অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

সমাজ কোন দিকে ধাবিত হচ্ছে?


rape

ধর্ষণ ধর্ষণ ধর্ষণ! চারিদিকে একেবারে জীবাণুর মতো ছেয়ে যাচ্ছে। দুই বছরের কন্যা শিশু থেকে শুরু করে সত্তর আশি বছরের বৃদ্ধা কেউ বাদ পড়ছে না। কি আশ্চর্যের কথা। সমাজ কোনদিকে ধাবিত হচ্ছে? কে এর জন্য দায়ী? সমাজ ব্যবস্থা? প্রযুক্তি? কাকে দায়ী করবেন? কিভাবে সম্ভব এই অপকর্ম হ্রাস করার? আগে শোনা যেতো ধর্ষণ করা হয়েছে আর এখন অপরাধের চিহ্ন না রাখার জন্য ধর্ষণের পর মেরে ফেলা হচ্ছে। অপরাধীরা শুধু সেখানেই থেমে নেই, মেরে এখন ঐ ক্ষত বিক্ষত শরীরটাকে পুড়িয়ে ফেলছে। একবার ও তারা ভাবছেনা ঐ নারী কারো বোন কারো মা কারো কন্যা। ঐ নারীকে ঘিরে অনেকের অনেক স্বপ্ন রয়েছে। তার ওপর হয়তো অনেকগুলো জীবন নির্ভর করছে। ঐ নারীর কারণেই হয়তো অনেক জীবন ভবিষ্যতের আলো দেখতে পায়।

আমাদের সমাজে এক শ্রেণীর মানুষ রয়েছেন যারা সামাজিক মাধ্যমে ধর্ষণের পক্ষে ধর্ষণকারীর পক্ষে কথা বলেন। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে জানার চেষ্টা করেছি তাদের কি মনে হয় এই ধরণের মন্তব্য ঐ শ্রেণীর মানুষগুলো কেন করেন। শিক্ষক, ছাত্র, গৃহিণী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সব পেশার মানুষদের উত্তর একই। তারা বলছেন, যারা ঐ ধরণের অরুচিকর মন্তব্য করেন তারা ধর্ষণকারীর চাইতে কোন অংশে কম অপরাধী নন। মানসিক বিকারগ্রস্তরা এ ধরণের মন্তব্য করতে পারেন।

তাদের অনেকের কাছে প্রশ্ন রাখি ধর্ষণকারীদের কি ধরণের শাস্তি দেয়া হলে ধর্ষণের মাত্রা কমবে? সে সঙ্গে এখন সামাজিক মাধ্যমে যারা ধর্ষণ সম্পর্কে অরুচিকর, নেতিবাচক মন্তব্য করেন তাদের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ কিনা।

গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্রী জেসমিন আখতার বললেন, বাংলাদেশের শীর্ষ স্থানীয় পদগুলোতে নারীরা রয়েছেন। তারপরেও ধর্ষণের মাত্রা কমছেনা। তিনি বলেন, ধর্ষণকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি হতে হবে।তার মতে তাহলে পরবর্তীতে কেউ এধরনের অপরাধ ঘটানোর সাহস করবেনা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রেদওয়ানুল হুদা আজাদ বলেন, বাংলাদেশে ধর্ষণের মাত্রা হ্রাস করতে হলে শাস্তি হতে হবে সর্বোচ্চ। তিনি মনে করেন, একটি দৃষ্টান্তমূলক সাজা প্রয়োজন, না হলে অপরাধীরা এ ধরণের ঘৃণ্য অপরাধ করে পার পেয়ে যাবে। তিনি আরও বলেন যারা সামাজিক মাধ্যমে ধর্ষণ সম্পর্কে বিরুপ মন্তব্য করবেন, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

বাংলাদেশ বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রোগ্রাম অফিসার মোহাম্মাদ ইব্রাহীম সোহেল বলেন, ধর্ষণের দ্রুত বিচার করা প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় ধরে ধর্ষণের মামলার নিস্পত্তি হোলে অপরাধের প্রবনতা বৃদ্ধি পাবার আশংকা থাকে।

সংবাদকর্মী শেখ তুনাযযিনা তনু বলেন, আমাদের পেশার কারণে যখন তখন বাইরে বের হতে হয়। সে ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রথম মাথায় রাখতে হয় নিরাপত্তার বিষয়টি। আমি একজন নারী প্রতিবেদক, কিন্তু নির্দ্বিধায় রাতে বের হতে পারিনা। পথে ঘাটে এই ধরণের অপরাধীদের সংখ্যা বেশী। তাদের দেখে মনে হয় তারা মানসিক বিকার গ্রস্ত। এদের দেখে মনে হয়না তারা ধর্ষণের মতো এত ঘৃণ্য অপরাধ করার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এরাই এখন এই কর্মকাণ্ডগুলো ঘটাচ্ছে।

