অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

বাংলাদেশে ১২% মানুষ মৎস্য খাতের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছে


জয়পুরহাটের মাছ চাষিরা বিল থেকে জাল দিয়ে মাছ ধরছেন।

বাংলাদেশের প্রায় ১৪ লাখ নারীসহ মোট জনসংখ্যার ১২ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছে। গত ত্রিশ বছরে দেশে মাছের প্রায় ২৫ গুণ উৎপাদন বেড়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।


এছাড়াও একই সূত্রে আরো জানা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে ৪০৮৮.৯৬ কোটি টাকার মাছ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়েছে।ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, রাশিয়া, চীনসহ বিশ্বের ৫০টির বেশি দেশে বাংলাদেশ মাছ রপ্তানি করছে।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, বিগত বছরগুলোর মত উৎপাদনের ধারাবাহিকতা থাকলে ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশের মৎস্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা গিয়ে দাঁড়াতে পারে ৪৫.৫২ লক্ষ মেট্রিক টনে। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে উৎপাদন হয়েছিলো ৪৫.০৩ লাখ মেট্রিক টন। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৩ লাখ ৮১ হাজার মেট্রিক টন। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪২ লাখ ৭৭ হাজার মেট্রিক টন।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার রিপোর্ট অনুযায়ী বিগত ১০ বছরের হিসেবে মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। ইলিশ উৎপাদনকারী ১১ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে প্রথম। অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে চতুর্থ এবং বদ্ধ জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে পঞ্চম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এ ছাড়াও তেলাপিয়া মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ এবং এশিয়ার মধ্যে তৃতীয়। পাশাপাশি বিশ্বে সামুদ্রিক ও উপকূলীয় ক্রাস্টাশিয়া ও ফিনফিশ উৎপাদনে যথাক্রমে ৮ম ও ১২ তম স্থান অধিকার করেছে বাংলাদেশ।

বগুড়ার ফতেহ আলী বাজারের মাছের আড়ৎ থেকে তোলা মাছের ছবি।
বগুড়ার ফতেহ আলী বাজারের মাছের আড়ৎ থেকে তোলা মাছের ছবি।

এদিকে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার রিপোট আরো বলা হয়েছে, বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে শুধুমাত্র বাংলাদেশেই ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় ১২৫টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যের ভিত্তিতে ২০০৮-২০০৯ সালে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯২ হাজার মেট্রিক টন, যা বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮-১৯ সালে ৫ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। গত ১২ বছরে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৮৩ শতাংশ। ২০১৬ সালে ইলিশ বাংলাদেশের ভৌগলিক নির্দেশক পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্যে আরো বলা হয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে টাকার অঙ্কে মৎস্য উপখাত থেকে জিডিপিতে যুক্ত হয়েছে ৮২ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা, যা ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ছিল ৭৪ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। এই খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.১০ শতাংশ।বাংলাদেশের সামুদ্রিক জলসম্পদে ৩৬ প্রজাতির চিংড়ি এবং ৪৭৫ প্রজাতির মাছ রয়েছে। বর্তমানে বঙ্গোপসাগর হতে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রল ফিশিং এবং আর্টিসেনাল মৎস্য আহরণের মাধ্যমে মোট ৪.৩৯ লাখ মে. টন মৎস্য আহরণ করা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের তথ্যে বাংলাদেশে ৩.০৫ লাখ হেক্টর আয়তনের প্রায় ১৩ লাখ পুকুর ও দীঘি রয়েছে। বাংলাদেশের ২৪ হাজার কিলোমিটার নদ-নদীর আয়তন প্রায় ১০.৩২ লাখ হেক্টর। এছাড়া রয়েছে ১.১৪ লাখ হেক্টর জলায়তনের প্রায় ১১ হাজার বিল। ৫ হাজার ৪৮৮ হেক্টর আয়তনের হাওড়। ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টর কাপ্তাই হ্রদ। প্রায় ২.০০ লাখ হেক্টর সুন্দরবন খাড়ি অঞ্চল এবং ২৮.৩০ লক্ষ হেক্টরের প্লাবনভূমি। বাংলাদেশে জনপ্রতি দৈনিক ৬০ গ্রাম চাহিদার বিপরীতে ৬২.৫৮ গ্রাম মাছ বর্তমানে গ্রহণ করছে।

