পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ বাড়ছে বাংলাদেশে

ঢাকায় একটি নিরাপত্তা চৌকিতে পুলিশের তল্লাশি

বাংলাদেশে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় জমছে। গত কয়েক বছরে শতাধিক পুলিশ কর্মকর্তার শাস্তি হয়েছে খুন, ধর্ষণ, অপহরণ, ছিনতাই, ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়, মিথ্যা মামলায় সাধারণ মানুষকে ফাঁসিয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন অভিযোগে। আবার পুলিশ সদর দফতরে অনেক অভিযোগ জমা পড়লে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না আইনগত জটিলতায়। বর্তমানে পুলিশ সদর দফতর শুধু কনস্টেবল থেকে ওসি পর্যন্ত ব্যবস্থা নিতে পারে। এর ওপরের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ পাঠাতে পারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। তদন্ত যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে ফৌজদারি দণ্ডবিধির আওতায় অপরাধ করলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে আইন প্রয়োগকারী সব সংস্থার। পুলিশ বিভাগের নিজস্ব রিপোর্টে দেখা গেছে, শুধু ২০১৭ সালে ১৪ হাজার ১৩৩ জন কনস্টেবল ও এএসআই’এর লঘুদণ্ড ও ৪৮৯ জনের গুরুদণ্ড হয়েছে। একই সময়ে ৩৮ জন পুলিশ পরিদর্শকের লঘুদণ্ড ও ৮ জনের গুরুদণ্ড হয়েছে। গত দুই বছর আনুষ্ঠানিকভাবে বিভাগীয় কোনো উপাত্ত পুলিশ প্রকাশ না করলেও ডিপার্টমেন্টাল শাস্তির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ফৌজদারি অপরাধে জড়িত থাকার দায়ে মামলা হয়েছে এবং বিচার চলছে। অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় পুলিশের অপরাধ কাজে অধিক হারে জড়িয়ে পড়ার জন্য দীর্ঘদিনের ঘুণে ধরা সিস্টেমকে দায়ী করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিয়া রহমান। কিছু ঘটনার পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পুলিশ বিভাগের কিছু সদস্যের সরাসরি অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়ার প্রবণতা করোনাকালে বেড়েছে। সর্বশেষ চ্যাংরাবান্দা সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে প্রবেশের অভিযোগে ভারতে বিএসএফের হাতে আটক হলেন রাজধানীর বনানী থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) শেখ সোহেল রানা। তার বিরুদ্ধে ই-কর্মাসের নামে প্রতারনার অভিযোগ ছিল। অন্যদিকে দিনাজপুরের চিরির বন্দরে মা ও ছেলেকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টাকালে রংপুর সিআইডির এএসপি সরোয়ার কবীরসহ তিনজনকে আটকের পর প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। সরোয়ারের সঙ্গে ছিলেন এএসআই হাসিনুর রহমান, কনস্টেবল আহসানুল হক ফারুক ও তাদের গাড়ির চালক। তারা অপহরণ করেন দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার লুৎফর রহমানের স্ত্রী জহুরা খাতুন ও তার ছেলে জাহাঙ্গীরকে। অপহরণের পর তাদের পরিবারের কাছে ১৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরে দিনাজপুর পুলিশের সহায়তায় অপহৃত মা ছেলেকে উদ্ধার ও অভিযুক্তদের আটক করা হয়।

ভারতে গ্রেপ্তার পুলিশ অফিসার সোহেল রানা

দিনাজপুর পুলিশের অপর এক ঘটনায় চলতি বছর ১৯ মে ফেনসিডিলসহ এএসআই শামীম নামে একজন কর্মকর্তাকে আটক করা হয়। কিছু দিন আগে ঢাকায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআইর এসপি মোক্তার হোসেনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা নেওয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আরও তিনজন নারী পুলিশ সদস্য যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন। ২০২০ সালের ৮ই নভেম্বর যাত্রাবাড়ী থানার এএসআই আজিজকে ইয়াবাসহ আটক করেছিল র‌্যাব-১০ এর সদস্যরা। স্ত্রী মিতুকে ভাড়াটিয়া খুনি দিয়ে হত্যার দায়ে এখন কারাগারে আছেন পুলিশের এসপি বাবুল আখতার। চলতি বছর ১৩ই জুন কুষ্টিয়া শহরে দিনদুপুরে তিনজনকে গুলি করে হত্যা করেন এএসআই সৌমেন মিত্র। সন্দেহের বশবর্তী হয়ে নিজের স্ত্রী, সন্তান ছাড়াও সৌমেন হত্যা করে আরেক যুবকেকে। আগস্ট মাসের শুরুতে ফেনীতে স্বর্ণ ডাকাতির মামলায় ডিবির ওসি সাইফুল ইসলাম ভুইয়াসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। পুলিশ তাদের আটক করে কারাগারে পাঠিয়েছে। ঢাকার মোহাম্মদপুর থানার একজন এসআইর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে ধর্ষণের অভিযোগে। একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাকে গুলি করে হত্যার দায়ে কক্সবাজারের ওসি প্রদীপ এখন কারাগারে। তার বিরুদ্ধে ১৮ জনকে বিনা বিচারে হত্যা বা ক্রসফায়ার করার অভিযোগ রয়েছে।

