অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

বাংলাদেশে ফার্মের মুরগির মাংসে ক্ষতিকর মাত্রায় ভারি ধাতুর উপস্থিতি, বললেন বিশেষজ্ঞরা 


বাংলাদেশের একটি পোল্ট্রি খামার যেখানে ব্রয়লার মুরগি উৎপাদন করা হচ্ছে। (সৌজন্যে- বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল)

বাংলাদেশে বাণিজ্যিক ভাবে খামারে চাষ করা পোলট্রি মুরগির মাংস দেশে প্রোটিনের চাহিদা পূরণের একটি বড় উৎস হলেও তাতে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর অন্তত পাঁচটি ভারি ধাতুর উপস্থিতির কারণে ভোক্তাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

প্রবাবিলিটিস অব হেলথ রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট অব টক্সিক মেটালস ইন চিকেনস ফ্রম দ্য লারজেস্ট প্রডাকশন এরিয়া অব ঢাকা শীর্ষক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের কয়েকজন গবেষকের করা ওই গবেষণায় বলা হয়েছে খামারে চাষ করা এই মুরগির মাংসে পাঁচ ধরনের ভারী ধাতুর উচ্চমাত্রার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের কারিগরি সহায়তায় করা গবেষণার ফলাফলে খামারে চাষ করা মুরগির মাংসে আর্সেনিক, নিকেল, ক্রোমিয়াম, পারদ ও সিসার মতো ভারী ধাতু ক্ষতিকর মাত্রায় উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

এতে মানবদেহে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ১০৪ গুণ আর্সেনিক, ৫.৫৮ গুণ নিকেল, ৩ গুণ ক্রোমিয়াম, ২.৮ গুণ পারদ ও ৪.৬ গুণ সিসা পাওয়া যায়। নেদারল্যান্ডস ভিত্তিক এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড পলিউশন রিসার্চ জার্নালে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে যাতে বলা হয়েছে গবেষণা পরিচালনার জন্য ঢাকা জেলার সাভারের ১২টি বাণিজ্যিক খামার থেকে মুরগির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। গবেষণা পত্রে বলা হয় যে সকল খামার থেকে মুরগির নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে সেগুলোতে ব্যবহার করা পোলট্রি ফিডের নমুনায়ও ক্ষতিকর মাত্রায় আর্সেনিক, নিকেল, পারদ ও সিসা পাওয়া গেছে। একইভাবে মুরগির পানীয় জলেও দূষণ পেয়েছে গবেষক দল। পানিতে অন্যান্য দূষণের পাশাপাশি মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিকও পাওয়া যায়।

এ সকল ধাতুর মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি মানবদেহে ক্যান্সার ও অন্যান্য স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করছে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয় এ সকল ক্ষতিকর ধাতু খাদ্যের মাধ্যমে গ্রহণ করলে মানবদেহে তাৎক্ষণিক কোনও সমস্যার সৃষ্টি না হলেও দীর্ঘদিন ধরে এগুলো শরীরে প্রবেশ করলে ২৫ শতাংশ ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি হয়। এছাড়া অন্যান্য রোগের ঝুঁকি থাকে ৪২ শতাংশ। গবেষকরা বলেছেন বাজারে বিক্রির ৭২ ঘণ্টা আগে কোনও মুরগির শরীরে হরমোন ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হলে তা খাওয়া মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু এর পরও কোনও কোনও খামারি অতি মুনাফার লোভে পোলট্রি মুরগির ওজন বাড়াতে হরমোন ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করেন।

গবেষণাটির তত্ত্বাবধানে থাকা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শফি মোহাম্মদ তারেক ভয়েস অফ অ্যামেরিকাকে বলেছেন মানসম্মত নয় এমন ফিডের মাধ্যমেই এসব ধাতু মুরগির শরীরে ঢুকছে। তিনি বলেন ফিডের মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে নজরদারির অভাবের কারনে দেশে মান সম্মত ফিডের উৎপাদনের ঘাটতি রয়েছে। ফিডগুলো তৈরি, মোড়ক জাত ও বাজারজাত করার ক্ষেত্রে শতভাগ সতর্কতা অবলম্বন করা হয় না বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন ফলে এগুলোতে ধাতুর উপস্থিতি রয়ে যায় যা দিনশেষে

মুরগির শরীরে প্রবেশ করে। এছাড়া পোলট্রি মুরগির জন্য যে সকল উৎস থেকে পানি ব্যাবহার করা হয় তা যথাযথ পরীক্ষা ব্যতিরেকে ব্যাবহার করার কারণেও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বিভিন্ন ধাতব এবং অন্যান্য বস্তু মুরগির শরীরে ঢুকছে ।

