মৌসুমী ফলের সাতকাহন 

কারওয়ান বাজারে নানান মৌসুমি ফলের সমাহার।

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কারওয়ান বাজারে ফলের দরদাম করছিলেন রকিবুল ইসলাম। বললেন, “আম ও লিচু কিনতে এসেছি। ফলের দাম একটু বেশি তবু মৌসুমের ফল তো অন্য সময় পাওয়া যাবে না, তাছাড়া বাজারে বেশিদিন থাকেও না। তাই বেশি দাম হলেও পরিবারের জন্য কিনছি।”

মূলত মৌসুমী সব সুস্বাদু, রসালো, পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ফলের দেখা একসাথে পাওয়া যায় বলেই জ্যৈষ্ঠ মাসকে বাংলা ক্যালেন্ডারে মধু মাস বলা হয়। গ্রীষ্মকালের ভ্যাপসা আবহাওয়া ও প্রচন্ড গরমে ক্লান্ত শরীরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেলের উৎস যোগায় এই ফলগুলো। শরীরকে ঠান্ডা করে, শারীরিক শক্তি যোগায়। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, এই মৌসুমের বিভিন্ন অসুখ-বিসুখ যেমন: জ্বর, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ইত্যাদিতে প্রাকৃতিক প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে মৌসুমী ফলগুলো। নিয়মিত কোনো না কোনো মৌসুমী ফল খেলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। গ্রীষ্মের সব রসালো ফল এখন বাজার দখল করে আছে। ঢাকার কারওয়ান বাজার, হাতির পুল বাজার, মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, মোহাম্মদপুর টাউনহল মার্কেট, মিরপুর ১০ নম্বরের ফলের বাজারে ঘুরে দেখা মিলল নানান জাতের আম, কাঁঠাল, জাম, আনারস, তালের শাঁস, লিচু, জামরুল, লটকনসহ নানা দেশি ফল। ফল কিনতে ক্রেতাদের সমাগম বাড়ছে তাই এই সব বাজারে ফল বিক্রেতারা ভীষণ ব্যস্ত।

দরদাম

বাজার ভেদে ফলের দাম কিছুটা কম-বেশি হয়ে থাকে। আমের মধ্যে এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে মূলত হিমসাগর ও ল্যাংড়া আম। বিক্রেতারা জানালেন, আর কিছুদিনের মধ্যেই বাজারে আসবে আম্রপালি, হাড়িভাঙ্গাসহ অন্যান্য জাতের আম। হিমসাগর আম প্রতি কেজি ৬০ টাকা থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। ল্যাংড়া আম বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৭০ টাকা থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত। লিচুর মধ্যে উঠেছে বোম্বে, মাদ্রাজি ও চায়না থ্রি লিচু। বেদানা লিচু উঠবে আর কিছু দিন পরে। কারওয়ান বাজারের বিক্রেতারা জানালেন, এবার লিচুর দাম আগের মতোই আছে। বোম্বে ও মাদ্রাজি জাতের প্রতি একশ লিচু ৩৫০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা, চায়না থ্রি লিচু ৬০০ টাকা থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কাঠালের দাম আকৃতি ভেদে ১৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকা। সিজনের শুরু বিধায় দাম একটু বেশি বলে জানালেন বিক্রেতারা। আনারস প্রতিটি ৩০ টাকা থেকে ৬০ টাকা, তালের শাস বিক্রি হচ্ছে প্রতি তাল ২৫ টাকা থেকে ৩০ টাকা, জাম বিক্রি হচ্ছে জাত ভেদে ২০০ টাকা থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত।

বাংলাদেশে ফল উৎপাদনের বর্তমান অবস্থা

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রচলিত, অপ্রচলিত ও সম্ভাবনাময় বিদেশী ফলসহ প্রায় ৭৮টি ফলের চাষাবাদ করা হয়। তারমধ্যে দশ থেকে বারোটি প্রধান উৎপাদিত ফল। দশটি জেলায় সবচেয়ে বেশি ফল উৎপাদিত হয়। জেলাগুলো হলো দিনাজপুর, টাঙ্গাইল, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, চাঁপাই নবাবগঞ্জ, নাটোর, চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি এবং ঝিনাইদহ। ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট ফলের চাহিদা প্রায় ১১৬.৮০ লক্ষ মেট্রিক টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানাচ্ছে, বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকার ফলের চাষাবাদ হলেও মোট উৎপাদনের সিংহভাগ (৭৭%) আম, কলা, কাঁঠাল, তরমুজ, পেয়ারা এবং আনারস এই ছয় প্রজাতির ফল থেকে আসে ।