পুলিশ সদস্যরা নিজেরা কেন এভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জিয়া রহমান বলেন, ঔপনিবেশিক আমলের কাঠামো থেকে পুলিশ বাহিনী এখনো বের হতে পারেনি। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তৈরি করা যায়নি তাদের কাঠামো। ১৮৬১ সালের আইন দিয়ে পুলিশ পরিচালিত হচ্ছে। এত দিনেও কাঠামোগত সংস্কার করা যায়নি। বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে মূল সমস্যা খতিয়ে দেখতে হবে। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে আমাদের। ব্যক্তিবিশেষকে দোষারোপ করে লাভ নেই। পুরো সিস্টেমটা নিয়ে ভাবতে হবে। বিশেষ করে বিচার ব্যবস্থার বিভিন্ন ঘাট, প্রসিকিউসন, তদন্ত ব্যবস্থা আছে। বিসিএস দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ভালো অফিসার ও কাজ দেখালে হবে না, জবাববদিহিতা স্বচ্ছতা, জরুরি। মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কর্ম পরিবেশ নিয়েও ভাবতে হবে। স্থানীয় এমপি, অর্থশালীদের সঙ্গে ওসিদের একটা আঁতাতের সম্পর্ক থাকে। তারা একজন আরেকজনকে প্রটেকশন দেয়। আর সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হয়। ওসি, এসআই লেভেলে সংস্কার জরুরি বলে মনে করেন অধ্যাপক জিয়া রহমান। তিনি বলেন, তাদের বড় ধরনের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণ জরুরি। তাদের আচার ব্যবহার সম্পর্কে আরও সচেতনতা বাড়াতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। চেইন অব কমান্ডে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। উনবিংশ শতাব্দীর পুলিশ দিয়ে এই যুগে চলতে পারে না। ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ, শাস্তির ব্যবস্থা, ঘটনার শিকার ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে দ্রুততম সময়ে।

পুলিশের সাবেক আইজি ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য, সরকারী দলের এমপি নূর মোহাম্মদ বলেন, সংস্কার চলমান একটি প্রক্রিয়া। বৃহত্তর দৃষ্টিকোণ থেকে সবকিছু দেখতে হবে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে তদন্তের ক্ষেত্রে পুলিশ যাতে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা পায় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, তদন্ত পুলিশকে তাদের মতো করতে দিতে হবে। পেশাদারিত্ব বজায় রেখে তারা তা করলে সমস্যা থাকে না। তিনি বলেন, অপরাধ তদারকির দায়িত্বে কর্মকর্তাদের শৈথিল্য পেলে ব্যবস্থা নিতে হবে। দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিলে সবাই সিরিয়াসলি কাজ করবে। আস্থা ও বিশ্বাসের জায়গা হিসেবে পুলিশকে অবস্থান ধরে রাখতে হবে। মানুষের মাঝে আস্থা ও বিশ্বাস তৈরি করতে হবে। একটি থানায় ঠিকভাবে সার্ভিসটা দিল কি না, সেবা কতটুকু করছে দেখতে হবে। কাজটি ঠিকভাবে করল কি না তা মনিটর করতে হবে।

পুলিশ সদস্যদের নানা অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে যাওয়া এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রসঙ্গে আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ বলেছেন, পুলিশ সদস্যদের মধ্যে কেউ কোনো অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ইচ্ছা করলে তাদের বিরুদ্ধে আমরা বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে পারতাম। ইচ্ছা করলে ঘায়ে ব্যান্ডেজ করতে পারতাম। কিন্তুু আমরা এসবের মধ্যে নেই, এসব একেবারে ক্লিন করতে চাচ্ছি। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা দেওয়া হচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক (মিডিয়া এন্ড প্লানিং) হায়দার আলী খান বলেন, পুলিশের যে কোন ঘটনায় অভ্যন্তরীনভাবে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হয়। বাহিনীর কোন সদস্য অপরাধে জড়ালে তা বিভাগীয় এবং আইনগত দুইভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। যা সরকারের অনেক সংস্থায়ই নেই। পুলিশের কোন ঘটনাই ‘আনটাচ’ থাকে না। আইজিপি স্যার এসব ব্যাপারে খুবই সচেতন এবং কঠোর। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পুলিশ বাহিনীকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার জন্য আইজিপি মহোদয় নানা কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন। করোনা মহামারীর জন্য এসব কর্মকান্ড কিছুটা ব্যাহত হয়েছে সত্যি। তবে পুলিশের কাজ কিংবা অফিস একদিনের জন্যও বন্ধ ছিলো না। জীবনের ঝুকিঁ নিয়ে পুলিশ কাজ করেছে মানুষের জন্য। সক্ষমতা বাড়ানো, প্রেষণামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।