অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

কক্সবাজারে পাহাড়ী বনভূমিতে একাডেমি স্থাপন পরিকল্পনা বাতিলের দাবী ৭টি পরিবেশবাদী সংগঠনের


কক্সবাজারে পাহাড়ী বনভূমিতে একাডেমি স্থাপন পরিকল্পনা বাতিলের দাবীতে পরিবেশবাদীদের সমাবেশ

কক্সবাজারে পাহাড়ী বনভূমিতে ‘বঙ্গবন্ধু একাডেমি অব পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন’ স্থাপনের পরিকল্পনা বাতিলের দাবি জানিয়েছে সাতটি পরিবেশবাদী সংগঠন ও একজন স্থপতি। সংগঠনগুলো বলছে, ওই প্রতিষ্ঠানের জন্য ৭০০ একর জমি লীজ দেয়ার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয় যেচিঠি দিয়েছে তা বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এবং দেশের প্রচলিত আইন ও আদালতের আদেশের লঙ্ঘন। প্রকল্পটি থেকে সরে আসতে সংগঠনগুলো সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে চিঠি পাঠিয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), নিজেরা করি, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি), এসোসিয়েশন ফর ল্যান্ডরিফর্ম এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি), স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন, আইন ও শালিস কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এ্যান্ডসার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) এক যৌথ বিজ্ঞপ্তিতে চিঠি পাঠানোর কথা জানানো হয়েছে।

পত্র প্রেরণকারীরা বলছেন, যেখানে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ১৮৯ একর জমির উপর লাল বাহাদুর শাস্ত্রী ন্যাশনাল একাডেমি অব এডমিনিস্ট্রেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, যেখানে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন কমপ্লেক্স ২১৫ একর জমির উপরে প্রতিষ্ঠিত, যেখানে সিভিল সার্ভিস প্রশিক্ষণের জন্য সাভারে ৫৪ একরের উপর একটি প্রশিক্ষণশালা রয়েছে, সেখানে পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল রক্ষিত বনভূমি ধ্বংস করে ৭০০ একর জমিতে একাডেমি স্থাপনের কোনো যৌক্তিকতা নেই। প্রয়োজনে বর্তমান ৫৪ একর জমির উপর নির্মিত বাংলাদেশ পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন সেন্টার এলাকা সম্প্রসারিত করা যেতে পারে।

বনভূমি সংকুচিত করে এবং বন, পাহাড়, বনজসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করে তার সাথে বঙ্গবন্ধুর নাম যুক্ত করা তার প্রতি সম্মান নয় বরং অসম্মান প্রদর্শন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সচিব, চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, প্রধান বন সংরক্ষক, কক্সবাজারের জেলাপ্রশাসক, চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক, বিভাগীয় বন কর্মকর্তা, কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগ, কক্সবাজারের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর রোববার চিঠি পাঠানো হয়েছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব বরাবর চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু একাডেমি অব পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন নির্মাণ পরিকল্পা গ্রহণের পর স্থানীয় পরিবেশবাদীরাও এর তীব্র আপত্তি জানাচ্ছেন।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রকল্পটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিবাদ হচ্ছে।

রোববার ওই প্রকল্প বাতিলের দাবিতে কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে বক্তারা বলেন, স্থানীয় পরিবেশ রক্ষায় এখানে বন উজাড় করে স্থাপনা নির্মাণ করতে দেয়া হবে না।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী ওই সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে বলেন, পাহাড় ধ্বংস করে সিভিল সার্ভিস একাডেমি মেনে নেয়া হবে না। কক্সবাজারের পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষায় আমরা ঐক্যবদ্ধ। আর কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। লিজ বাতিল না করলে সর্বস্তরের জনগণকে নিয়ে লিজ প্রতিহত করা হবে।

স্মরণ করা যায় যে, ভূমি মন্ত্রণালয় ২০১৮ সনের ১২ই নভেম্বর একটি পত্রের মাধ্যমে কক্সবাজার জেলার ঝিলংজা মৌজার বি এস খতিয়ানভুক্ত ২৫০০১ ও ২৫০১০ নম্বর দাগে মোট ৭০০ একর (পাহাড় ও ছড়া) খাস জমি অকৃষি খাস জমি দেখিয়ে তা বঙ্গবন্ধু একাডেমি অব পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন প্রতিষ্ঠার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে বন্দোবস্তের প্রস্তাব দেয়। পরবর্তীতে ভূমি মন্ত্রণালয় গত৩রা জুন অন্য এক পত্রের মাধ্যমে কক্সবাজার জেলা প্রশাসককে দাগ দুটি দীর্ঘমেয়াদী বন্দোবস্ত প্রদানের কার্যক্রম সম্পাদনপূর্বক মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠাতে অনুরোধ করে।