২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে প্রায় ৭ লাখ ২৯ হাজার হেক্টর জমিতে প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ মেট্রিক টন ফল উৎপাদিত হয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর কৃষিপরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২১ অনুসারে, ২০২০-২১ অর্থবছরে বাংলাদেশে আম চাষাবাদের আওতাধীন জমির পরিমাণ প্রায় ২ লক্ষ ৮৬ হাজার একর এবং উৎপাদন ১২ লাখ মেট্রিক টনের বেশি।

জাতিসংঘের এফএও (ফুড এন্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন)-এর তথ্য মতে বাংলাদেশে ১৮ বছর ধরে গড়ে ১১.৫ শতাংশ হারে ফল উৎপাদন বেড়েছে। জাতীয় অর্থনীতিতে মোট ফসলভিত্তিক আয়ের ১০ শতাংশ ফল থেকে আসে তবে দেশে চাষযোগ্য জমির মধ্যে ফলের আওতায় আছে মাত্র ১-২ শতাংশ জমি।

ফল উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান

লিচু ২য়, কাঁঠাল ২য়, আম ৭ম, পেয়ারা ৮ম, পেঁপে ১৪তম।

ফল রপ্তানী

বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে ফলমূল রপ্তানি করে ০.৫৮ মিলিয়ন ডলার আয় হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশে ফল রপ্তানি হলেও যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন এবং ওমান উল্লেখযোগ্য। রপ্তানিকৃত উল্লেখযোগ্য ফলগুলো হল- কাঁঠাল, আম, আনারস, আমড়া, জলপাই, পেয়ারা, বেল, কদবেল, আমলকী, বাতাবি লেবু, জারা লেবু, এলাচি লেবু, সাতকরা, লটকন, কামরাঙা, তেঁতুল ও চালতা। প্রবাসী বাংলাদেশী, পাকিস্তানি এবং ভারতীয় বংশোদ্ভুত অভিবাসীদের মাঝে বাংলাদেশী টাটকা ফলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে আকর্ষণীয় রঙ, সমআকার, আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং ব্যবহার করা হয় বলে থাইল্যান্ড, ভারত, পাকিস্তান, ফিলিপাইন, চীন ও আফ্রিকান দেশগুলোর ফলের চাহিদা তুলনামূলকভাবে বেশি।

ফলের চাহিদা ও পুষ্টিগুণ

একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির দৈনিক গড়ে ২০০ গ্রাম ফল খাওয়া প্রয়োজন। তবে ফলের এ চাহিদা এখনও পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে ২০০৬ সালে মাথাপিছু ফল গ্রহণের হার ছিলো ৫৫ গ্রাম, যা ২০১৮ সালে ৮৫ গ্রামে উন্নীত হয়েছে।

এ মৌসুমের প্রধান কিছু ফলের মধ্যে আছে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, আনারস, তাল ইত্যাদি। এ সময়ের কিছু ফলের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন পুষ্টিবিদ তামান্না চৌধুরী।

আমের পুষ্টিগুণ

-আমে প্রচুর পরিমানে ভিটামিন এ (বিটা ক্যারোটিন),ভিটামিন বি৬, প্রচুর পরিমাণ খনিজ লবন, ভিটামিন সি, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, গ্লুকোজ রয়েছে।

- আমের জাত ও আকার অনুযায়ি এর ক্যালরি কম বেশি হয়। যেমন ফজলি আম আকারে বড় তাই প্রতি আম অনুযায়ি ক্যালরি বেশি।

বাজারে আমের মেলা

-আম ত্বক সুন্দর রাখে। খসখসে চামড়াকে মসৃন করে।

-আমের বিটা ক্যারোটিন আমাদের চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এবং অনেক ধরণের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়।

-হজমে সহায়তা করে।

-এতে উপস্থিত ফাইবার রক্তের কোলেস্টরল কমায়।

-আমের ক্যালরি অনেক বেশি তাই অতিরিক্ত আম খেলে ওজন বাড়ে।

-শিশু, বৃদ্ধ ও গর্ভবতী মায়েদের জন্য পাকা আম খুব ভালো।

-কাঁচা আম ওজন নিয়ন্ত্রনে সাহায্য করে।

-কাঁচা আমে অ্যান্টি অক্সিডেন্ট রয়েছে।

-কাঁচা আমের জুস শরীরকে ঠান্ডা করে, প্রচন্ড গরম আবহাওয়ায় হিট স্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন থেকে প্রতিকার ও প্রতিরোধ করে।

আনারসের পুষ্টিগুণ

-আনারসে একধরনের এনজাইম আছে যার ফলে আনারস ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে।

-জ্বর, সর্দি-কাশি, গলা ব্যথা কমানোয় কার্যকর।

-প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এ, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, পটাসিয়াম, ফসফরাস আছে। এ উপাদানগুলো শরীরের পুষ্টির অভাব পূরণে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

