অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

অসহায়, ক্ষুধার্ত, মানসিক ভারসাম্যহীন এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছে তিন তরুণ বন্ধু


Food Banking

উৎসবের নিয়ন আলো আর উচ্চস্বরে চলতে থাকা গানের মূর্চ্ছনায় চাপা পড়ে কিছু ক্ষুধার্ত মানুষের কান্নার শব্দ। দূর থেকে ভেসে আসা খাবারের সুগন্ধে দিশেহারা ক্ষুধার্তদের কষ্টে কাতর হয়ে খুলনার তিন তরুণ বন্ধু শাহরিয়ার কবির মেঘ, শাহরিয়ার শাওন এবং ইমরান হোসেন মৃধা ক্ষুধার্ত মানুষের ক্ষুধার জ্বালা দূর করার পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী নেমে পড়েন তার বাস্তবায়নে। তারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বা রেষ্টুরেন্টের বেঁচে যাওয়া খাবার সংগ্রহ করতে শুরু করেন। প্রথম দিকে আস্থার সংকটে অনেকটা কঠিন হয় তাদের খাবার সংগ্রহের এর কাজটি। কিন্তু সৎ ইচ্ছা ও মানুষকে সেবা করার আন্তরিক লক্ষ্য সব বাধা দূর করে দেয়। খাবার সংগ্রহ শেষে সেই খাবারগুলি পৌঁছে দেয়া শুরু হয় অসহায়, ক্ষুধার্ত, মানসিক ভারসাম্যহীন এবং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কাছে। খুলনার তরুণদের এই দারুন উদ্দ্যোগটি ক্রমেই পরিনত হয় একটি সফল সংগঠনে। বর্তমানে এটি “ফুডব্যাংকিং খুলনা কল্যাণ সংস্থা” নামে ব্যাপক পরিচিত ও জনপ্রিয়।

Food Banking
Food Banking

সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা তরুণ শিক্ষার্থী শাহরিয়ার কবির মেঘ জানান, “ফুডব্যাংকিং খুলনা কল্যাণ সংস্থা” যাত্রা শুরু হয় ২০১৭ সালের ৪ আগস্ট। সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তারা এই কাজটি শুরু করেন। শ্রমের ক্ষেত্রে স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে কাজটি এগিয়ে চললেও বাকি কাজগুলি বাস্তবায়নে যে টাকার দরকার সেটি কিভাবে আসে- এই প্রশ্নের উত্তরে শাহরিয়ার কবির মেঘ জানান, শুরু থেকেই সংগঠনটির সদস্যরা নিজেদের হাত খরচের টাকা দিয়েই সকল ব্যয় বহন করছেন। তাদের এই কাজটি দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে অনেক তরুণ স্বেচ্ছাসেবক হতে এগিয়ে আসেন। এখন স্বেচ্ছাসেবক সদস্য সংখ্যা ৪০ এর বেশি। এরই মধ্য “ফুডব্যাংকিং খুলনা কল্যাণ সংস্থা” ৩৫০ টির বেশি ইভেন্ট সফলভাবে সম্পন্ন করেছে। খাবার পৌঁছে দেয়া হয়েছে ৩০০০ জনের বেশি মানুষের কাছে। তিনবেলা না পারলেও অনন্ত একবেলা ভালো খাবার পৌঁছে দেয়ার মাঝেই তারা স্বর্গীয় আনন্দ খুজে পান।

তাদের প্রতিদিনের মেহমানের তালিকায় গরীব দুঃখী ছাড়াও আছেন কিছু প্রতিবন্ধী, মানুষিক ভারসাম্যহীন মানুষ, যারা আগে অধিকাংশ সময়ই ক্ষুধার তাড়নায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াত, রেলষ্টেশনে পড়ে থাকত। তাদের জন্য এই তরুণ উদ্দ্যোক্তারা নির্দিষ্ট খাবার স্থান ঠিক করে দিয়েছেন। রাতের বেলাতে ঘুরে ঘুরে ওই সব মানুষকে খুঁজে খাবার সরবরাহ করা হয়।

Food Banking
Food Banking

​“ফুডব্যাংকিং খুলনা কল্যাণ সংস্থা”র সদস্যরা কৃ্তজ্ঞতা জানান বিভিন্ন হোটেল রেস্ট্রুরেন্ট এর মালিক ও অবস্থা সম্পন্ন সেই সব মানুষদের প্রতি, যারা তাদের অনুষ্ঠান শেষে বেঁচে যাওয়া খাবার “ফুডব্যাংকিং খুলনা কল্যাণ সংস্থা” এর সদস্যদের দিচ্ছেন।

ক্ষুধার্তদের খাবারের ব্যবস্থা করতে করতে তাদের সামনে পড়ল আরও কিছু সংকট ও বাস্তবতা। সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের বস্ত্র, চিকিৎসা ও শিক্ষার অভাব এই তরুণদের দারুনভাবে চিন্তিত করলো। তাই একে একে তরুণদের খাদ্য কার্যক্রমের সাথে যুক্ত হলো ক্লথ ব্যাংকিং, মেডিসিন ব্যাংকিং, ব্লাড ব্যাংকিং ও এডুকেশন ব্যাংকিং। শীত আসলে “ওয়ার্ম হাগ ইভেন্ট” এর মাধ্যমে এই তরুণরা স্বচ্ছল মানুষদের সুবিধাবঞ্চিতদের জন্য কাপড় দান করতে আহ্বান জানান। মানুষের দান থেকে সংগ্রহ করা হয় কাপড়। এরপর সুবিধাবঞ্চিত শীতার্ত মানুষদের কাছে সে কাপড় পৌছে দিতে তারা পথে নামেন, তাদের মুখে হাসি ফোটান। সুবিধাবঞ্চিত অসুস্থ মানুষের জন্য বিনামূল্যে রক্ত ও ঔষধ সরবরাহ করতে এই তরুণরা ব্লাড ব্যাংকি এবং মেডিসিন ব্যাংকিংকে সম্প্রতী যুক্ত করেছে তাদের কাজের মধ্যে।

Food Banking
Food Banking

মোটামুটি সবই তো হলো, তাহলে শিক্ষার দিক থেকে পিছিয়ে থাকবে কেন সুবিধাবঞ্চিতরা? সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হতেই অবহেলিত পথশিশুদের নিয়েও কাজ শুরু করেছেন “ফুডব্যাংকিং খুলনা কল্যাণ সংস্থা” এর তরুণ সদস্যরা। প্রায় ৫০ জন পথশিশুকে পড়াশুনা করাচ্ছেন তারা। অবহেলিত পথশিশুদের পড়াশুনার বই খাতা, স্কুল ইউনিফর্ম কিনে দেয়া ও পড়ানোর মাঝে তাদেরকে খেতেও দেয়া হয়। আগামি দিনগুলিতেও তারা তাদের এই সকল কার্যক্রম চালিয়ে যেতে চায়। একই সাথে শুধু খুলনাই নয়, সারা বাংলাদেশ ব্যাপি এই উদ্দ্যোগটি ছড়িয়ে দেবারও পরিকল্পনা তাদের।

XS
SM
MD
LG