অধ্যাপক ড. শফি মোহাম্মদ তারেক বলেন মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হবে না এমন মুরগী উৎপাদনের জন্য খামারিদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং একই সাথে খামার এবং ফিড উৎপাদনকারী শিল্প সমুহকে নজরদারির আওতায় আনতে হবে । তিনি আশা প্রকাশ করেছেন এটা করা সম্ভব হলে আগামী ৪/৫ বছরের মধ্যে দেশে শতভাগ না হলেও ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ স্বাস্থ্য সম্মত পোলট্রি মুরগি উৎপাদন সম্ভব হবে ।

বাংলাদেশ ফিড ইন্ডাস্ট্রিজ আসসিয়েশন-এর সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মাদ আহসানুজ্জামান বলেন বাংলাদেশে প্রায় ৪০০ ফিড ইন্ডাস্ট্রিতে মাসে ৫ লাখ টনের ওপর পোলট্রি ফিড উৎপাদিত হয়ে থাকে । যে ৪০০ ফিড ইন্ডাস্ট্রি রয়েছে এর মধ্যে ২৮১টি সরকারের নিবন্ধনকৃত এবং এর মধ্যে আসসিয়েশনের সদস্য ৯০ টি । তিনি বলেন এ সকল ফিড ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে অনেকগুলোতে যে কাঁচামাল ব্যবহার করা হয় তা থেকে ক্ষতিকারক পদার্থ অপসরণের যে প্লান্ট এবং তৈরি হওয়া ফিড বাজারজাত করার আগে সেগুলোতে কোন ক্ষতিকারক ধাতব পদার্থ রয়েছে কিনা তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য কোন ল্যাবরেটরি না থাকায় জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বস্তু তাতে থাকার সম্ভাবনা থেকেই যায়। যেহেতু বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের সাথে জড়িত তাই ফিড কারখানাগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানোর ওপর জোর দেন আসসিয়েশনের সাধারন সম্পাদক।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সভাপতি মশিউর রাহমান দেশে না থাকায় তাঁর সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয় নাই। তবে সংস্থাটির মিডিয়া অ্যাডভাইজার মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন বলেছেন দেশের সকল পোলট্রি খমার গুলোর অবস্থা জানতে একটা জরিপ চলছে এবং সেটা সমাপ্ত হলে এ খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি জানা যাবে । তিনি বলেন তখন পরিস্থিতি বুঝে ব্যাবস্থা নেয়া হবে এবং যে সকল সমস্যাগুলো দেখা যাচ্ছ সেগুলোর একটা সমাধান পাওয়া যাবে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন পোলট্রি মুরগির মাংস দেশের প্রোটিনের চাহিদার এক বড় অংশ পূরণ করে থাকে । এতে ভারী ধাতুর পরিমাণ বেশি পাওয়া গেলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। শুধু পোলট্রি নয়, ডেইরি, মাছ বা যেকোনো খাদ্য শতভাগ নিরাপদ হতে হবে। এসব ধাতু মানুষের স্মরণ শক্তি, ফুসফুস এবং কিডনিকে ক্ষতিগ্রস্থ করে। শতভাগ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার কোনও বিকল্প নাই বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ। তিনি বলেন যেকোনো খাবার বিশেষ করে যা দৈনন্দিন খাওয়া হয় তা শতভাগ নিরাপদ হতে হবে। এর জন্য জনসচেতনতা, নিরাপদ খাদ্য আইন প্রয়োগ ও খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মানসম্মত পরীক্ষাগার স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এরপর যথাযথভাবে আইনের প্রয়োগ করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড.শারমিন রুমি আলীম বলেন পোলট্রি মুরগি যেহেতু সাধারন মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে তাই বাজারে এই মাংসেরর চাহিদাও রয়েছে । তবে তিনি বলেন আশঙ্কার কথা হচ্ছে এই মাংসের মধ্যে যেহেতু গবেষকরা মাত্রার অতিরিক্ত ভারি ধাতুর উপস্থিতি পেয়েছেন তাই এর মাধ্যমে বিভিন্ন স্বাস্থ্য ঝুকির সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে।

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল কাইউম সরকার বলেন পোলট্রি মুরগির শরীরে ভারি ধাতব পদার্থ পাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগের। তিনি বলেন এর আগেও ফিড সংক্রান্ত কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল এবং সেগুলোর সমাধান করা হয়েছে। গবেষণায় যে সকল বিষয় উঠে এসেছে সেগুলো যেহেতু নিরাপদ খাদ্যের সাথে জড়িত তাই এ বিষয়ে আরও ভাল করে জেনে সংশ্লিষ্ট দপ্তর সমুহের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা হবে বলে তিনি জানান।

XS
SM
MD
LG