অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

শিলিগুড়ি করিডোরের গুরুত্ব এবং বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান


অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুর রশিদ, বিশ্লেষক আদর্শ গুপ্ত, মেজর জেনারেল (অব.) এম মুনিরুজ্জামান- ফটো- মতিউর রহমান চৌধুরী

ভারত-চীন সীমান্তে যখনই গুলির লড়াই হয় কিংবা উত্তেজনা দেখা দেয় তখনই আলোচনায় উঠে আসে শিলিগুড়ি করিডোর। যা চিকেন নেক হিসেবে পরিচিত। ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ২২ কিলোমিটার প্রশস্ত পশ্চিমবঙ্গের এই করিডোরটি ভারতের লাইফ লাইন। এই করিডোর হাতছাড়া হলে উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশটির বাকি অংশের সড়ক ও রেল যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তাই চীন চাইছে, এই করিডোরটি ভেঙে দিতে। ভারতও সদা সতর্ক। দ্বিগুণ নিরাপত্তা বাড়িয়েছে।

কৌশলগতভাবে ভারত এই অঞ্চলে বাগডোগরা ও হাসিমারায় দুটি বিমানঘাঁটি তৈরি করেছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে, করিডোরের পূর্ব এবং পশ্চিম প্রান্তকে অতিরিক্ত সুরক্ষা দেয়া। এই করিডোরের পূর্বে নেপাল, পশ্চিমে বাংলাদেশের অবস্থান। চিকেন নেকটি ঘিরে রয়েছে শিলিগুড়ি, মাটিরাঙ্গা, নকশালবাড়ি, চোপড়া ও ইসলামপুরের কিছু অংশ। উত্তরে চীন, সিকিম ও ভুটান অবস্থিত। তিব্বতের চুম্বি উপত্যকার দূরত্ব এই অঞ্চল থেকে মাত্র ১৩০ কিলোমিটার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, তালিবান আফগানিস্তান দখলের পর ভারত জম্মু-কাশ্মীর নিয়ে যেমন চিন্তিত ঠিক তেমনই চিন্তিত শিলিগুড়ি করিডোর নিয়ে। ভৌগোলিক অবস্থানের জন্য চীনের খুবই কাছাকাছি এই করিডোর। ২০১৭ সনে ডোকলাম সীমান্তে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার পর শিলিগুড়ি করিডোরে ভারত বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েন করে। একই সময় চীনা সেনাবাহিনীও সিকিমের কাছাকাছি তাদের শক্তি বৃদ্ধি করে। ওই সীমান্ত থেকে শিলিগুড়ি করিডোর আকাশ পথে ৪০ থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে। চীন চাইছে, দূরত্ব আরও কমিয়ে আনতে।

আন্তর্জাতিক গুরুত্বও রয়েছে এই ক্ষুদ্র করিডোরের। নেপাল ও ভুটান বিশ্বের বাকি অংশের সঙ্গে যুক্ত থাকতে শিলিগুড়ি করিডোরের ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল। চীন যাতে করিডোরের ধারে কাছে না আসতে পারে সে জন্য ভারত প্রতিটি গিরিপথের মুখেই ভারী সামরিক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। এখানে ভুটান একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। চুম্বি উপত্যকা থেকে ভুটান হয়ে সরাসরি পশ্চিমবঙ্গের ডুয়ার্সে প্রবেশ করতে পারে চীন। ভুটান একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র। ভারতের সঙ্গে ভুটানের সম্পর্ক যেকোনো সময়ের তুলনায় চমৎকার।

বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান করছে। চীন এবং ভারত উভয় দেশই বাংলাদেশকে পাশে পাওয়ার জোরালো চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে নানাবিধ কৌশল গ্রহণ করেছে চীন। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক উন্নয়নে গত বছর পয়লা জুলাই চীন বাংলাদেশের ৯৭ ভাগ পণ্যকে শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়। একই সময় চীন ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে তিস্তা বাঁধ নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে। ভারত চীনের এই উদ্যোগকে বাঁকা চোখেই দেখছে। প্রতিরক্ষা খাতেও চীন চট্টগ্রাম বন্দরে এন্টিশিপ মিসাইল লঞ্চ প্যাড তৈরি করেছে। পায়রাবন্দর তারই অংশ। ভারতও বসে নেই । ২০২০ সনে চট্টগ্রাম নৌবন্দরের মাধ্যমে ভারতীয় পণ্য কলকাতা থেকে আগরতলা নিয়ে যাওয়ার জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি করে। এই চুক্তির ফলে চিকেন নেকের বিকল্প খুঁজে পেয়েছে ভারত। এমনটাই বলাবলি রয়েছে।

এ সম্পর্কে বাংলাদেশি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, আমাদেরকে খুবই সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে। যেহেতু এই করিডোরটা বাংলাদেশের ভূখণ্ডের সঙ্গে লাগোয়া সে কারণে এই করিডোরের ওপর আমাদের কৌশলগত নজর রাখতে হবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুর রশিদ এ বিষয়ে বলেন, ত্রিদেশীয় সীমান্ত হওয়ায় শিলিগুড়ি করিডোর খুবই গুরত্বপূর্ণ। বিশেষ করে কৌশলগত দিক দিয়ে ভারতের কাছে এটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই করিডোরকে ঘিরে কোনো সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হলে সীমান্ত ঘেঁষা দেশগুলোতে এর প্রভাব পড়বে। এজন্য যেকোনো ধরনের সংঘাত এড়িয়ে চলার অবস্থানে বাংলাদেশ আছে এবং থাকবে। এটিই বাংলাদেশের বর্তমান কৌশলগত অবস্থান।