জয়পুরহাটের মাছ চাষিরা বিল থেকে জাল দিয়ে মাছ ধরছেন।
জয়পুরহাটের মাছ চাষিরা বিল থেকে জাল দিয়ে মাছ ধরছেন।

মৎস্য অধিদপ্তর জয়পুরহাটের সহকারি পরিচাল মহিদুল ইসলাম ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, “প্রান্তিক পর্যায়ের চাষিদের বিজ্ঞান ভিক্তিক মাছ চাষের প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছি। সেই সাথে এসব মাছ চাষিদের সমন্বিত করে প্রাকৃতিক জলাশয়গুলোকে পুনরুদ্ধার করে মাছের আবাসস্থলে পরিণত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে আমরা বিজ্ঞান ভিক্তিক মাছ চাষের প্রশিক্ষণ দিয়ে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করতে পেরেছি। মাছ চাষকে সহজিকরণ করে এখন ইনডোরেও মাছ চাষ হচ্ছে। নানা ধরণের প্রযুক্তির সমন্বয়ে এই সেক্টরকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে আমরা মডেল হিসেবে বাংলাদেশকে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছি”।

এদিকে সামুদ্রিক ও মিঠা পানির মাছ দেশীয় প্রজাতির মাছ ভেটকি, কোরাল, পোয়া, ছোট পোয়া, রূপচান্দা, টুনা, ফ্যাসা, তুলার ডান্ডি, তোপসে, কাউয়া, রড কাউয়া, লইট্যা, বৈরাগী (আঁশবিহীন), ওলুয়া, টুস ফ্যাসা, ডুম্বরা, ঢেলা, লালপোয়া, রাঙ্গাচৈখা, রাশ এছাড়াও সার্ডিন(রাস, কলম্বো, তাকিয়া), ছুরি, মেধ, মোচন, জাভা, বারগুণি, কামিলা, মৌরি, শিং, মাগুর, পুটি ইত্যাদি মাছ নিয়ে গবেষণা করছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. ইয়ামিন হোসেন। তিনি ভয়েস অফ আমেরিকাকে জানান, “আমাদের দেশে যে সব প্লাবন ও জলাভূমি আছে, বিশেষ করে বিলগুলো নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে আমরা কাজ করেছি। এই প্রকল্পের আওতায় আমরা দেশীয় ছোটমাছের দীর্ঘ মেয়াদী সহনশীলতা ও সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে গবেষণা করেছি। এই প্রকল্প শুরুর প্রথমেই আমরা পাবনার গাজনার বিলকে বেছে নিই। প্রথমে আমরা এই বিলে বর্তমানে দেশীয় প্রজাতির মাছগুলোর একটি তালিকা তৈরি করি। পরে গবেষণা করে আমরা বের করতে সক্ষম হয়েছি এই মাছগুলোর প্রজননের সময়। গবেষণায় দেখা গেছে জুলাই মাস দেশীয় ছোট মাছের প্রজনন মৌসুম”।

তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের বিলগুলোতে যদি জুলাই মাসের অর্ধেক সময় মাছ আহরণ করা থেকে বিরত থাকা যায় তাহলে মা মাছগুলো বাধাহীন ভাবে ডিম দিতে পারবে। সেই ডিমগুলো থেকে যে বাচ্চা হবে সেগুলো আবার পরবর্তী বছর ডিম দিতে পারবে। তিনি আরও বলেন , “ সেই সাথে জেলেরা কোন সাইজের মাছ আহরণ করলে কোন মাছই বিলুপ্ত হবে না সেই সাইজও আমরা নির্ধারণ করে দিয়েছি। আমরা এই নীতিমালা বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রেরণ করেছি । এগুলোকে যদি প্রয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয় তাহলে দেশী মাছ দীর্ঘ মেয়াদী ভাবে সংরক্ষণ করা যাবে”।

