অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

পরিযায়ী পাখি শামুকখোল এখন বাংলাদেশের বাসিন্দা


বগুড়ার শেরপুর উপজেলার রামনগর গ্রামের গাছে গাছে শামুকখোল পাখি।

শামুকখোল পাখি। আজ থেকে ২০/২৫ বছর আগেও বাংলাদেশে সহজে দেখা মিলতো না। উপযুক্ত পরিবেশ, পর্যাপ্ত খাবার এবং প্রজনন সুবিধার কারণে এই পাখি এখন বাংলাদেশের আনাচে কানাচে দেখা মিলছে। সেই সাথে বহুগুণ বৃদ্ধিও পেয়েছে শামুকখোলের সংখ্যা। পাখি বিশেষজ্ঞ অধ্যপক ড. এস এম ইকবালের মতে শামুকখোল এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলার খাল, বিল এবং নদীর কাছাকাছি এলাকাগুলোতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেছে। এরা প্রজনন শেষে আর দেশের বাইরে যাচ্ছে না। বাংলাদেশেই তারা কলোনী তৈরি করে স্থায়ীভাবে থাকছে। ফলে বাংলাদেশের আনাচে কানাচে সহজেই এই পাখির দেখা পাওয়া যাচ্ছে।


তিনি আরো বলেন, এক সময় শামুকখোল পাখি মূলত আমাদের দেশে গ্রীস্মকালীন ভিজিটে আসতো। এজন্য এদেরকে যাযাবর কিংবা পরিযায়ী পাখি বলা হয়। এরা বাংলাদেশে তখন খুব বেশি স্থায়ীভাবে বসবাস করতো না। অল্প সংখ্যক দেখা যেতো। প্রজননের জন্য তারা অন্য দেশ থেকে আমাদের দেশে আসতো। প্রজনন শেষে তারা আবারও দেশ ত্যাগ করতো। আমাদের দেশে যে শামুকখোলগুলো আসতো সেগুলোর বেশির ভাগ মূলত স্থায়ীভাবে বসবাস করতো পশ্চিম ভারতের বিভিন্ন এলাকা,মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে। ভারতে বছর বছর প্রচণ্ড খরার কারণে ওই দেশে এদের প্রজনন এখন প্রায় বন্ধ হয়েছে।

এদিকে আবাসিক পরিবেশ অনুকূলে থাকায় এখন বাংলাদেশে বিপুল পরিমণ শামুকখোল দেখা যাচ্ছে।বাংলাদেশের হাওড়-বাঁওড় এবং নদী এলাকাগুলোতে শামুকখোল কলোনী স্থাপন করেছে।বিশেষ করে বাংলাদেশের উত্তরের জেলাগুলোতে বাধাহীনভাবে শামুকখোল এখন উন্মুক্ত আকাশে উড়ছে। নওগাঁর সান্তাহার, মহাদেবপুর, জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল, নাটোরের পচামারিয়া ও পুটিয়া, রাজশাহীর দুর্গাপুর, ফেনী, টাঙ্গাইলের পাহারকাঞ্চনুর নলুয়া, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট অঞ্চলের হাওড় এলাকায় এখন শামুকখোল দলে দলে প্রজনন করছে।

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার রামনগর গ্রামের গাছে গাছে শামুকখোল পাখি কলোনী গড়েছে। গ্রামবাসীও যত্নে আগলে রেখেছে পাখিদের।
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার রামনগর গ্রামের গাছে গাছে শামুকখোল পাখি কলোনী গড়েছে। গ্রামবাসীও যত্নে আগলে রেখেছে পাখিদের।




নামকরণ: শামুকখোল পাখির ইংলিশ নাম Asian Openbill আর বৈজ্ঞানিক নাম Anastomus oscitans । এই পাখির ঠোঁটের সাথে অন্য কোন পাখির ঠোঁটের মিল নেই।শামুকখোল পাখির ঠোঁটের নিচের অংশের সাথে উপরের অংশে বড় ফাঁক। এরা এই বিশেষ ঠোঁটে শামুক তুলে চাপ দিয়ে শামুকের ঢাকনা খুলে ফেলে এবং ভিতরের নরম অংশ খেয়ে নেয়। মূলত শামুকের ঢাকনা খোলার শৈল্পিক কৌশলের কারণেই এই পাখির নাম করণ করা হয়েছে শামুকখোল পাখি।

শামুকখোল পাখির বৈশিষ্ট্য: শামুক খোল পাখি খুবই নিরীহ পাখি। এরা নিজেদের মধ্যে কখনো মারামারি করে না। এই পাখি শব্দ করে ডাকতে পারে না। এদের বাহ্যিক ভাবে পুরুষ-স্ত্রী বোঝা যায় না। সব পাখির ধরণ এক। গায়ের রঙ সাদা কালো। বয়স্ক পাখি হলে তার শরীরের সাদা রঙ অনেকটা কালচে বরণ ধারণ করে। এদের আবাসস্থল থাকে দুটি। একটি স্থায়ী বাসা থাকে তাদের। যেখানে তারা কেবলমাত্র প্রজননের সময় অবস্থান করে। অপরটি হচ্ছে প্রজনন পরবর্তী অস্থায়ী অবস্থান। এরা প্রজননের সময় কেবল নির্দিষ্ট বাসায় চলে আসে। অর্থাৎ এই পাখি যেখানে বাসা বাঁধে সেই বাসাতেই প্রতিবছর প্রজনন করে থাকে। দীর্ঘ সময় বাসা পরিত্যক্ত অবস্থায় নষ্ট হলে তারা সেই বাসা সংস্কার করে থাকে। যদি বাসা একেবারেই নষ্ট হয়ে যায় তাহলে তারা নির্দিষ্ট ওই জায়গাতেই নতুন করে বাসা তৈরি করে নেয়। এক থেকে দেড় সপ্তাহ সময় লাগে তাদের বাসা তৈরি করতে। বাসা তৈরি হলে সেখানে তারা ডিম দেয়। এই পাখির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে প্রজনন শেষ হলে এরা বাচ্চাসহ অন্য এলাকায় চলে যায়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তারা দল বেঁধে নদী, খাল, বিল এলাকাগুলোতে অস্থায়ীভাবে অবস্থান নেয়। তারা খাল, বিল এলাকার নিকটবর্তী লোকালয়ের গাছের উঁচু ডালে রাত্রিযাপন করে। প্রজননের সময় ছাড়া এরা বাসাতে থাকে না। গাছের উঁচু ডালে খোলা অবস্থায় থাকে। এদের জলচর পাখি বলা হলেও এরা অন্যান্য জলচর পাখির মত পানিতে সাঁতার কাটে না।

ড. ইকবাল জানান, শামুকখোল বড় কলোনি তৈরি করে রাত্রিযাপন করে। অল্পবয়সী শামুকখোল পাখি উড়তে শেখার পর শত শত মাইল উড়ে ভ্রমণ করে। এরা ভোরে আবাস ছেড়ে খাদ্যের সন্ধানে বের হয়, ডানা ঝাপটিয়ে দল বেঁধে জলাভূমির দিকে উড়ে যায়। দিনের গরম সময়গুলোতে বিশেষ কৌশলে চক্রাকারে আকাশের উঁচুতে উঠে যায়। এরা পানির ধারে, অল্প পানি অথবা পানির উপরে ভাসমান কিছুর উপর চুপ করে থাকে শিকার ধরতে। এছাড়াও অগভীর পানিতে হেঁটে হেঁটে কাদায় ঠোঁট ঢুকিয়ে খাবার খুঁজে। এদের খাদ্য তালিকার ৯০ ভাগ শামুক। এছাড়াও এরা ছোট মাছ, বড় আকাড়ের পোকা, কাঁকড়া, ব্যাঙ খেয়ে জীবন ধারণ করে।
শামুকখোল পাখি যৌন মিলনের সময় ঠোঁটে ঠোঁটে পেটাপিটি করে। তখন দেখতে অনেকটা লাঠিখেলার দৃশ্যের মত মনে হয়। তখন জোরে ঠকঠক শব্দ শোনা যায়।

শামুকখোল পাখি
শামুকখোল পাখি



বাংলাদেশে শামুখোল বৃদ্ধির কারণ: বাংলাদেশের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর দাবি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, বন সংরক্ষণসহ পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশে শামুকখোল পাখির সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
Bangladesh Biodiversity Conservation Federation - BBCF এর সভাপতি পাখি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এস এম ইকবাল ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, বাংলাদেশের পরিবেশবাদি সংগঠনগুলো পাখি সংরক্ষণে অনেক বেশি সোচ্চার। পাখির যত্ন নিতে তারা সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। যার ফলে শামুকখোল পাখি এদেশে তাদের বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ পেয়েছে। সংগঠনগুলো শামুকখোল পাখির বাসাগুলোকে সংরক্ষণ করছে। তারা বড় গাছগুলো না কাটতে সচেতনতা বৃদ্ধি করেছে। তাছাড়াও বাংলাদেশের বিলগুলোতে এখানো প্রচুর পরিমাণ শামুক আছে। যেগুলো খেয়ে এই পাখি জীবন ধারণ করতে পারে। ফলে প্রজননের সময় শামুকখোল পাখি তাদের নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে নির্দ্বিধায় ফিরে আসছে এবং প্রজনন করছে।