তিনি বলেন, কোনো কারণে চীন যদি এই করিডোরে নেমে আসে তাহলে বড় সংকটে পড়বে ভারত। কারণ এতে উত্তরের রাজ্যগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ভবিষ্যতে এমন কোনো অবস্থা তৈরি হলে ভারত করণীয় হিসেবে স্ট্রাটেজিক বিকল্পও ঠিক করে রেখেছে। এর একটি হচ্ছে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে উত্তরের রাজ্যগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো। অন্যটি মিয়ানমারের ওপর দিয়ে ওইসব রাজ্যে যাওয়ার বিকল্প ব্যবস্থা। এজন্য তারা মাল্টিমোডাল প্রজেক্ট হাতে নিয়েছে।

এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, শিলিগুড়ি করিডোর নিয়ে কোনো সংঘাত হলে এই অঞ্চলে মারাত্মক সংকট ডেকে আনবে। এতে বাংলাদেশের ওপরও চাপ তৈরি করবে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এম মুনিরুজ্জামান বিষয়টি দেখছেন অন্যভাবে। তার মতে, গত বছর যখন লাদাখে ভারতের সঙ্গে চীনের ছোটখাটো সংঘর্ষ হয় তারপর থেকে তিনটি সীমান্তে ভারতের সঙ্গে চীনের চাপ বাড়তে থাকে। আরেকটি নতুন চাপ সৃষ্টি হচ্ছে ভারতের নর্থইস্টে। অরুণাচল প্রদেশে নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে। চীন তুলনামূলকভাবে তাদের সীমান্তের ওপারে ডিফেন্স স্থাপনা তৈরি করা প্রয়োজন, তা করে ফেলেছে। ভারত এখনও সম্পন্ন করতে পারেনি ।

ভারত-চীনের এই দ্বন্দ্বে বাংলাদেশ তাহলে কি করবে?

মেজর জেনারেল (অব.) এম মুনিরুজ্জামান এই প্রতিনিধিকে বলেন- আমাদের কোনো পার্টির সঙ্গেই দ্বন্দ্বে জড়ানো ঠিক হবে না। এটা হবে আত্মঘাতী। পৃথিবীর বেশ কিছু দেশের উদাহরণ টেনে এই নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন, যারা তাদের ভূ-রাজনৈতিক কারণে কিংবা পলিসিগত দুর্বলতার কারণে বিরোধে জড়িয়েছে তারাই ধ্বংস হয়ে গেছে।

লেবাননের কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। তারা ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি যতটা না সংঘর্ষে লিপ্ত হতো তার চেয়ে বেশি সংঘর্ষে জড়াতো সিরিয়ার ভূমি ব্যবহার করে। এমনই আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে বিশ্বে। তাই আমাদেরকে কোনো দ্বিপাক্ষিক বিরোধের সঙ্গে জড়ানো ঠিক হবে না। কারণ মনে রাখতে হবে, ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে আমাদের গুরুত্ব অনেক বেশি। যেকোনো সিদ্ধান্ত ভেবে চিন্তেই নিতে হবে।

ভারতীয় বিশ্লেষক আদর্শ গুপ্ত শিলিগুড়ি করিডোর সুরক্ষিত করতে হলে অনেকগুলো বিকল্পের কথা বলেছেন। তার মতে, ভারতকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে কানেক্টিভিটির মাধ্যমে উন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে। বাংলাদেশের সাথে একটি চুক্তি সই করা, যে চুক্তিবলে সংঘর্ষের সময় সামরিক, বেসামরিক এবং ট্রাফিক ক্যারি করা যাবে। তেতুলিয়া করিডোরকে পুনরুজ্জীবিত করার কথাও বলেছেন তিনি। স্টাডি এডুকেশন নামের একটি প্রোগ্রামে আদর্শ গুপ্ত আরও বলেছেন, তেঁতুলিয়া করিডোর ৪ থেকে ৬ কিলোমিটারের একটি প্যাসেজ। যা পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার সাথে জলপাইগুড়ি জেলাকে বাংলাদেশের তেঁতুলিয়া উপজেলার মাধ্যমে যুক্ত করবে। এর ফলে দূরত্ব কমে যাবে ৮২ কিলোমিটার।

ওদিকে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, শিলিগুড়ি করিডোর নিরাপদ রাখতে হলে ভারতের সু-সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে ভুটানের সঙ্গে। ২০০৭ সনে ভারত-ভুটান মৈত্রী চুক্তির মাধ্যমে ভুটানকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। এরই পরিণতিতে ২০১৭ সনে ডোকলাম সংকটকালে দুই দেশ এক হয়ে চীনের মুখোমুখি অবস্থান নেয়।

XS
SM
MD
LG