মানবাধিকারের প্রচার ও সুরক্ষা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোটিয়ার ইয়ান ফ্রাই বলেছেন, “বাংলাদেশের মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে পুনরুদ্ধার করতে সহায়তা করার জন্য, আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে প্রধান গ্রিনহাউস নির্গমনকারী দেশগুলোর স্পষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে।”
বৃহস্পতিবার (১৫ সেপ্টেম্বর) এই জাতিসংঘ র্যাপোটিয়ার বলেছেন, “বাংলাদেশকে একা জলবায়ু পরিবর্তনের ভার বহন করতে হবে না।” জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পর্যবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশে তার ১০ দিনের সফর শেষে এক বিবৃতিতে ইয়ান ফ্রাই এ কথা বলেন।
তিনি চরম আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাব থেকে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি পুনরুদ্ধারের জন্য একটি আন্তর্জাতিক তহবিলের আহ্বান জানিয়েছেন। ইয়ান ফ্রাই বাংলাদেশের সবচেয়ে খারাপভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কিছু অঞ্চল পরিদর্শন করেছেন। তিনি বলেছেন যে জলবায়ু পরিবর্তনের বোঝা বাংলাদেশের একা বহন করা উচিত নয়।
জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোটিয়ার বলেন, “দীর্ঘ সময় ধরে প্রধান কার্বন নির্গমনকারী দেশগুলো তাদের (ক্ষতিগ্রস্তদের) কষ্টের জন্য নিজেদের দায় অস্বীকার করেছে। এটি অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত।”
বিবৃতিতে ইয়ান ফ্রাই বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলোর পুনরুদ্ধারের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবিলম্বে একটি ক্ষতি ও ক্ষয়ক্ষতি সংক্রান্ত তহবিল গঠন করতে হবে।”
তিনি বলেন, “নারীরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের একটি বিশাল বোঝা বহন করে। পরিস্কার পানি আনার জন্য তাদের দীর্ঘ দূরত্বে হাঁটতে হয়।ফলে তারা যৌন হয়রানির ঝুঁকিতে পড়ে এবং তাদের শিশুর যত্ন ও কৃষিকাজ থেকে দূরে থাকতে হয়।”
ইয়ান ফ্রাই তার বিবৃতিতে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেটের আকস্মিক বন্যায়, নারীরা গবাদিপশু, ফসল ও সঞ্চিত ফসল হারিয়েছে। এগুলো পুরোপুরি পুনরুদ্ধার করতে ভুক্তভোগীদের কমপক্ষে দুই বছর সময় লাগবে।
জাতিসংঘের এই বিশেষজ্ঞ তার সফরের সময় আদিবাসীদের সঙ্গে অনলাইনে বৈঠক করেছেন। আদিবাসীরা তাদের ভবিষ্যত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোটিয়ারকে জানিয়েছেন, আদিবাসী এলাকার গাছ কেটে ফেলার ফলে ঐতিহ্যবাহী জীবিকা ধ্বংস হচ্ছে এবং মিঠা পানি, খাদ্য ও ওষুধ খুঁজে পাওয়া কঠিন করে তুলছে।
জাতিসংঘের বিশেষ র্যাপোটিয়ার ইয়ান ফ্রাই বলেন, “গাছ কাটা হলো, বন উজাড় ও বন অবক্ষয় কমাতে বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া নিজস্ব কর্মসূচির লঙ্ঘন। আর, সরকার অস্বীকার করে যে, এই সম্প্রদায়গুলো আদিবাসী। তাই তাদের দুর্দশা উপেক্ষা করা হচ্ছে।”
ফ্রাই বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে স্থানান্তরের বিষয়টি আমার জন্য গভীরভাবে উদ্বেগজনক ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট সমস্যায় ভুগছেন এমন কয়েক লাখ মানুষ অন্যান্য সুযোগের সন্ধানে শহরে চলে যাচ্ছে। অবশ্যই এই মানুষগুলো প্রধান শহরগুলোর বস্তি এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নেয়, সেখানে তাদের মৌলিক অধিকার অস্বীকার করা হচ্ছে।”
ইয়ান ফ্রাই জানান, তিনি জানতে পেরেছেন যে, শহুরে বস্তিতে শিশুদের অবস্থা ভয়াবহ। তারা অপুষ্টি, স্কুল থেকে ঝড়ে পড়া, বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রম ও নির্যাতনের উচ্চ হারের শিকার হয়।
ফ্রাই আরও জানিয়েছেন, “ আমি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করেছি। তারা দাবি করেছেন, তারা নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য সরকার দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছেন। সরকার জলবায়ু কর্মীদের কণ্ঠস্বর দমন করতে ডিজিটাল সুরক্ষা আইন ব্যবহার করছে বলে মনে হচ্ছে।”
ইয়ান ফ্রাই ২০২২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন। যাতে জলবায়ু পরিবর্তন প্রশমন, ক্ষয়ক্ষতি, ক্ষতি ও অংশগ্রহণের প্রেক্ষাপটে মানবাধিকারের প্রচার ও সুরক্ষার ব্যাপারে আহ্বান জানানো হবে। তার বাংলাদেশ সফরের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন ২০২৩ সালের জুনে মানবাধিকার কাউন্সিলে পেশ করা হবে।