বাংলাদেশের বৃহত্তর যশোরের প্রান্তর ঢেকে আছে হলুদ গালিচায়। সরিষা ফুলের সৌরভ আর নয়ন কাড়া হলুদ রঙে ভরে আছে দিগন্ত বিস্তৃত মাঠ। যেদিকে চোখ যায়, যেন ফুলে ঢাকা সাগর। সেখানে খেলা করে সোনাঝরা শীতের রোদ। কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে যশোরাঞ্চলে রেকর্ড পরিমাণ রবি ফসলের আবাদ হয়েছে। আর বেশিরভাগ জাততে সরিষা আবাদ হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে যশোরাঞ্চলের আওতাভুক্ত ছয় জেলা; যশোর, মাগুরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুরে রেকর্ড পরিমাণ জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে। এই ছয় জেলায় ৫৪ হাজার ৯০ হেক্টর জমিতে সরিষার আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। আবাদ হয়েছে ৭২ হাজার ৯২৫ হেক্টর জমিতে।
যশোর জেলায় লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদের। আবাদ হয়েছে প্রায় দ্বিগুন জমিতে, জমির পরিমাণ ২৪ হাজার ৮৪৮ হেক্টর। এ ছাড়া ঝিনাইদহে ৯ হাজার ৭৭৭ হেক্টরের বিপরীতে চাষ হয়েছে ১১ হাজার ১১২ হেক্টর, মাগুরায় ১৫ হাজার হেক্টরের বিপরীতে ১৬ হাজার ৩৫৫ হেক্টর, কুষ্টিয়ায় ৯ হাজার ১৫০ হেক্টরের বিপরীতে ১১ হাজার ৬৪৫ হেক্টর, চুয়াডাঙ্গায় ২ হাজার ৮০০ হেক্টরের বিপরীতে তিন হাজার ১৩৫ হেক্টর ও মেহেরপুর জেলায় চার হাজার ৩৭০ হেক্টরের বিপরীতে পাঁচ হাজার ৮৩০ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে।
কৃষি বিভাগ বলছে, আগের কয়েক বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম সরিষা আবাদ হলেও, এবছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১৮ হাজার ৮৩৫ হেক্টর বেশি জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে। সরিষা আবাদের জন্য আবহাওয়া ভালো হওয়ায় কৃষকরাও বেশ আশান্বিত।
যশোর সদর উপজেলার সুলতানপুর মাঠে কথা হয় কৃষক আবু বক্কারের সঙ্গে। তিনি জানান যে এবার তাদের মাঠে ১৭০ বিঘা জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে। এসব খেতে টরি-৭ ও টরি-১৪ নামের উন্নত জাতের সরিষার দু’টি জাত আবাদ হয়েছে। তিনি আরও বলেন, “এবছর সরিষা চাষের জন্য আবহাওয়া অনুকূল। সরিষার বীজ বপণের সময় প্রয়োজনী বৃষ্টি পাওয়ায় কোনো সমস্যা হয়নি। ফুল ও ফল আসা পর্যন্ত কোনো বড় ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায়, এবছর ভালো ফলন হবে।”
একই মাঠে কথা হয় হেমায়েত ও ইদ্রিস আলী সঙ্গে। তারা জানান, এ বছর সয়াবিনসহ যাবতীয় ভোজ্য তেলের দাম দ্বিগুণেরও বেশি হওয়ায়, অধিকাংশ কৃষক সরিষা আবাদের প্রতি ঝুঁকেছেন। ধান চাষে কখনও লাভ কখনও লোকসান হয়। সরিষা আবাদ করে লাভবান হবে বলে ধারণা করছেন তারা।
সরিষা চাষে খরচ কম লাভ বেশি। এক বিঘা জমিতে বীজ, সার, সেচ ও মাড়াই করে বাজারে তোলা পর্যন্ত খরচ হয় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা। এক বিঘা জমিতে সরিষার ফলন হয় চার থেকে পাঁচ মণ। প্রতিমণ সরিষা বাজারে পাঁচ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
কৃষক হাবিবুর রহমান জানান, সরিষা আবাদের পাশাপাশি একই মৌসুমে কৃষক আমন ও বোরো আবাদ করে বাড়তি মুনাফা পাচ্ছে। সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবে বিভিন্ন সবজির আবাদ করেও তারা লাভ হচ্ছেন। তিনি বলেন, “আমাদের এলাকায় অনেক কৃষক এখন ধান আবাদের পাশাপাশি সরিষা আবাদ করে দ্বিগুণ লাভ করছেন।”
এ বিষয়ে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মঞ্জুরুল হক বলেন, “চলতি মৌসুমে যশোরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১১ হাজার ৮৪৮ হেক্টর বেশি জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে। যা কৃষি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক।” তিনি বলেন, “জমির উর্বরতা ধরে রাখাতে, শস্য নিবিড়তার জন্য কৃষককে সরিষা আবাদে উৎসাহিত করা হচ্ছে। কারণ সরিষা আবাদ করে একই জমিতে সহজেই তিন ফসলের চাষ করা সম্ভব।” এজন্য অধিকাংশ কৃষককে সরিষা আবাদের জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যশোরাঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, “সরকার ভোজ্য তেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে রবি ফসলের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এজন্য যশোরসহ দক্ষিনাঞ্চলের জেলাগুলোতে অন্য ফসলের সঙ্গে সরিষা আবাদের চাষির সংখ্যা বাড়ছে। এবছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায়, সরিষার ভালো ফলন হবে বলে তিনি আশা করছেন।