তালিবান নেতারা আফগানিস্তানের ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই দেশটির নারীদের জীবন কাটছে অন্দরমহলে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে তালিবানরা ধীরে ধীরে জনসম্মুখে নারীদের উপস্থিতি সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলতে চেষ্টা করছে।
তালিবানরা “নিয়মতান্ত্রিক ও বৃহৎ পরিসরে লিঙ্গ বৈষম্য এবং নির্যাতনকে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ” করছে বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার।
আগস্টে ক্ষমতা দখলের পর থেকে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে তালিবান সরকার, বিশেষ করে নারীদের ওপর। উদ্বেগ প্রকাশ করে বিশেষজ্ঞরা বলেন, “সর্বোপরি, এসব নীতিমালা নারী এবং মেয়ে শিশুদের প্রতি এক ধরনের সমষ্টিগত শাস্তি যার মূল ভিত্তি হলো লিঙ্গ বৈষম্য এবং নারী নির্যাতন”।
বেশিরভাগ নারীদের তাদের কাজে ফিরতে নিষেধ করেছে তালিবান সরকার। ট্যাক্সিচালকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে হিজাব ছাড়া কোনো নারীকে ট্যাক্সিতে পরিবহন না করতে। এছাড়াও, ৭২ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বে ভ্রমণের ক্ষেত্রে একজন পুরুষ সঙ্গী সঙ্গে রাখতে হবে এবং নারী এবং মেয়ে শিশুদের জন্য নির্ধারিত পোশাক পরে বাইরে বের হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে তারা।
“চলাচলে কড়াকড়ি নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে সঙ্গে তাদের বাকস্বাধীনতা, সরকারি বা রাজনৈতিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারও খর্ব করা হয়েছে। এসব নীতিমালা মেয়েদের বাইরে কাজ করা বা আত্মনির্ভরশীল হওয়ার রাস্তাও বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে আফগান নারীদের সার্বিক দারিদ্র্য বাড়ছে,” বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন।
গোটা আফগানিস্তানে মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো এখনো বন্ধ রয়েছে।
তালিবান নেতারা আগামী মার্চের শুরুতে আফগান নতুন বছরে মেয়েরা স্কুলে ফিরতে পারবে বলে দাবি করেছেন। তারা আরও বলেন, স্কুলে শিক্ষকদের বেতন ও মেয়েদের নিরাপত্তা এবং ইসলামিক শিক্ষাপদ্ধতির বিষয়টি নিশ্চিত করতেই কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।
“আমি নারী অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু তাদের হিজাব পরিধান করাটাও জরুরী”, তালিবান সরকারের পক্ষে জাতিসংঘে নিয়োজিত স্থায়ী প্রতিনিধি সুহেল শাহিন ভয়েস অফ আমেরিকার কাছে মন্তব্য করেছেন।
সমালোচকরা যদিও তালিবান সরকারের মেয়েদের স্কুল নিয়ে করা অঙ্গীকারের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
“তালিবান সরকারের আফগান নারীদের মৌলিক অধিকারের দাবীর জবাবে যে রুঢ় আচরণ করেছেন তাতে আমরা অত্যন্ত আশাহত হয়েছি। শান্তিপূর্ণ মিছিলে হামলা, মারপিট এবং নিরবিচারে গ্রেপ্তারের খবরে আমরা উদ্বিগ্ন”, বিশেষজ্ঞরা মত প্রকাশ করেছেন।
ক্ষমতা দখলের পর থেকে আফগান নারীরা তালিবান শাসনের বিরুদ্ধে রাস্তায় আন্দোলন করে আসছেন। গত রবিবার তালিবান পুলিশ একদল আন্দোলনকারীর উপর পেপার-স্প্রে নিক্ষেপ করে।
এসময় আন্দোলনকারীরা নারীদের প্রতি আরোপিত বিধিনিষেধ, বাধ্যতামূলক হিজাব পরিধানের বিরুদ্ধে এবং অন্য অধিকারের দাবিতে স্লোগান দেন। এসময় কয়েকজন নারী বোরকায় আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবাদ করেন।
দেশটির ধর্ম প্রচার এবং অধার্মিকতা প্রতিরোধ মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, হিজাব পরিধানের বিষয়টি ইসলামে উল্লিখিত এবং কোরআনে মেয়েদের হিজাব পরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের হিথার বার তালিবানদের এই মন্তব্যের জবাবে বলেছেন, “ মেয়েদের জীবনযাপন নিয়ন্ত্রণ করাই তালিবানদের অভিপ্রায়”।
“মনে হয় সারা দুনিয়াতে এক মাত্র তালিবানরাই ইসলামকে বোঝে এবং শ্রদ্ধা করে”, ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন বার।
১৯৯০–এর দশকে প্রথম ক্ষমতা দখলের পর তারা নারীদের ওপর নিপীড়ন চালিয়েছিল। এই নিপীড়নের কারণে বিশ্বের কোনো দেশই তালিবানদের স্বীকৃতি দিতে রাজি নয়।
অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ এবং তালিবান নেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে আফগান অর্থনীতি ভেঙ্গে পড়েছে।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বিশ্বের প্রতি আফগানিস্তানের জন্য মানবিক সাহায্যের আহবান জানিয়েছেন এবং নারী ও মেয়ে শিশুদের অধিকার আদায়ে তালিবান শাসকদের ওপর আরও চাপ প্রয়োগের দাবি করেছেন।