকা যেহেতু একটি শক্তিশালী দেশ তার এই স্বীকৃতির ফলে মিয়ানমারের বিতাড়িত ও হত্যার শিকার রোহিঙ্গারা স্বীকৃতি পেল। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ২০১৯ সালে গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যে মামলাটি করে, এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তা একটি সাপোর্টিভ শক্তি হিসেবে কাজ করবে। এই ঘটনার মধ্যদিয়ে মিয়ানমার যদি একটি জেনোসাইড সংগঠিত হওয়া রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের অপরাপর রাষ্ট্রের কাছে বিবেচিত হবে। এর ফলে মিয়ানমার ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সমূহের মধ্যে পারস্পরিক যে সহায়তা কর্মসূচী রয়েছে তা থেকে বঞ্চিত হবে। এমনটা যখন ঘটতে শুরু করবে মিয়ানমার তখন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন করার দিকে মনোযোগ দেবে। এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া যদি শুরু করা যায় তবে এর সুফল সবার আগে পাবে বাংলাদেশ।"

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, "আমেরিকার এই পদক্ষেপকে ইতিবাচক ভাবেই দেখতে চাই। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীদের হত্যার যে অভিযোগ এতদিন বিভিন্ন মহল থেকে শোনা যাচ্ছিল, আমেরিকা এখন সেটি ঘোষণা করলো। অর্থাৎ, তারা মিয়ানমারের শাসকদের বিরুদ্ধে জেনোসাইডের অভিযোগের স্বীকৃতি দিল। এখন এই ঘোষণার ফলে আমেরিকার পক্ষ থেকে আরও কী কী পদক্ষেপ আসে তা আমাদের দেখতে হবে। আমেরিকা বা তার মিত্র দেশগুলো বিশেষ করে, ইউরোপীয় দেশসমূহ মিয়ানমারের প্রতি নতুন করে কোনো অবরোধ, নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে কিনা তার দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।"

তবে এই বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত করে বলা যাবে না উল্লেখ করে অধ্যাপক ইমতিয়াজ বলেন, "তবে এটা সত্যি যে, আমেরিকার এই স্বীকৃতির ফলে বাংলাদেশের পক্ষে রোহিঙ্গাদের অধিকার আদায়ে, তাদের নিজ দেশে ফিরে যেতে আন্তর্জাতিক মহলকে আরও সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হবে।"

নূর খান লিটন দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কাজ করছেন। আমেরিকার স্বীকৃতি নিয়ে ভয়েস অফ আমেরিকার সঙ্গে কথা হয় তার। তিনি বলেন, "আমেরিকা মিয়ানমারের রোহিঙ্গাদের গণহত্যার স্বীকৃতি দিল, এর আগে কানাডা দিয়েছিল। এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যে শুরু থেকেই মিয়ানমারে গণহত্যার কথা বলে আসছিল তার একটি স্বীকৃতি পাওয়া গেল। এই ঘটনায় আরও একটি বিষয় পরিষ্কার হল যে- বাংলাদেশ গণহত্যা ও দমন-পীড়নের মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠিকে আশ্রয় দিয়ে কোনো ভুল কাজ করেনি। বরং একটি মানবিক কাজ করেছে বলেই এই ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হবে। এখন গাম্বিয়া গণহত্যার বিচার চেয়ে যে মামলা করেছে বাংলাদেশ এর পক্ষে শক্ত অবস্থান নিতে পারবে। মিয়ানমারে সে দেশের সেনাবাহিনী দিয়ে রোহিঙ্গাদের হত্যা করেছে, বাংলাদেশ তার পক্ষে সাক্ষ্য দান করতে পারার শক্ত অবলম্বন হবে এই স্বীকৃতি।"

তবে এ ঘটনায় সুফল ভোগ করতে হলে বাংলাদেশকে কূটনৈতিক দিক থেকে আরও সক্রিয় হতে হবে বলেও মতামত দিয়েছেন তিনি। নূর খান বলেন, "এখন দক্ষতার সাথে কূটনৈতিক পদক্ষেপ নিয়ে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করতে মিয়ানমারকে বাধ্য করার দিকে এগিয়ে যেতে হবে।"

XS
SM
MD
LG