অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

আড়িঁপেতে ধারণকৃত কথোপকথন মিডিয়াতে প্রকাশ কতটা যৌক্তিক?


mrc

অভিযোগটা অনেক দিন থেকেই ছিলো। বিরোধী মতের মানুষের টেলিফোনে আড়িঁপাতা হয় বাংলাদেশেও। শুধু ভিন্নমতের রাজনীতিবিদ নন, সাংবাদিক, পেশাজীবিরাও এর শিকার হয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন। আড়িঁপাতার অভিযোগ প্রথম সামনে আসে হুসাইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনকালে। তার পরের সরকারগুলোর আমলে একই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলেও বিতর্ক জোরালো হয়নি।

কিন্তুু গত কয়েক বছরে বিষয়টি আবারও সামনে উঠে এসেছে। কারণ হচ্ছে, টেলিভিশন ও অনলাইনগুলো ভিন্নমতের মানুষের ফোনের গোপণ কথোপকথন প্রকাশ করছে। মিডিয়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ডিফেন্সের সুযোগ দেয় না। অনেক সময় অডিও প্রকাশের সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি থাকেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জিম্মায়। আবার অনেক সময় মিডিয়াতে অডিও ক্লিপ আগে প্রকাশ হয়, পরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আটক হন।

সিনিয়র সাংবাদিক নাঈমুল ইসলাম খান বলেন, ফোন কথোপথন কোথা থেকে মিডিয়ার কাছে এলো, সেই সূত্র প্রকাশ করলে অনেক সংকটের সমাধান হয়ে যায়। কিন্তুু সূত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য ছাড়া এইভাবে একতরফা আড়িঁপাতা কথা প্রকাশ কোনভাবে গ্রহনযোগ্য নয়। এটা সুস্থ সাংবাদিকতার পরিপন্থী। তবে তিনি এটাও বলেন, ব্রিটেনের মতো দেশেও অনেক সংবাদপত্র, তারকা বা বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ বা ব্যক্তির ফোনে আড়িঁ পেতে পাওয়া গোপন খবর অনেক বার প্রকাশ করেছে। এই কারনে ব্রিটেনের সংশ্লিষ্ট মিডিয়া নন্দিত ও নিন্দিত দুটোই হয়েছে। তারা সূত্র উল্লেখ করেছে। অনেক সময় এই কারণে জরিমানা দিয়েছে। আবার ক্ষমা প্রার্থনাও করেছে। আমাদের দেশে অডিও ক্লিপ কোন সূত্রে প্রাপ্ত তা বলা হয় না। বিষয়টি পরিস্কার থাকা দরকার, সুস্থ সাংবাদিকতার স্বার্থে।

বাংলাদেশে আড়িঁপাতা নিয়ে হঠাৎ আলোচনার কারণ, কানাডার একটি অন লাইন ‘সিটিজেন ল্যাব’ পেগাসাস কেলেংকারি প্রকাশ করেছে। এতে তারা লিখেছে, টেলিফোনে আড়িঁপাতা দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের নাম রয়েছে। বাংলাদেশে বিটিসিএলের নামও তারা বলেছে। এই খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোন বক্তব্য দেয়া হয়নি। প্রতিবাদও জানানো হয়নি। অনলাইনটি লিখেছে, ৪৫টি দেশে, ৩৬টি পেগাসাস অপারেটরের মধ্যে ৩৩টি সন্দেহজনক। বাংলাদেশ ছাড়াও রয়েছে ভারত ও পাকিস্তানের নাম। টেলিফোনে আড়িঁ শুধু বিরোধী রাজনীতিবিদ নন, শীর্ষ সাংবাদিক, ব্যবসায়ী, কূটনীতিকদের ফোনেও পাতা হয়।

বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ দমনে সরকারীভাবেও আড়িঁপাতার জন্য বিশেষ একাধিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কাজ করলেও আনুষ্ঠানিকভাবে কেউ তা স্বীকার করে না। অপরাধী শনাক্তে টেলিফোন কথোপকথনকে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গুরুত্ব দেয়। সর্বশেষ টেলিফোন কথোপকথন শনাক্তে, চট্টগ্রামে একজন এসপিকে পুলিশ আটক করে, তার স্ত্রী হত্যার অভিযোগে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার সঙ্গে জড়িত একজন খুনিকে ভারত থেকে আটক করা সম্ভব হয়েছে, ঢাকায় তার পরিবারের সঙ্গে কথোপকথনের ফোনে আড়িঁ পেতে।

সাংবাদিকদের মধ্যে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান তার আরেকজন সহকর্মী সোহরাব হাসানের সঙ্গে কথা বলার একটি টেলিসংলাপ ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে সাত বছর আগে। তখন প্রশ্ন উঠে, ব্যক্তির নিজস্ব প্রাইভ্রেসী নিয়ে। নাগরিক সমাজ সেই ঘটনার নিন্দাও জানায়। বিশেষ করে প্রতিবাদ জানান টিআইবির ড. ইফতেখারুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. আসিফ নজরুল, সুশাসনের জন্য নাগরিক'এর বদিউল আলম মজুমদারসহ অনেকে।

তবে মিডিয়াতে অধিকহারে ভিন্নমতের মানুষদের টেলিফোন কথোপকথন প্রকাশও বেড়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। ২০১৯ সালে ৬ জনের কথোপকথন টেলিভিশনে সম্প্রচার হয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে পরে, ২০১৭ ও ১৮ সালে ভিন্নমতের অনেক রাজনীতিবিদের টেলিফোন কথোপকথন প্রচার হয় বেশ কয়েকটি টেলিভিশনে। নাগরিক ঐক্যফোরামের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাকে আটকের পর একজন ব্যক্তির সঙ্গে তার ফোন সংলাপ মিডিয়াতে আসে। সেনাবাহিনীর কয়েকজন কর্মকর্তাকে নিয়ে তারা আলাপ করছিলেন।সর্বশেষ বিএনপি নেত্রী নিপুন রায়ের একটি অডিও প্রকাশিত হয়। এতে তিনি দলের একজন কর্মীর সঙ্গে আলাপ করছিলেন আন্দোলন চলাকালে গাড়িতে আগুন লাগানোর বিষয়ে। মিডিয়া এই অডিও প্রকাশ করে। এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মামুন আহমেদের একটি অডিও প্রকাশ হয় মিডিয়াতে। মামুন কথা বলছিলেন বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে। টেলিভিশনে এই অডিও প্রচার হয়।

কাজটি মিডিয়া ঠিক করেছে কিনা এই প্রশ্নের জবাবে নাঈমুল ইসলাম খান বলেন, সাংবাদিকতার ছাত্র হিসাবে বলবো, পুরো বিষয়টি অনৈতিক ও অগ্রহনযোগ্য। বলা যায় সাংবাদিকতা নৈতিক অধপতনও।

নাঈমুল ইসলাম খানের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। তিনি ষোড়শ শতকের ব্রিটেনের একজন বিচারপতির রায়ের উপমা টেনে বলেন, দেশকে রক্ষার জন্য করা সকল কাজই আইনসঙ্গত। দেশের বিরুদ্ধে কেউ ষড়ডন্ত্র করলে অবশ্যই তা প্রকাশ করা যাবে।

সাংবাদিক নেতা মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল বলেন, দেশের জন্য যা ভালো হবে তা প্রকাশ করা যেতে পারে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের একজন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী তার বান্ধবীকে নিয়ে বেড়াতে গেলেন সৈকতে। মিডিয়া সেই ছবি প্রকাশ করলো। বলা হলো, ব্যক্তিগত বিষয় এইভাবে মিডিয়াতে প্রকাশ করা ঠিক নয়। পাল্টা যুক্তি আসলো, একজন প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর ব্যক্তিগত বলে কিছু নেই। কারন তিনি জনগনের প্রতিনিধিত্ব করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার ভালো মন্দ মানুষের জানার অধিকার আছে। কাজেই মিডিয়াকে দেখতে হবে কোন প্রেক্ষাপটে কী প্রকাশ করলেন। অনেক কিছু পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে।

নাঈমুল ইসলাম খান বলেন, টেলিফোনে আড়িঁপাতা নতুন কিছু নয়। এই অপসংস্কৃতি অতীতেও হয়েছে। এখনও হচ্ছে। তবে সাংবাদিকদের সতর্ক থাকতে হবে প্রকাশ নিয়ে। কারন আড়িঁপাতা খবর গুলো যারা পাঠাচ্ছে তারা বিশেষ উদ্দেশ্যে নিয়েই তা করছে। তাদের প্রলোভনে একজন সাংবাদিক পড়বে কেন? ভারতে সাংবাদিকদের ফোনে আড়িঁপাতা হয়েছে। বিরোধী দল দাবি তুলছে, সরকার বলুক তারা এটা করছে, কি করছে না। সরকার নীরবতা পালন করছে। এতে অনেকে যা বুঝার বুঝে নিচ্ছে। তিনি বলেন, ব্যক্তির অধিকার খর্বের বিষয়টি সবার ভুলে গেলে চলবে না।

মঞ্জুরুল আ্হসান বুলবুল বলেন, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সংরক্ষণ নিয়ে আইন আছে। কিন্তুু আবার সমাজে প্রতিষ্ঠিত মানুষগুলোর অনৈতিক কান্ড প্রকাশ গোটা বিশ্বেই হচ্ছে। মামনুল হক ধর্মের নামে সরকারকে হুমকি দিতেন। রাষ্ট্রের অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করতেন। এই কারনে তার টেলিফোন সংলাপ প্রকাশকে মানুষ নেতিবাকভাবে নেয়নি।

এই ব্যাপারে, বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, রাষ্টের স্বাধীনতা ক্ষুন্ন হলে তা রক্ষা করতে যেকোন কাজই উন্নত বিশ্বও করে। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ দমনে আড়িঁপাতলে সমস্যা কী?

তবে নাঈমুল ইসলাম খান, মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল দুজনই সাংবাদিকের ফোনে আড়িঁপাতার বিপক্ষে ও ব্যক্তিগত অধিকার রক্ষার পক্ষে তাদের শক্ত অবস্থান ব্যক্ত করেন। তাদের এই শক্ত অবস্থান ও উৎকন্ঠার কারন হলো, কানাডার অনলাইনে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে দুই শত সাংবাদিকের ফোনে আড়িঁপাতার খবর প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলাদেশে সাংবাদিকদের ফোনে আড়িঁপাতা হয় কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার একজন কর্মকর্তা কোন মন্তব্য করতে সম্মত হননি। তবে ৭ বছর আগে মতিউর রহমানের অফিস সহকর্মীকে দেয়া নির্দেশনা ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া আড়িঁপাতার একটি উদহারণ বলে অনেকে মনে করেন। এই মুহুর্তে সিনিয়র সাংবাদিকরা ধরেই নিয়েছেন তাদের ফোনে আড়িপাতা হয়।

শুধু সাংবাদিক নন, টেলিফোনে আড়িঁপাতা সংস্কৃতির সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরাও অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। রাজনীতিবিদ ও বিভিন্ন পেশার মানুষরা আড়িঁপাতা এড়াতে টেলিফোনে বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করেন । অনেকে মনে করেন, আড়িঁপাতার সকল ধরনের প্রযুক্তি বাংলাদেশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে আছে। তারা সেই যন্ত্র ব্যবহার করছে। এই ব্যাপারে নাম না বলার শর্তে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ দমনে টেলিফোন কথোপকথন শনাক্তে উচ্চপর্যায়ের প্রযুক্তি ব্যবহার হয়। যা জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের আটক ও দেশের বিরুদ্ধে চক্রান্ত প্রতিহত করতে কাজে লাগে। অন্য কিছুতে নয়।

XS
SM
MD
LG