প্রজননকালীন সময়: জুন, জুলাই, আগস্ট, সেপ্টম্বর মূলত এদের প্রজননকালীন ঋতু। বর্ষাকালের শেষের দিকে এরা প্রজনন করে থাকে। শামুকখোল ৫টি পর্যন্ত ডিম দিয়ে থাকে। স্ত্রী এবং পুরুষ পাখি উভয় মিলেই ডিমে তা দিয়ে থাকে। প্রায় ২৫ দিন পর ডিম থেকে বাচ্চা হয়ে থাকে।

পরিবেশবাদী সংগঠন Teem for Energy and Environmental Research (TEER) এর বগুড়ার সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, প্রজননকালী সময়ে শামুকখোল পাখি উচু জায়গায় চলে আসে। এসময় তারা লম্বা গাছে বাসা বেঁধে প্রজনন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। প্রজনন শেষ হলে এই পাখি খাবারের সন্ধানে খাল, বিল, নদীর কিনারার দিকে চলে যায়। তিনি বলেন, পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর সচেতনতামূলক কার্যক্রমের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বোধের সৃষ্টি হয়েছে। এখন গ্রামের মানুষরাও পাখিদের যত্ন নেয়া শিখেছে।

বাংলাদেশে শামুকখোল পাখির সংখ্যা বৃদ্ধি হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তিব্র খড়ার কারণে এই পাখির প্রজনন খুব কম হচ্ছে। বিগত কয়েক দশকে কিছু কিছু দেশে আশঙ্কাজনক হারে শামুক খোলের সংখ্যাও কমেছে। ফলে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ আই. ইউ. সি. এন এই প্রাণীটিকে ন্যূনতম বিপদগ্রস্ত বলে ঘোষণা করেছে।

এদিকে খাল বিল এবং আবাদী জমিতে অপরিকল্পিত ভাবে কিটনাশক ব্যবহারের ফলে বাংলাদেশেও শামুকখোল পাখিসহ অন্যান্য প্রাণীকূল হুমকির মধ্যে রয়েছে। কিটনাশকের ফলে দেশীয় অনেক প্রজাতির পাখি বিলুপ্তির পথে। এছাড়াও বন্য আইন উপেক্ষা করে অবাধে পাখি নিধন, বড় গাছ নিধন এসব প্রাণীকূলের জন্য মারার্ত্বক হুমকির কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবিদরা।

শামুকখোল পাখি হত্যায় মামলা দায়ের: বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের রাজশাহীর বন্যপ্রাণী পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবির ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবনের গাছ কাটার ফলে আনুমানিক ৬০ থেকে ৮০টি পাখির বাচ্চা মাটিতে পরে যায়। এর মধ্যে কিছু বাচ্চা ঘটনাস্থলেই মারা যায়। বাকি বাচ্চাগুলো গাছকাটা শ্রমিক এবং রোগীর দর্শনার্থীরা জবাই করে হত্যা করেছে।
বিষয়টিন জানার পর তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এরপর চলতি সেপ্টেম্বর মাসের ৭ তারিখে তিনি রাজশাহী চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেছেন।
তিনি আরো বলেন, বন্যপাখি হত্যা করা, মাংস, দেহের অংশ সংগ্রহ করা, শিকার ও এ জাতীয় অপরাধ সংগঠনের সহায়তা করা, প্ররোচণা প্রদান ইত্যাদি বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন-২০১২) অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আমরা বন্যপাখি হত্যা ও আবাসস্থল ধ্বংসে আনুমানিক ক্ষতির পরিমাণ ১ কোটি টাকা। আর পাখিগুলো হত্যায় পরিবেশের ক্ষতি হয়েছে মর্মে আরও ২ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা করেছি। মামলায় ওই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বিবাদী করা হয়েছে। মামলাটি এখন চলমান আছে।


XS
SM
MD
LG