অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

কাবুল পরিস্থিতি: উপমহাদেশের জন্য নতুন সতর্কবার্তা 


তালেবান যোদ্ধারা আফগানিস্তানের কাবুলের হামিদ কারজাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইভেকুয়েশন কন্ট্রোল চেকপয়েন্টের কাছে পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে। ২৭A আগস্ট, ২০২১।

কাবুল বিমানবন্দরে আইসিসের আত্মঘাতী হামলার পর সব হিসেব-নিকেশ পাল্টে গেছে। উপমহাদেশজুড়ে কমবেশি আতঙ্কও তৈরি হয়েছে। ঢাকার নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, এটা কাবুলেই হয়তো সীমাবদ্ধ থাকবে না। এর প্রভাব পড়বে দক্ষিণ এশিয়ায়। বলা হচ্ছে, তালিবান যদি আইসিস নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নিতে পারে। তালিবান ও আইসিস উভয়ই সুন্নি ইসলামপন্থি, চরমপন্থী গোষ্ঠী। তারা চায়, কঠোর শারিয়া আইনের অধীনে কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র গঠন। কিন্তু বাস্তবে দুই বাহিনী একে অপরের শত্রু।

২০১৫ সনে আইসিস কর্তৃক আফগানিস্তানে ইসলামিক স্টেট খোরাসান প্রদেশ গঠনের সময় থেকেই তালিবানের সঙ্গে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। ১৯৯৪ সনে আফগান যুদ্ধের সময় তালিবান প্রথম আলোচনায় আসে। এদের অনেকেই ছিলেন মুজাহিদিনের যোদ্ধা। আশির দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের দখলদারির সময় লড়াই করে তালিবান দৃশ্যপটে আসে। ১৯৯৬ সনের সেপ্টেম্বরে বোরহান উদ্দিনের শাসন উৎখাত করে আফগানিস্তানের দখল নেয় তালিবান । ২০০১ সনে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার পর পর্যদুস্ত ও ক্ষমতাচ্যুত হয় তালিবান। এর পর থেকে ক্ষমতা ফিরে পাবার চেষ্টায় তারা নিরন্তর যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ১৫ই আগস্ট কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর তারা বাগরাম বিমানঘাঁটির চরকি কারাগার থেকে ৫০০০ বন্দিকে মুক্তি দেয়। তাদের মধ্যে আইসিস এবং আল-কায়েদা যোদ্ধারা ছিল। বিশ্লেষকরা বলছেন, এখান থেকেই বিপদের শুরু।

শাহাব এনাম খান
শাহাব এনাম খান

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান সামগ্রিক পরিস্থিত বিশ্লেষণ করে বলছেন, কাবুল বিস্ফোরণ হঠাৎ করে হয়নি। এটা আগেই অনুমান করা গিয়েছিল। আমেরিকান প্রশাসনও আগে থেকেই সতর্ক বার্তা দিয়েছিল। এই হামলার মধ্যে দিয়ে প্রমাণ হলো, তালিবানের ভেতরে দুর্বলতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক সমর্থন ছাড়া তাদের অবস্থান দৃঢ় করতে পারবে না এমনটা মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, তালিবান চাইছে , তাদের ইমেজ বদলাতে। লিবারেল অ্যাপ্রোচ নিতে। যদিও তালিবান যোদ্ধাদের মধ্যে কেউ কেউ এখনো উগ্রপন্থী আবার কেউ কেউ নরমপন্থী। এটাই সম্ভবত বড় দূর্বলতা। তাদের নেই কোনো সামরিক শক্তি। তারা এসেছে জনসমর্থন নিয়ে। এ কারণে তারা নিন্দা জানিয়েছে আইসিসের হামলাকে।

পরিস্থিতি এখনও নাজুক এবং উত্তেজনাকর। এখন আর আমাদের আরাম করে বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই। মনে রাখতে হবে, তালিবানের যেমন সমর্থন রয়েছে, আল-কায়েদা বা আইসিসের প্রতিও সহানুভূতি রয়েছে কিছু মানুষের। তাই বাংলাদেশে নজরদারি বাড়াতে হবে। স্মরণ রাখতে হবে, এর স্পিল ওভার ইফেক্ট রয়েছে। তারা অন্যান্য দেশকেও এই বার্তা পাঠবে। অধ্যাপক খান আরও বলেন, এই ঘটনার পর দক্ষিণ এশিয়াকে অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে।

আমেরিকা এখন কি করবে এমন এক প্রশ্নে অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, নিশ্চিতভাবে বলতে পারি দেশটি তালিবানকে সহযোগিতা করবে। এখানে তাদের একটা বাধ্যবাধকতা আছে। তবে এটা ঠিক, ওয়াশিংটন চাইলেও তালিবানকে এই মুহূর্তে মিলিটারি সাপোর্ট দিতে পারবে না।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম. সাখাওয়াত হোসেন
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম. সাখাওয়াত হোসেন

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম. সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, আইএস এর সঙ্গে তালিবানের শত্রুতা দীর্ঘদিন ধরে চলছে। অনেকদিন তারা একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। অনেক তালেবান সদস্য যারা কট্টরপন্থী হতে চেয়েছিল তারা তালিবান ছেড়ে আইএস-এ যোগ দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান আইএস এবং তালিবানের তত্ব একদম মিলছে না। আইএস এর কথা হচ্ছে, তালিবান আমেরিকার সঙ্গে সন্ধি করে তাদের আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে দিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, কাবুলে হামলা এসব কারণেই। তাছাড়া যে দেশে কোনো সরকার নেই, সেট্রাল কমান্ড নেই, দেশ অস্থির অবস্থার মধ্যে আছে, বিদেশিরা চলে যাচ্ছে, এই সুযোগ নিয়ে আইএস এই হামলা চালিয়েছে। কারণ তাদের একমাত্র লক্ষ্য, পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করা। আতঙ্ক তৈরি করা।

XS
SM
MD
LG