অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

বিপন্ন প্রজাতির বিরল প্রাণী চট্টগ্রামের বোস্তামী কচ্ছপ


বোস্তামী কচ্ছপ

বাংলাদেশের চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামীর মাজারের পুকুরে রয়েছে বিরল প্রজাতির কয়েকটি কাছিম। এই প্রজাতির কচ্ছপ এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী। স্থানীয় বাসিন্দারা এ গুলোকে বোস্তামীর কাছিম নামে চেনে। বৈজ্ঞানিকভাবে এদের কালো নরম খোলের কচ্ছপ হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। এদের বৈজ্ঞানিক নাম, অ্যাসপিডারেটিস নিগ্রিকান।

বায়েজিদ বোস্তামী মাজারের মোতোয়াল্লি অ্যাডভোকেট খোরশেদ আলম বলেন,“এই প্রজাতির কাছিম এখন শুধু এখানেই টিকে আছে। কয়েকশ' বছর ধরে এগুলো মাজারের পুকুরে বসবাস করছে। অতীতে এদের পরিচর্যায় তেমন নজর দেওয়া না হলে, কয়েক বছর ধরে যথাযথভাবে দেখাশোনা করা হচ্ছে।”

আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ, ২০০২ সালে বোস্তামীর কচ্ছপ-কে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি হিসাবে তালিকাভুক্ত করে। ১৯৯৮ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ কনজারভেশন অফ নেচার-এর (আইইউসিএন) অন্যতম বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় বোস্তামী কাছিমের নাম উঠে আসে।

প্রাণিবিজ্ঞানী অ্যান্ডারসন ১৮৭৫ সালে সর্বপ্রথম ভারতের জাদুঘরে রক্ষিত দুটি নমুনা থেকে বোস্তামীর কচ্ছপ প্রজাতির সন্ধান পান। রক্ষিত নমুনা দুটি ছিল চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামীর মাজার পুকুর থেকে সংগৃহীত।

পরিবেশবাদী সংগঠন ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্সের ফ্যাসিলিটি-এর ম্যানেজার ফাহিম জাহান বলেন, “বোস্তামী কাছিম পৃথিবীতে একটি চরম সংকটাপন্ন প্রাণী। তাই তাদের বংশ বৃদ্ধিতে আমরা গত তিন বছর ধরে মাজার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছি। চলতি বছর ৭৫২টি ডিম থেকে ২০৫টি বাচ্চা হয়েছে। পুকুরের গজার মাছ এদের বাচ্চা খেয়ে ফেলে বলে, আলাদা প্রজননকেন্দ্রে এগুলোকে লালনপালন করা হচ্ছে। বড় হলে পুকুরে ছাড়া হবে।”

এই কচ্ছপের ওপর ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেল ডকুমেন্টারি তৈরি করে ২০০৭ সালে। মার্চের প্রথম থেকে মে পর্যন্ত বোস্তামী কাছিমের ডিম দেওয়ার মৌসুম। ডিম দেওয়ার ৮০ থেকে ৯০ দিন পর বাচ্চা ফোটে। এই কচ্ছপগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো; আকারে অনেক বড় এবং ওজনও বেশি। কালের সাক্ষী হয়ে, এদের শত বছর বেঁচে থাকার অপূর্ব ক্ষমতা রয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বন কর্মকর্তা আবু নাছের মোহাম্মদ ইয়াছিন নেওয়াজ জানান, “২০০৪ সালে একবার পুকুরটিতে বিষ দিয়েছিল দুর্বৃত্তরা। তখন পুকুরের পানি সেচে ফেলার সময় প্রায় ৫০০ কাছিম পাওয়া যায়।”

তিনি আরও জানান, “এই জাতের কাছিম প্রতি বছর ৬০০ থেকে ৭০০ ডিম দেয়। কিন্ত বাচ্চা হতো ১৫ থেকে ২০টি। বাচ্চা ফুটলেও সেগুলোর বড় একটি অংশ পুকুরে থাকা গজার ও মাগুর মাছে খেয়ে ফেলত। এ জন্য কাছিমের সংখ্যা কমে যাচ্ছিল।বোস্তামী কচ্ছপের বংশবৃদ্ধিতে আমরা গত তিন বছর ধরে মাজার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছি। মাজারের পাশে একটি কৃত্রিম প্রজননকেন্দ্র তৈরি করে দিয়েছি। একটি এনজিও বাচ্চা ফোটানোর দায়িত্বে আছে। সঠিক পরিচর্যার কারণে এখন বোস্তামী কাছিমের সংখ্যা বাড়ছে।”

