ভারতের মুসলিম নারী সাংবাদিকেরা তাদের প্রতি ক্রমাগত হুমকির নিন্দা করেছেন

ভারতীয় সাংবাদিক রানা আইয়ুব দিল্লীতে এক অনুষ্ঠানে তার বই গুজরাট ফাইল নিয়ে কথা বলছেন। (ফাইল ছবি- চন্দন খান্না/ এএফপি)

বুল্লি বাই নামের একটি অ্যাপে আরশি কুরেশিকে “নিলাম” করা হয়েছিল। ওই অ্যাপে বহু মুসলিম নারী ও মেয়েদের “বিক্রয়ের” বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছিল। দেশজুড়ে ব্যাপক নিন্দার মুখে অ্যাপটি বন্ধ করা হলেও কুরেশির বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও অনলাইনে ট্রোলিং বন্ধ হয়নি।

“আমি শাসকশ্রেণির সমালোচনা করে একটি টুইট বা পোস্ট করলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই আমাকে অপদস্থ করা হয়”, কোরেশি ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন।

একজন সাংবাদিক হিসেবে কুরেশি বলেন, তার দেশ ভারতের জন্য ক্ষতিকর সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাগুলোর বিষয়ে প্রতিবেদন করা তার কাজ। কুরেশির মতে দিন দিন সেই কাজটি কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

“আমি বুঝতে পেরেছি আমার চুপ থাকলে চলবে না। তারা এটাই চায়। তারা মুসলিম নারীদের কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে চায়”, তিনি বলেন।

কুরেশির ঘটনাই একমাত্র নয়।

এই সপ্তাহে, জাতিসংঘ-নিযুক্ত স্বাধীন অধিকার বিশেষজ্ঞরা ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে একজন বিশিষ্ট মুসলিম সাংবাদিকের বিরুদ্ধে পদ্ধতিগত হয়রানি বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে একটি বিবৃতি জারি করেছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সাংবাদিক রানা আইয়ুবের বিরুদ্ধে অনলাইনে ক্রমাগত নারীবিদ্বেষী ও সাম্প্রদায়িক হামলার তদন্ত করতে হবে এবং তার বিরুদ্ধে বিচারিক হয়রানির অবসান ঘটাতে হবে।”

নারীর অধিকার, সরকারের জবাবদিহিতা এবং ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের জন্য আইয়ুবকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

“তারা আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের প্রতিবেদন, আমাদের মতামতকে তুচ্ছজ্ঞান করে, কিন্তু একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার জন্য তাদের প্রিয় উপস্থাপক, প্রাইম টাইম শো, টুইটার, ডানপন্থী ইকোসিস্টেম, প্রোপাগান্ডা ওয়েবসাইট এবং নেতা সবাইকে নিযুক্ত করেছে”, আইয়ুব মঙ্গলবার (২২ ফেব্রুয়ারি) টুইটারে লিখেছেন।

তোপের মুখে গণমাধ্যম

গত কয়েক বছরে, ভারত বিশ্বে সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক ও বিধিনিষেধযুক্ত দেশগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে স্থান পেয়েছে।

২০২১ সালে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নিহত ২৭ সাংবাদিকের মধ্যে সরকারি হিসাবে পাঁচটি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে ভারতে, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) জানিয়েছে।

দেশটির ধর্মনিরপেক্ষ এবং গণতান্ত্রিক মর্যাদা থাকা সত্ত্বেও, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) ২০২১ ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারত ১৪২তম স্থানে রয়েছে। এই সুচকে মিয়ানমার ও পাকিস্তান ভারতের থেকে এগিয়ে রয়েছে।

“২০১৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি নিরঙ্কুশ ভোটে জেতার পর থেকে গণমাধ্যমগুলোর ওপর হিন্দু জাতীয়তাবাদী সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন প্রদর্শনের চাপ বেড়েছে”, জানায় আরএসএফ৷

ক্রমবর্ধমান জন হয়রানির সম্মুখীন হওয়ার পাশাপাশি, মুসলিম সাংবাদিকেরা, বিশেষ করে নারীরা তাদের কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।