পত্র প্রেরণকারীরা তাদের চিঠিতে উল্লেখ করেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের কোনো পত্রেই ইচ্ছাকৃতভাবে ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে উল্লেখ করা হয় নাই যে, এই দাগগুলোতে পাহাড়, রক্ষিত বন ও ছড়া রয়েছে এবং দাগ দুটি প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা ঘোষিত এলাকার অন্তর্ভুক্ত।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের এমন অধিগ্রহণ প্রস্তাবের জবাবে বন বিভাগ ২০১৯ সনের ৬ই জানুয়ারি একটি পত্র মারফত পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে স্পষ্ট অবগত করেছে যে- (ক) প্রস্তাবিত এলাকাটি রক্ষিত বনের অংশবিশেষ (খ) রক্ষিত বনভূমি খাসজমি হিসেবে ১নং খতিয়ানে রেকর্ডভুক্ত হলেও তা ‘বন্দোবস্তযোগ্য নয়’ মর্মে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের রেকর্ড রেজিস্টারে লিপিবদ্ধকরণের নির্দেশ রয়েছে; (গ) স্টেট একুইজিশন এন্ড টেনাসি অ্যাক্ট ১৯৫০ অনুযায়ী বনভূমি নন রিটেইনেবল প্রোপার্টি (ঘ) প্রস্তাবিত এলাকাটি বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন বনায়নকৃত পাহাড়ি এলাকা এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পাহাড় ও পাহাড়ের ঢালুভূমি বন্দোবস্তযোগ্য নয় বরং তা বনায়নের জন্য সংরক্ষিত থাকবে, এবং (ঙ) ঝিলংজা মৌজায় প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষিত হওয়ায় এই এলাকাতে প্রাকৃতিক বন ও গাছপালা কর্তন বা আহরণ এবং ভূমির প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নষ্ট বা পরিবর্তন হতে পারে এমন সকল কাজ নিষিদ্ধ।

প্রস্তাবিত এলাকাটিতে উপকূলীয় বনায়নের আওতায় প্রায় ১০০ একর সৃজিত বাগান থাকায় এলাকাটি জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। এই রক্ষিত বনটিতে বিভিন্ন দুর্লভ প্রজাতিসহ প্রায় ৫৮ প্রজাতির বৃক্ষ আছে এবং এলাকাটি এশীয় বন্য হাতি, বানর, বন্য শূকর, বিভিন্ন প্রজাতির সাপও পাখির আবাসস্থল ও বিচরণক্ষেত্র। এসব কারণ দেখিয়ে আইনি বিধানাবলী সাপেক্ষে বন বিভাগ ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত অধিগ্রহণেআপত্তি তুলে।

যেহেতু প্রস্তাবিত ভূমি বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণাধীন, তাই বন বিভাগকে পাশ কাটিয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে এই জমি বন্দোবস্ত গ্রহণের সুযোগ নেই বলে স্থানীয় পরিবেশবাদীদের দাবি।

ওদিকে একটি রিট মামলার রায় অনুযায়ী প্রতিবেশগত সঙ্কটাপন্ন এলাকা হওয়ায় কক্সবাজার জেলার ঝিলংজা মৌজায় সকল ধরণের ইজারা প্রদান এবং স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ। দেশের বনভূমির বিরুদ্ধ ব্যবহার রোধে বেলা কর্তৃক দায়েরকৃত মামলায় হাইকোর্ট ২০১৯ সনের১১ই মার্চ বনভূমির প্রকৃতি পরিবর্তন করার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেন।

পাহাড়ী রক্ষিত বনভূমি সিভিল সার্ভিস প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের জন্য অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে জানতে পেরে বেলা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে মামলায় পক্ষভুক্ত করার আবেদন করলে আদালত ২০১৯ সনের আগস্টে দেয়া আদেশে তা মঞ্জুর করেন। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর চিঠিতে ওই আদেশের বিষয়টি উল্লেখ করে বলা হয়, আদালতের এই নিষেধাজ্ঞা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবংভূমি মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

XS
SM
MD
LG