সূত্রমতে, ১৯৩১ সালে প্রাণিবিজ্ঞানী ম্যালকম স্মিথ তার ফোনা অফ ব্রিটিশ ইন্ডিয়া গ্রন্থে উল্লেখ করেন, ভারতবর্ষে ‘নিলসোনিয়া নিগ্রিকান টার্টেল’ একমাত্র বায়েজিদ বোস্তামী (র.)-এর মাজারে পাওয়া যায়।”

স্থানীয় লোকজনের বিশ্বাস, হযরত সুলতান বায়েজিদ বোস্তামী (র.) ইরান থেকে চট্টগ্রামে আসার সময় এ কাছিম গুলো নিয়ে আসেন। তবে, প্রাণী বিজ্ঞানীদের ধারণা, বোস্তামী কাছিম বাংলাদেশ ও ভারতীয় উপমহাদেশ অঞ্চলের প্রাণী।

২০০৯ সালে ক্যারিনামের নির্বাহী পরিচালক এস এম এ রশিদ এবং অস্ট্রীয় বিজ্ঞানী পিটার গ্রাসবাগ বাংলাদেশে মিঠা পানির কাছিমের ব্যবসা নিয়ে একটি গবেষণা করছিলেন। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল বাজারে ভিন্ন প্রজাতির কাছিম দেখতে পান তারা। তাৎক্ষণিকভাবে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য কাছিমের শরীর থেকে কিছু কোষ সংগ্রহ করেন। পরে ২০১০ সালে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের মানিকছড়িতে জেলেদের বড়শিতে ধরা পড়া একটা কাছিম দেখতে পান। বোস্তামী কাছিমের মতো মনে হওয়ায় সেটিরও কোষ ডিএনএ পরীক্ষা করার জন্য সংগ্রহ করা হয়। ২০১১-১২ সালে এ প্রজাতির কাছিম মুহুরী নদী ও নেত্রকোনার একটি জলাশয় থেকেও সংগ্রহ করে গবেষক দল।

এরপর, ড. গ্রাসবার্গ জানান, জার্মানির ড্রেসডেন অবস্থিত মিউজিয়াম অফ জুওলজিতে কয়েক প্রজাতির কাছিম শনাক্ত করার জন্য গবেষণা চলছে। সেখানে সংগ্রহ করা কোষের নমুনার ডিএনএ পরীক্ষার পর জানা গেছে দুটি টিস্যুর নমুনা নিলসোনিয়া নিগ্রিকান বা বোস্তামী কাছিমের।

আরও জানা গেল যে এ প্রজাতির কাছিমের বাহ্যিক রঙ কয়েক প্রকার হয়। যা বয়স এবং স্থানের কারণে বদলায়। এ বিষয়ে গবেষক শাহারিয়ার সিজার বলেন, “২০১২ সালে অস্ট্রিয়ার বিজ্ঞানি পিটার প্রাসচাগের একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ হয় ভার্টিব্রেট জিওলজি জার্নালে। তিনি উপমহাদেশের কচ্ছপ এবং কাছিমের ওপর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। কাছিমের ডাটা এবং জিনগত গবেষণা করে জানান, বায়োজিদ বোস্তামির কাছিম খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি এবং মৌলভীবাজারে পাওয়া গেছে। এছাড়া সিলেট এবং আসামের বিভিন্ন অঞ্চলে এদের বসবাস রয়েছে।” শাহারিয়ার সিজার জানান এই কাছিমের বড় একটি অংশ চট্টগ্রামের বায়োজিদ বোস্তামির মাজারে টিকে আছে।

আইইউসিএন এর হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে মোট ২৬০ জাতের কাছিম রয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশে রয়েছে ৩০ প্রজাতির, যার ছয়টি ছাড়া বাকি সবগুলোর নাম বিপন্নপ্রায় প্রাণীদের তালিকায় উঠেছে। শত বছরের ওপরে আয়ু নিয়ে জন্ম নেওয়া বোস্তামী কাছিমের যে কটি জাত দেশের বিভিন্ন নদী-জলাশয়ে পাওয়া গেছে, তার দৈর্ঘ্য ৫০ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার। তবে বায়েজিদ বোস্তামী (র.)-এর মাজারের কাছিম গুলোর দৈর্ঘ্য ৯০ সেন্টিমিটার থেকে এক মিটার পর্যন্ত। খয়েরি ও কালচে রঙের এ প্রাণী মূলত নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ায় জীবন ধারণ করতে পারে।

২০০২ সালে, আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) বোস্তামী কাছিম-কে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করে। বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনের তফসিল-১ অনুযায়ী এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত।

XS
SM
MD
LG