কারওয়ান বাজারের ফল ব্যবসায়ীরা নানান মৌসুমি ফলের পসার সাজিয়ে বসে আছেন।

-আনারসে প্রচুর ফাইবার আছে।

-আনারস ওজন কমাতে সাহায্য করে।

-এতে বিদ্যমান খনিজ হাড় গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

-দাঁত ও মাড়ির সুরক্ষা করে।

-চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। ম্যাক্যুলার ডিগ্রেডেশন নামক রোগ হওয়া থেকে রক্ষা করে যে রোগে চোখের রেটিনা নষ্ট করে দেয় এবং ধীরে ধীরে অন্ধ হয়ে যায়।

কাঁঠালের পুষ্টিগুণ

-কাঁঠালে কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন আছে।

-প্রচুর ভিটামিন এ আছে যা রাতকানা রোগ প্রতিরোধ করে।

-কাঁঠালে থাকা ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস আলসার, ক্যান্সার প্রতিরোধে সক্ষম।

-কাঁঠাল উচ্চ রক্তচাপ ও বার্ধক্য দূর করে।

-কাঁঠালে ক্যালোরির পরিমাণ বেশি তাই পরিমিত খেতে হয়। বেশি খেলে হজমের সমস্যা হতে পারে।

- কাঁঠালে আছে প্রচুর ফাইবার যা বদহজম রোধ করে এবং কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে।

- চোখ ও ত্বকের জন্য অনেক উপকারী।

-কাঁঠালে বিদ্যমান ম্যাগনেসিয়াম ও ক্যালসিয়াম হাড়ের গঠনে শক্তিশালী ভুমিকা পালন করে।

-কাঁচা কাঁঠালের পুষ্টি বেশি, এতে অ্যান্টি অক্সিজেন রয়েছে। কাঁচা কাঁঠাল তরকারি হিসেবে খাওয়া হয়।

তবে দুই বছরের নিচের বাচ্চাদের কাঁঠাল খেতে না দেয়াই ভালো। কারণ এ বয়েসের শিশুদের পরিপাকতন্ত্র পরিপক্ক হয় না যার ফলে কাঁঠাল অনেকসময় হজম হয় না। এই ফলে ফ্রুকটোজ বা শর্করার মাত্রা বেশি। তাই বেশি খেলে ওজন বাড়তে পারে।

জামের পুষ্টিগুণ

-জাম প্রচুর ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ ফল। এটি রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করে।

-জাম রক্তস্বল্পতা দূর করে। রক্ত পরিস্কার করতে সাহায্য করে।

-জাম ত্বকের জন্য, দাঁতের জন্য ভালো।

-গরমকাল ও বর্ষাকালের রোগ ব্যাধি প্রতিরোধের জন্য যে পরিমান অ্যান্টি অক্সিজেন প্রয়োজন তা জাম থেকে পাওয়া যায়।

-জাম খেলে রক্তের শর্করা কমে। তাই ডায়বেটিস রোগীদের জন্য জাম খাওয়া ভালো।

-দিনের প্রথম ভাগে জাম খাওয়া ভালো। জামের সাথে অতিরিক্ত লবন, চিনি কিংবা ঝাল খাওয়া উচিত নয়। এতে পেটে গ্যাস ও এ্যাসিডিটির সমস্যা হতে পারে। পেটে ব্যথা হতে পারে।

লিচুর পুষ্টিগুণ

-লিচুতে প্রচুর ভিটামিন সি ও মিনারেল আছে।

-লিচুতে প্রচুর পানি থাকে যা শরীরকে হাইড্রেট রাখতে সাহায্য করে।

-শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। তাই গরমের সময় লিচু খেলে সর্দি ও সাধারণ ফ্লু থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

টসটসে চায়না থ্রি লিচু

- লিচু হার্ট ভালো রাখে। লিচুতে থাকে অলিগোনল যা নাইট্রিক অক্সাইড তৈরি করে। ফলে হৃদরোগ প্রতিরোধ করা সহজ হয়।

-লিচুতে থাকা ম্যাগনেসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ এবং কপার হাড়ের ক্যালসিয়াম শোষণে সাহায্য করে থাকে।

-দিনের প্রথম ভাগে সকালের দিকে লিচু খাওয়া ভালো। খালি পেটে লিচু খাওয়া ও অতিরিক্ত লিচু খেলে হাইপোগ্লসেমিয়ার সম্ভাবনা থাকে। হঠাৎ করে রক্তের শর্করা কমে যেতে পারে। লিচুর ক্যালরি আকার ও জাতের ওপর নির্ভর করে।