বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালীতে ডিবি পুলিশের (গোয়েন্দা পুলিশ) পরিচয় দিয়ে তিন জন মাদরাসা শিক্ষকসহ পাঁচ জনকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় বৃহস্পতিবার (২৫ আগস্ট) কুমারখালী থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন দুই ভুক্তভোগীর স্বজনরা।
গত বুধবার দিবাগত রাত ১১টা থেকে ১টার মধ্যে উপজেলার যদুবয়রা, পান্টি, বাগুলাট ও জগন্নাথপুর ইউনিয়ন এলাকা থেকে তাদের তুলে নেয়া হয়।
নিখোঁজ শিক্ষকরা হলেন; উপজেলার বাগুলাট ইউনিয়নের বাঁশগ্রামের মৃত সালাউদ্দিনের ছেলে ও বাঁশগ্রাম কামিল মাদরাসার শিক্ষক মো. আইয়ুব আলী (৩৫), পান্টি ইউনিয়নের ওয়াসী গ্রামের মৃত লিয়াকত আলীর ছেলে ও শৈলকুপা মাদাসার আইসিটি বিষয়ক শিক্ষক মো. মোস্তফা রাশেদ পান্না (৪৭) এবং যদুবয়রা ইউনিয়নেরর বহলবাড়িয়া গ্রামের মো. আলতাফ হোসেনের ছেলে ও লক্ষ্মীপুর মসজিদের ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদ ভিত্তিক শিশু শিক্ষা কার্যক্রমের শিক্ষক মো. হাফিজুল রহমান (২৬)।
নিখোঁজ অপর দুজন হলেন; জগন্নাথপুর ইউনিয়নের বেতবাড়িয়া গ্রামের মো. আব্দুল জলিলের ছেলে মো. হাসান আলী (৩৫) এবং মহেন্দ্রপুর গ্রামের মৃত আমজেদ আলীর ছেলে মো. হান্নান (৩০)।
এলাকাবাসী ও স্বজনরা জানান, “নিখোঁজ ব্যক্তিরা সবাই এসবিএসএল নামের একটি অনলাইন ভিত্তিক (এমএলএম) ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এই অনলাইন ব্যবসায়, তাদের প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন উপজেলার চাঁদপুর ইউনিয়নের গোবরা গ্রামের মো. তফসের হোসেনের ছেলে মো. ইমরান হোসেন (তুষার)। তুষারের কার্যালয় ছিল পান্টি বাজার এলাকার নৌশের মোড়ে। গত ছয় মাস আগে এসবিএসএল কোম্পানি গ্রাহকের টাকা নিয়ে হওয়া হয়ে যায়। সেই থেকে তুষার পলাতক।”
এ বিষয়ে নিখোঁজ হাফিজুলের চাচা তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, “বুধবার রাত ১১টার দিকে ১২ জন লোক বাড়িতে এসে হাফিজকে ডাকাডাকি করে। হাফিজ বাইরে গেলে তারা ডিবি পুলিশ পরিচয় দিয়ে তাকে তুলে নিয়ে যায়। এ ব্যাপারে থানায় জিডি আকারে অভিযোগ দিয়েছি।”
নিখোঁজ আইয়ুব আলীর স্বজন, বাগুলাট ইউনিয়ন পরিষদের ৫নং ওয়ার্ড সদস্য জানান, “বুধবার রাতে ডিবি পুলিশের পরিচয় দিয়ে আইয়ুবকে তুলে নিয়ে গেছে। কুমারখালী থানায় খোঁজ নিয়েও কিছু জানতে পারিনি। পরে থানায় জিডি করেছি।”
কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুজ্জামান তালুকদার জানান, “হেডকোয়ার্টার সূত্রে জানা গেছে রাতে র্যাবের একটি টিম অভিযান চালিয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকায় তারা কয়েকজনকে আটক করে নিয়ে গেছে।”
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও র্যাব
উল্লেখ্য, গত বছরের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ও পররাষ্ট্র দপ্তর পৃথকভাবে এই নিষেধাজ্ঞা দেয়। এই কর্মকর্তাদের মধ্যে র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক এবং বাংলাদেশ পুলিশের বর্তমান আইজিপি বেনজীর আহমেদও রয়েছেন। এরই মধ্যে তার আমেরিকান ভিসাও বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া র্যাবের বর্তমান মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) খান মোহাম্মদ আজাদ, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) তোফায়েল মোস্তাফা সরোয়ার, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) মো. জাহাঙ্গীর আলম ও সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) মো. আনোয়ার লতিফ খানের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর পৃথক এক ঘোষণায় বেনজীর আহমেদ এবং র্যাব ৭–এর সাবেক অধিনায়ক মিফতাহ উদ্দীন আহমেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), মাদক দ্রব্যের বিরুদ্ধে সরকারের লড়াইয়ে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত। এতে বলা হয়েছে যে, তারা আইনের শাসন, মানবাধিকারের মর্যাদা ও মৌলিক স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশের জনগণের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে ক্ষুণ্ন করে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থের বিরুদ্ধে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। র্যাব হচ্ছে ২০০৪ সালে গঠিত একটি সম্মিলিত টাস্ক ফোর্স। তাদের কাজের মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধীদের কর্মকান্ড সম্পর্কে গোপন তথ্য সংগ্রহ এবং সরকারের নির্দেশে তদন্ত পরিচালনা করা।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বা এনজিওদের অভিযোগ হচ্ছে যে, র্যাব ও বাংলাদেশের অন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, ২০০৯ সাল থেকে ৬০০ ব্যক্তির গুম হয়ে যাওয়া এবং ২০১৮ সাল থেকে বিচার বহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের জন্য দায়ী। কোনো কোনো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, এই সব ঘটনার শিকার হচ্ছে বিরোধী দলের সদস্য, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা।