অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

কী হয়েছিলো ২১ আগষ্ট


ফাইলঃ ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহতদের স্মরণে মোমবাতি প্রজ্বলন করলেন মহিলা আওয়ামী লীগের সদস্যরা। ২০০৮।

রাজধানী ঢাকায় প্রকাশ্য জনসভায় গ্রেনেড হামলা চালিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী, তখনকার বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনাকে হত্যা চেষ্টার ১৭ বছর পর বিচারের রায় বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। আইন মন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, দ্রুততম সময়ে শুনানীর কাজ শুরু হবে। শুনানীর জন্য শিগগিরই আবেদন করতে বলেছি। অ্যাটর্নি জেনারেল আমিন উদ্দিন বলছেন, সাজা বহাল রাখতে কাজ করছি আমরা। অন্যদিকে সরকারী দল আওয়ামী লীগের নেতারা সভা সমাবেশ করে বলছেন, তারা দ্রুত রায় বাস্তবায়ন চান।

২০০৪ সালের ২১ আগষ্ট, ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে একটি জন সমাবেশে বক্তব্য রাখার সময় গ্রেনেড হামলার শিকার হন শেখ হাসিনা। সেই দিন একটি ট্রাককে বানানো হয়েছিলো অস্থায়ী মঞ্চ। বক্তব্য শেষ, জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু বলে শেখ হাসিনা ট্রাক থেকে নামতে এগিয়ে যান। ট্রাকের নীচে দাড়িঁয়ে ছিলেন, মহিলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আইভী রহমান। তিনি শেখ হাসিনার দিকে হাত বাড়িয়েছিলেন নামতে সহযোগিতা করার জন্য। ঠিক তখনই ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। ঢলে পড়েন আইভী রহমানসহ শতাধিক নেতা কর্মী। গ্রেনেডের আঘাতে অনেকের শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে মারা যান ২৪ জন,আহত হন পাচঁ শতাধিক। শেখ হাসিনাকে ঘিরে মানব ঢাল বানিয়ে মঞ্চ থেকে গাড়িতে তোলেন ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের তখনকার সভাপতি মেয়র মোহাম্মদ হানিফ, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াসহ তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষিরা। হামলাকারীরা শেখ হাসিনার গাড়িতেও গুলি করে। পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ শুরু করে আওয়ামী লীগ কর্মীদের ওপর। অনেক বছর পর সেই দিনের ঘটনার স্মৃতিচারন করছিলেন তখনকার বিরোধী দলীয় নেতার এপিএস আলাহ উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী। তিনি বলেন, সেই ভয়াবহ হামলা ছিল পরিকল্পিতভাবে নেত্রীকে শেষ করে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। জঙ্গিবাদ ও রাষ্ট্রযন্ত্রের যৌথ চক্রান্ত একুশে আগষ্ট হামলা, যা তদন্তের মাধ্যমে বের হয়ে এসেছে। তিনি বলেন, বিএনপি সরকার এই ঘটনার তদন্তও করেনি, তারা পরিকল্পিতভাবে আলামত নষ্ট করে, পরিস্থিতিকে ভিন্ন দিকে নিতে জজ মিয়া নাটক সাজায়। এই ধরনের কর্মকান্ডে বাংলাদেশের সার্বিক রাজনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এই মামলায় পুলিশ তখন সন্দেহভাজন হিসাবে আটক করেছিলো জজ মিয়া নামের একজন সাধারন হকারকে। পুলিশের তখনকার এসপি রুহুল আমীন মিডিয়ার কাছে তখন ব্রিফ করেছিলেন, জজ মিয়াই ঘটনার আসল নায়ক। তার সঙ্গে রাজধানীর দুইজন শীর্ষ সন্ত্রাসী জড়িত। কিন্তুু অত্যাধুনিক গ্রেনেড তারা কিভাবে পেয়েছেন সেই ব্যাখ্যা তারা তখন দেননি। এত দিন পর সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা হয় জজ মিয়ার সাথে। তিনি বলেন, আমি বায়তুল মোকাররম এলাকার একজন সাধারন হকার ছিলাম। ঘটনার দিন ২১ আগষ্ট গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর সেনবাগে ছিলাম। হঠাৎ এলাকার দোকানে সন্ধ্যার পর চা খেতে গিয়ে শুনলাম, ঢাকায় ব্যাপক গন্ডাগোল হয়েছে। কারা যেন বোমা হামলা করেছে শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে। বেতার ও টিভিতে খবর শুনে বাড়ি গেলাম। মানুষকে অনেক কথা বলাবলি করতে শুনলাম। ঘটনার কয়েক দিন পর পুলিশ আমাকে তুলে নেয় স্থানীয় থানায়। ঢাকা থেকে আগত পুলিশরা কোন কিছু প্রশ্ন করা ছাড়াই আমাকে ব্যাপকভাবে পিটাতে থাকে। মারধরের পর ঢাকা এসবি অফিসে নিয়ে আসা হয়। কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। প্রশ্ন করলেই মারধর করা হতো। ভয়ে চুপ করে পিটুনি খেতাম। টানা মারধরের পর কর্মকর্তারা আসলেন, তারা বলছেন, যা শিখিয়ে দেবো তাই বলবি আদালতে। তারা শিখিয়ে দিল কিছু নাম। বললো, আদলতে গ্রেনেড হামলার দায় নিতে। তারা আরও বললো, কথা শুনলে গ্রামে বসবাস করা আমার অসহায় মায়ের কাছে মাসে মাসে টাকা পাঠাবে। প্রতি মাসে মায়ের কাছে তারা পাচঁ হাজার টাকা পাঠাতেও শুরু করে। আরও জানায় কথা না শুনলে, হত্যা করবে আমাকে। আদালতে জজ মিয়া পুলিশের শেখানো কথাই বলেন। জজ মিয়া বলেন, আমি গ্রেনেড কি জিনিষ বুঝতাম না। এই কথা তাদের বলতেই আবার মারধর। পুলিশী নিষ্ঠুরতার ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছি।