বাংলাদেশের ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক মমতাজ হোসেন বলেন, যতো দ্রুত ধরা পড়বে, অভিযোগ প্রমাণ করে দ্রুত শাস্তি প্রদান করা উচিৎ। এতে দুটো কাজ হবে, এক যাদের এ ধরণের কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার প্রবণতা থাকে তারা একটু হলেও ভয় পাবে। দুই, সাধারণ মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে যে অপরাধের বিচার হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, শাস্তি আমাদের দেশের যে প্রচলিত আইন আছে সে আইনের আওতায় হতে হবে। মানুষের মধ্যে বর্তমানে একটি প্রবণতা হচ্ছে কেউ বিপদে পড়লে আগে সামাজিক মাধ্যমে আপলোড করার জন্য সেলফি তোলে। কিন্তু প্রয়োজন বিপদে পড়া ঐ মানুষটিকে সাহায্য করা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি ধর্ষণ করেছে। মেয়েটি সাহায্য চেয়েও পায়নি। উপরন্ত তাকে কৈফিয়ত দিতে হয়েছে সমাজের কাছে তিনি কেন ঐ সময় একা ঐ এলাকায় গিয়েছিলেন। তাকে ঐ ভয়ঙ্কর, নির্মম ঘটনাটি বারংবার বলতে হয়েছে বিচার পাবার জন্য। মানসিক যন্ত্রণা তিনি কম সহ্য করেননি। বাহবা দিতে হয় সে নারীকে যিনি ভেঙ্গে পড়েননি। কেনইবা ভেঙ্গে পড়বেন? নারীরা ভেঙ্গে পড়ার জন্য এমন লড়াইয়ে নামেননি। সাহস রেখে এগিয়ে যেতে হবে। বলছিলেন কলকাতার অধ্যাপক পল্লব মুখার্জি। তিনি বলছিলেন ধর্ষণের পেছনে যে মানসিকতা কাজ করে তা হচ্ছে অপর পক্ষের মনোবল ভেঙ্গে দেওয়া। নারীকে অপর পক্ষ ভাবার প্রবণতাকে পরিবর্তন করতে হবে। তাদের কে প্রাপ্য সম্মান দিতে হবে।

চন্দন দাস নির্ভয়া ধর্ষণ মামলা সম্পর্কে বলেন, মামলা নিস্পত্তি করতে অনেক সময় পার হয়ে গেছে। তার মতে আরও আগে বিচার হওয়া উচিৎ ছিলো। তিনি বলেন বহু বছর ধরে অন্যান্য দেশে ধর্ষণের শাস্তি সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে বলবত আছে তাহলে এদেশে কেন নয়।

পশ্চিমবঙ্গের সিদ্ধার্থ ভট্টাচার্য বলেন, যে হারে বাড়ছে ধর্ষণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাহায্য ছাড়া এই অপরাধ হ্রাস করার কোনো উপায় নেই। তবে আমাদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং যতদিন না মানুষের মধ্যে অন্তরাত্মা জেগে উঠবে ততদিন এই অপরাধ কমবে বলে মনে হয়না।


সবার মন্তব্য শোনার পর আমি কথা বলেছি বাংলাদেশের সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, ট্র্যান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের চেয়ারপার্সন, মানবাধিকারকর্মী আইনজীবী এডভোকেট সুলতানা কামালের সঙ্গে। তার কাছে জানতে চেয়েছি ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ শাস্তির কতটুকু যথাযথ। তিনি বলেন, এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে বলতে হয় ফাঁসির মাধ্যমে অপরাধ নির্মূল করা যায় এমন অভিজ্ঞতা আমাদের নেই। যারা অপরাধ বিজ্ঞান নিয়ে কাজ করেন তারাও নিশ্চিত করে বলতে পারবেন না যে ফাঁসি দিলেই অপরাধ নির্মূল হয়ে যাবে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কথা বলতে গেলে বলতে হয় এমন শাস্তি দেয়া প্রয়োজন যাতে মানুষ মনে রাখে যে সে অপরাধ করলে ফলাফল ভোগ করতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, এমন একটি পৃথিবী এমন একটি পরিবেশ প্রয়োজন নারীদের ক্ষেত্রে যাতে তারা বাইরে নির্দ্বিধায় বেরোতে পারে। কাজকর্ম কোন বাধা বিপত্তি ছাড়া করতে পারবে।

WV rape
please wait
Embed

No media source currently available

0:00 0:12:24 0:00

XS
SM
MD
LG