“এমনকি বৃহৎ ভারতীয় সংবাদ সংস্থাগুলোর মধ্যেও মুসলিম সাংবাদিকদের সামনে একটি সূক্ষ্ম দেয়াল তুলে দেওয়া হচ্ছে…অনেক বড় প্রকাশনায় কাজ করেও তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন”, সিপিজের এশিয়া প্রোগ্রাম সমন্বয়কারী স্টিভেন বাটলার ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন।

ভারতে মুক্ত গণমাধ্যম যে ধরনের ঝুঁকির সম্মুখীন হচ্ছে সেগুলো দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও দুর্বল করে দিচ্ছে।

“সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ব্যতীত গণতন্ত্র অর্জন সম্ভব নয়”, বলেন বাটলার।

সংখ্যাগরিষ্ঠের রাজনীতি

ভারত হলো বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল গণতন্ত্র, এবং এর ১ দশমিক ৪ বিলিয়ন জনসংখ্যার প্রায় ১৪ শতাংশ মুসলিম। কিন্তু মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর মতে দেশটি ক্রমাগত অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছে এবং তাদেরকেও কখনো কখনো হুমকি দিচ্ছে৷

এই গোষ্ঠীগুলো হিন্দু এবং মুসলিমদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য মোদিসহ ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) দায়ী করে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের একজন জ্যেষ্ঠ গবেষক জয়শ্রী বাজোরিয়া ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেছেন, “কেন্দ্রীয় ও রাজ্য উভয় স্তরেই বিজেপি সরকার এমন আইন ও নীতি গ্রহণ করেছে, যা সংখ্যালঘু ও দুর্বল সম্প্রদায়ের, বিশেষ করে মুসলমানদের প্রতি বৈষম্য সৃষ্টি করে।”

সবচেয়ে জনবহুল রাজ্য, উত্তরপ্রদেশসহ সাতটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে লাখ লাখ ভারতীয় ভোট দিয়েছেন। কিছু হিন্দু উগ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী রাজনৈতিক লাভের জন্য ধর্মীয় অনুভূতিকে উস্কে দিয়েছে বলে জানা যায়।

সাম্প্রতিক সময়ে, বিজেপির রাজনৈতিক সমাবেশে বক্তারা মুসলমানদের লক্ষ্য করে ব্যাপক হুমকি দিয়েছেন এবং কিছু দলের নেতারা মুসলমানদের সন্ত্রাসী হিসেবে অভিহিত করেছেন।

এ ছাড়া সম্প্রতি একটি নতুন আইনে মুসলিম মেয়েদের শিক্ষাকেন্দ্রে হিজাব পরা নিষিদ্ধ করার ফলে দক্ষিণ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যে বিক্ষোভ ও স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়।

হিজাব নিষেধাজ্ঞা হলো “ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ক্রমাগত মুসলমানদের কোণঠাসা করতে চাওয়া এবং তাদেরকে সর্বোচ্চ সহিংসতার মুখোমুখি করার সাম্প্রতিক দৃষ্টান্ত”, বাজোরিয়া বলেন।

সাংবাদিক কুরেশির কাছে হিজাবের লড়াই শুধু ধর্মীয় নয়।

“হিজাবি মুসলিম নারীরা তাদের সাংবিধানিক অধিকারের জন্য লড়াই করছে—যে অধিকারগুলো একটি গণতান্ত্রিক দেশে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে”, তিনি ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেছেন৷

যদিও মোদি ভারতীয় মুসলমানদের বিষয়ে তার দলের নীতির বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেননি, তিনি এই মাসে একটি নির্বাচনী সমাবেশে তার প্রতি মুসলিম নারীদের আশীর্বাদ রয়েছে বলে দাবি করেন।

ভারতীয় গণমাধ্যমে মোদীকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, “আমরা তিন তালাকের (তালাক) অত্যাচার থেকে মুসলিম বোনদের মুক্ত করেছি। যখন মুসলিম বোনেরা বিজেপিকে প্রকাশ্যে সমর্থন করতে শুরু করে, তখন এই ভোট ব্যবসায়ীরা অস্বস্তিতে পড়ে। তারা মুসলিম কন্যাদের সমৃদ্ধি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে। আমাদের সরকার মুসলিম নারীদের পাশে দাঁড়িয়েছে।”