উচ্চ আদালতের একজন আইনজীবী মমতাজ উদ্দিন মেহেদী বলেন, জজ মিয়া নাটক আমাদের আইনী ইতিহাসের কলংকজনক অধ্যায়। এই মামলার সকল রহস্য বেরিয়ে আসে ওয়ান ইলেভেনের পর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। তখন তদন্তে বেরিয়ে আসে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততা। একই সঙ্গে জঙ্গিবাদী গোষ্ঠিকে ব্যবহার করা। এই ব্যাপারে সেই দিন আহতদের একজন, বর্তমানে সরকারের উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীম বলেন, এখনো একুশে আগষ্টের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছি। রাষ্ট্রযন্ত্র এমন ঘটনার দায় এড়াতে পারে না। সেই দিন টার্গেট ছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রীসহ প্রথম সারির সকল নেতারা।

একজন নিরপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল অব. মোহাম্মদ আলী সিকদার বলেন, একুশ আগষ্ট রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য কলংকজনক দিন। এইভাবে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতার ঘটনা নজীরবিহীন। নিরপেক্ষ সরকার তদন্তের মাধ্যমে সব কিছু বের না করলে এই কালো অধ্যায়ের অনেক কিছু অজানা থেকে যেতো।

এদিকে দুই মামলার রায় বাস্তবায়নে উচ্চ আদালতে আসামীদের আপীলের চুড়ান্ত শুনানী নিস্পত্তির প্রস্তুতি চলছে। মামলায় ১৯ জন আসামীকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছে। এই ১৯ জনের মধ্যে রয়েছেন, ডিজিএফআইয়ের তখনকার পরিচালক, পরে এনএসআই এর মহা পরিচালক মেজর জেনালে রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, এনএসআই এর তখনকার মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার আবদুর রহিম, তৎকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, মাওলনা তাজ উদ্দিন, মুফতি হান্নান, মাওলনা শওকত ওসমান প্রমুখ। অন্যদিকে যাবজ্জীবন দন্ডপ্রাপ্ত ১৯ আসামীর মাঝে আছে, বিএনপি র শীর্ষ নেতা তারেক রহমান ও হারিছ চৌধুরী। বাকীদের বেশিরভাগই হরকাতুল জিহাদের মতো বিতর্কিত জঙ্গি সংগঠনের নেতা।

বিএনপি সব সময় বলে আসছে, তারেক রহমানসহ তাদের নেতাদের মামলায় জড়ানো হয়েছে উদ্দেশ্যেমূলকভাবে। কিন্তুু আওয়ামী লীগ বলছে, তদন্তে তাদের নাম এসেছে। এই মামলায় পুলিশের সাবেক আইজি খোদা বক্স চৌধুরী, এসপি রুহুল আমীন, এ এসপি মুন্সী আতিকুর রহমান, আবদুর রশিদসহ ১২ জন পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তার সাজা হয়েছে। অনেকে এখনও কারাগারে আছেন। আবার স্বল্প মেয়াদে কারাভোগ করে ছাড়া পেয়েছেন অনেকে। সাজাপ্রাপ্ত আরও কিছু সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তা হচ্ছেন, সাবেক আইজিপি শহুদুল হক, সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদা, লে.কমান্ডার সাইফুল ইসলাম ডিউক, লে.কর্নেল সাইফুল ইসলাম জোয়ারদার, পুলিশের সাবেক ডিসি সাঈদ হাসান, ওবায়দুর রহমান প্রমুখ। আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সেই ভূমিকাকে দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন সাবেক আইজিপি শহীদুল হক। তিনি বলেন, সরকারের প্রশাসন যন্ত্রের দায়িত্ব ছিলো সমাবেশে আগতদের নিরাপত্তা বিধান করা। তারা তা করেনি।

মামলার রায় বাস্তবায়ন নিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ দ্রুত কাজ করছে। অতি দ্রুত উচ্চ আদালতের শুনানী শেষ হলে মামলার রায় বাস্তবায়ন সহজতর হবে। একুশ আগষ্টকে ঘিরে প্রতিবাদ সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচী নিয়েছে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলো।

XS
SM
MD
LG