তিনি বলেন, “এক সময় দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের বাঁওড়গুলোতে আজ থেকে দুই যুগ আগেও পাবদা শিং মাগুর টেংরা পুটি, ভেদা, কৈ, এই জাতীয় মাছগুলো ছিলো। কালক্রমে জলবায়ু ও মানুষের সৃষ্ট বিভিন্ন কারণে এই মাছগুলো বাঁওড় থেকে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। আমরা এই বাঁওড়গুলোতে পুনরায় দেশী মাছগুলো ফিরে আনতে নদী এবং খালগুলো থেকে মাছ এনে মজুদ করেছি। সেই মাছগুলো এখন বাঁওড়গুলোতে টানা তিন বছর ধরে প্রজননের মাধ্যমে বংশ বৃদ্ধি করছে। গবেষণার জন্য ওই সব বাঁওড়গুলোতে মাছ ধরা নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে। আমরা বাঁওড় ব্যবস্থাপনা কমিটিকে কোন সাইজের মাছ জেলেরা ধরতে পারবে তা নির্ধারণ করে দিয়েছি। পরে জেলেরা এসব মাছ সাইজ অনুযায়ী আহরণ করতে পারবে”।

গাইবান্ধার একটি মৎস্য খামারের মালিক তার পুকুরে চাষ করা তেলাপিয়া মাছ হাতে ধরে আছেন।
গাইবান্ধার একটি মৎস্য খামারের মালিক তার পুকুরে চাষ করা তেলাপিয়া মাছ হাতে ধরে আছেন।

বাংলাদেশ মৎস্য সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রধান মৎস্য সম্প্রসারণ কর্মকতা জুয়েল শেখ ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, বাংলাদেশ সরকার মাছ চাষে উদ্বুদ্ধকরণের জন্য দুই ভাবে প্রনোদনা দিয়েছে। প্রথমত সরকার কৃষিতে মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ৫হাজার কোটি টাকা প্রনোদনা দিয়েছেন তার মধ্যে মৎস্য চাষিদের জন্য দেয়া হয়েছে ১৫৩.৭২ কোটি টাকা। এছাড়াও বৈশ্বিক মহামারী কোভিড-১৯ মোকাবেলা উপকূলীয় ৭৭ হাজার ৮২৬ জন প্রান্তিক এবং মাঝারি খামারিকে ৯৯ কোটি ৭০ লাখ ২৭ হাজার টাকা নগদ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, অনলাইন বিক্রয় কেন্দ্র, ভ্রাম্যমাণ মাছ বিক্রয় কেন্দ্র/গ্রোথ সেন্টারের মাধ্যমে মোট ৮৩০ কোটি ৩০ লাখ ২৬ হাজার টাকার মাছ বিক্রয় হয়েছে। অর্থনীতিতেও মৎস্য খাতের অবদান উল্লেখ করার মত। দেশের মোট জিডিপির ৩.৫২ শতাংশ, কৃষিজ জিডিপির ২৬.৩৭ শতাংশ, রপ্তানি আয়ের ১.৩৯ শতাংশ এই খাতের অবদান।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে মৎস্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বাংলাদেশের মাছ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। এছাড়াও দেশের উল্লেখযোগ্য মানুষ পেশা হিসেবে মৎস্যখাতকে বেছে নিয়ে জীবনজীবিকা নির্বাহ করছেন।

উল্লেখ্য, প্রান্তিক চাষিদের উদ্বুদ্ধ করতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রতিবছর জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ উদযাপন করে থাকে। এবারো ২৮ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উদযাপন করা হলো জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ। এবারের শ্লোগান ছিলো বেশি বেশি মাছ চাষ করি, বেকারত্ব দূর করি।

XS
SM
MD
LG